নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ তৃতীয় পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(৩)
বিকাশবাবু যে রাতে চলে গেলেন, সেই রাতে কেউই ঘুমাতে পারে নি।আলো নিভে গিয়েছিল,কিন্তু সকলেই যেন বিকাশবাবুর মুখটাকেই মনে এনে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। সবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন বাইরে কাঁদছে। আবার কেউ যেন ভাবছিল যে, বিকাশবাবু তার বিছানাতেই শুয়ে তাকিয়ে রয়েছে সবার দিকে। অন্য সবার মত সুখেনের চোখেও ঘুম নেই। এপাশ ওপাশ করতে করতেই সুখেনের চোখে ঘুম চলে এল। সেটাও অবশ্য শেষ রাতে।আর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে লাগল।
ওর স্বপ্নে এসে প্রথমেই দেখা দিল সুতপা। সুতপার বিয়ে হয়ে গেছে।সিমন্তে সিঁদুর জ্বলজ্বল করছে। সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল-"বিয়েটা করেই ফেললাম। তোমার সাথে এ জীবনে আমার গাঁটছড়া বাঁধা হল না। তুমি একলাই থেকো।"
সুখেনের দু চোখে জল। সুতপা চলে গেল তার জীবন থেকে। বাড়ির অন্যরাও চলে গেছে দুরে। সে বড়ই একা। নিঃসঙ্গ জীবন সে কি করে কাটাবে? তাহলে সেও কি বিকাশবাবুকে অনুসরণ করবে? মন সায় দিল না তাতে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতটা কেমন হবে, সেটাও তো দেখা দরকার। সুখেনেরও কোর্স শেষ হয়ে এসেছে। ওকেও হয়ত নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেবে হাসপাতাল থেকে। কিন্তু---?
তারপর সে যাবে কোথায়? সে যদি বাড়ি ফিরে যায়, তাহলে কি তার বাড়িতে স্থান হবে? ওখানে তার ভাইয়েরা আছে, আছে বৌদি আর বৃদ্ধা মা। আছে ভাইপো ভাইঝিরা। ওদের মুখগুলো মনের পর্দায় আসতেই, কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠল। এই কটা দিনেই যেন হাঁফিয়ে উঠেছে সুখেন। হঠাৎ মনে হল, ও যে সুতপার বিয়ের ছবি দেখল, ওটা কি বাস্তব? কে জানে হবেও বা তাই।
সকালে উঠে একটু পায়চারি করছিল সুখেন। শালগাছটার কাছে আসতেই, মনে হল কেউ যেন কথা বলছে। অবশ্য কিছুই বুঝতে পারল না। একটু দুরে তাকিয়ে দেখল, পলাশগাছে ফুল ফুটেছে। কি সুন্দর লাগছে ওদের। ওরা প্রকৃতিকে নিঃস্বার্থ ভাবে সাজিয়ে তুলেছে। তাহলে কি সত্যি সত্যিই সুতপা আর পরের বসন্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারেনি? হবেও বা তাই। এখানে বসে বহির্জগত দুরে থাকা, স্থানীয় কোন খবরও পায় না।
তারপরই সুখেনের মন চলে যায় অন্যত্র। সে ভাবে, তার চাকরি কি সে আবার ফিরে পাবে? ডাক্তারবাবূ বলেছেন অবশ্য, সার্টিফিকেট পাওয়া মানেই হল, আপনি একজন সুস্থ মানুষ। আপনার থেকে কোন সংক্রমনের আশঙ্কা নেই। সরকারীভাবে আপনাকে চাকরি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল তার। কি জানি সে আবার তার নিজের কাজকর্ম করতে পারবে কিনা? মানুষজন তো এখনও এই রোগকে হালকা চোখে দেখে না।পরে কি হবে, দেখা যাবে ভাবলেও মনের ভেতর নানাবিধ প্রশ্ন এসে ভিড় জমাতে শুরু করল। আচ্ছা, এই যে যারা এখান থেকে বের হচ্ছে, তাদের পুনর্বাসন হচ্ছে না কেন? কেনই বা তাদের পূর্বসুরীদের ভিক্ষা করে জীবন কাটাতে হবে? কার কাছ থেকে এর উত্তর মিলবে, সেটা সে জানে না। ওদেরও তো বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সূখেন একটা বাঁধানৌ চাতালে বসে এই সব যখন ভাবছিল, ঠিক তখনই ওর পাশে এসে বসল হরেন। এসেই কোন ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করল- "আচ্ছা এই যে রোগ আমাদের হয়েছে, এই রোগ গুলো কিভাবে হয়?"
-"এগুলো সংক্রমিত হয়, এক দেহ থেকে অন্য দেহে। সাধারনতঃ কারো সংস্পর্শে এলেই এই রোগ জীবানু শরীরে প্রবেশ করে।"
-"তাহলে যে গ্রামের লোকজন বলাবলি করে পারা খেলে এইসব রোগ হয়। পারা নাকি পরে শরীরে ফুটে ওঠে।"
-"না না ওরকম হয় না। আর তাছাড়া শুধু শুনু মানুষ পারা খাবে কেন?"
-"কেন, শুনেছি যে পায়রার মাংস খেলে নাকি ঐ পায়রার মাংসের মধ্যে থাকা পারা শরীরে ফুটে উঠে কুষ্ঠ হয়।"
-"না, না ওসব কথা ঠিক নয়।'
-"তাহলে কি খেসারীর মধ্যে ঐ পারা থাকে? আমরা তো খেসারীর ডাল খেয়েছি প্রচুর।"
সুখেন হেসে উত্তর দিল- "না, না এসব কিছু নয়। আর পাঁচটা রোগের মত এটাও একটা রোগ। ভালও হয়ে যায়। আর কোন কথা হয়না ওদের। বিকাশবাