নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ নবম পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(৯)
সারাটা দিন শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে বিকেল বেলায় উঠে একবার নদীর তীরে গেল। তার মনের কথা বলবার জন্য আর শোনাবার জন্য নদীই তার একমাত্র সাহারা। দাদাদের সাথে ধীরে ধীরে কিছুটা হলেও দূরত্ব কমে আসছিল। কিন্তু এই ঘটনাতে তাকেই দায়ী করা হবে, এটা বুঝেছিল সুখেন। কাছাকাছি আসার সেতুটা আবার ভেঙে পড়ল। তবে সব থেকে পীড়া দিচ্ছিল খুকীর ব্যপারটা। নাই বা তার সাথে সখ্যতা এখন, একটা সময়ে তো ঐ ভাইঝি তার প্রানাধিক প্রিয় ছিল। সে কি করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। সৃর্যাস্ত যাবার আগেই সে উঠে পড়ল। অন্য পাঁচটা দিন যেমন সে তার এই নিঃস্ব মনেও, প্রকৃতির সুধা নিয়ে সাময়িক স্বস্তি পেত, আজ পেল না।
ফিরে এসে খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখল, ওটা ঢাকা দেওয়াই পড়ে আছে। খাবার দেখেও খাবারে কোন রুচি এল না। নিজের অজান্তেই একটা পেন আর খাতা নিয়ে লিখতে বসল সে। কি লিখবে, প্রথমে কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারছিল না। শরীর ঠিক থাকলেও, মনটা যে ভেঙে টূকরো টুকরো হয়ে গেছে। কি সান্ত্বনা দেবে সে খুকীকে। তবুও একটা চিঠি সে লিখল।
স্নেহের খুকী,
আজ আমার জন্যেই তোর স্বপ্ন আর আকাংখা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। কিন্তু মা, এই ঘটনার জন্য আমার নিজের হাতে কিছুই নেই। তবুও তোর কপালে শাস্তির খাড়া নেমে এল। জানিনা, তোকে আমি কিভাবে সান্ত্বনা দেবো।
প্রথমেই তোকে জানাই, যে এই ঘটনাটাকে মন থেকে মুছে ফেল মা।জীবনটা অনেক অনেক বড়। আর জীবনে ঘাত প্রতিঘাত থাকবেই।এই ঘাত প্রতিঘাতের আবহেই মানুষকে পথ চলতে হয়। তোর কাছে বলতে লজ্জা নেই যে, আমিও একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম-নাম ছিল সুতপা। আমার এই রোগের কারনেই সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। তুই মা তোর মনটাকে শক্ত কর। তুই তো পড়াশোনাতে বেশ ভালো। তুই চাকরির জন্য পরিশ্রম কর। একটা নতুন জীবন পাবি। তারপর তোর পছন্দমত একটা জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবি। কাজটা শক্ত হলেও, অসম্ভব নয়। তুই আমাকে ক্ষমা কর।আমার কথাটা একটু ভেবে দেখ। হয়ত এটাই তোর জীবনে বিশল্যকরণী হিসাবে দেখা দেবে। কথা দে মা, তুই করবি। আমার অনেক স্নেহ আর ভালোবাসা নিবি।
ইতি
আশীর্বাদক
তোর অভাগা ছোটকাকা।
চিঠিটা লিখে মুড়ে রাখল। তারপর রাখালদার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রাখালদা অন্যদিনের তুলনায় একটু দেরি করে এল। তার মুখেও দেখল যন্ত্রনার একটা ছাপ। খাবার রাখতে যাওয়ার সময় দেখল, দুপুরের খাবার যেমন ছিল, তেমনই আছে। কিছু বলল না।সেও বুঝল তার মনের যন্ত্রনাটা। দুপুরের খাবারটা বাইরে ফেলে দিয়ে, ওর আনা খাবারটা রেখে দিল। তারপর ও যখন চলে যাচ্ছে, তখন চিঠিটা রাখালদার হাতে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলল- "রাখাল দা, এটা খুকী মায়ের হাতে দিবি। রাখালদা চলে গেল। শুধু তার পায়ের শব্দ শুনতে পেল।
সুখেনের বেশ মনে পড়ে তার গৌরীপুর যাওয়ার কথা, তার রোগ পরীক্ষার কথা। গ্রামের ডাক্তার কাকা প্রথম দিন দেখেই কেমন উৎকন্ঠা নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। সুখেন জিজ্ঞেস করেছিল-"ডাক্তার কাকা, আপনি কি অন্য কিছু ভাবছেন? কিছু হয়েছে নাকি আমার?"
- "না,আমি এখনও স্থির সিদ্ধান্তে আসছি না। তবে এটা একবার গৌরীপুরে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আয়। আমি হয়ত অন্য চিন্তা করছি।"
- "গৌরীপুর?" গলা দিয়ে সঠিক স্বর বের হচ্ছিল না।" এটা তাহলে কি দাদ নয়?"
- "দেখ একবার যখন সন্দেহ লাগছে, তখন পরীক্ষা করিয়ে আয়। দেরি করিস না। কালকেই যা।"
গ্রামের ডাক্তার কাকা বেশ অভিজ্ঞ একজন চিকিৎসক। তার চিকিৎসা অনেকাংশেই নির্ভুল। এমবিএস করা ডাক্তার। গ্রামেই থেকে গেছেন তিনি। টাকার প্রলোভনে বাইরে পা রাখেননি। উনি একথা বলার পর, সুখেন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। গৌরীপুর মানেই তো কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা। বাড়িতে এই ব্যাপারে কিছুই বলল না সুখেন। পরের দিন 'বাইরে যাচ্ছি" বলে উপস্থিত হল গৌরীপুরে।আউটডোরে নাম লেখানোর পর, ডাক পড়ল সুখেনের। দুরু দুরু বুকে হাজির হল সে। তার কানের লতির কাছে একটা ছোট রিঙের মত অংশ। লালাভো রঙ। ডাক্তারবাবু ঐ ছোট অংশটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন- "আপনার পরিবারের কারো কি এই রোগ ছিল?"
- "না"।
- "তাহলে কি আপনার পরিচিত কারো এই রোগ ছিল, যেটা আপনি না বূঝেই তার সাথে মেলামেশা করেছেন?"
- ",সেটা তো ঠিক বলতে পারব না।"
"হু" বলে ডাক্তার বাবু একটা তুলো নিলেন হাতে। তারপর একটা পিন নিয়ে ঐ গোলাকার অংশে পিনটা ফোটাতে থাকলেন। আর জিজ্ঞেস করলেন- "কোন যন্ত্রনা হচ্ছে? কিছু অনুভব করতে পারছেন?"
- "না তো।"
ডাক্তারের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল। একটা পেন্সিল নিয়ে হাতের আঙুলগুলোতে ফোটাতে লাগলেন। সুখেনের তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে,সে কুষ্ঠে আক্রান্ত। সুখেনের মাথা ঘুরতে লাগল।হঠাৎ সে চেয়ার থেকে নিচে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সে দেখল একটা বেডে শুয়ে আছে।ডাক্তারবাবু তার কাছে এসে হেসে জিজ্ঞেস করলেন- "এত ভীতু আপনি? এত ভয় পাওয়ার কি আছে? এটাতো আর পাঁচটা রোগের মত একটা রোগ। আপনার একেবারেই প্রাথমিক স্টেজ। ভালো হয়ে যাবেন তাড়াতাড়ি।"
- "আমার কি তাহলে সত্যিই কুষ্ঠ হয়েছে?"
- "হ্যা। আচ্ছা বলুন তো, আপনার বাড়ি কোথায় আর বাড়িতে কে কে আছেন?"
- "কেন"
- "আপনি আর বাড়ি যেতে পারবেন না। আপনাকে এখানেই থাকতে হবে আজ থেকে। আর চিকিৎসাও শুরু হবে। আর একটা কথা আপনার কেসটা কি ধরনের তার পরীক্ষা চলছে। বিকেলেই খবর পাবেন।"
সুখেন একটা পেন আর কাগজ নিয়ে সবকিছু লিখে দিল। বিকেলেই ফিরে এল সেই লোক। কেউ আসেনি তার কাছে। আবার বিকেলেই ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, "আপনার যে রোগটা হয়েছে, সেটা ছোঁয়াচে নয়। আপনি সুস্থ হলেই আবার বাড়ি ফিরতে পারবেন। তবে এখানে ছমাস থাকতে হবে। সুখেন আর কোন কথা বলে না। নীরবে কেঁদে চলতে লাগল।
চলবে
(অনিবার্য কারণে সোমবারের পর্বটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য আমরা দুঃখিত। সেটি আজ প্রকাশ করা হলো। )

সুন্দর সুন্দর
উত্তরমুছুন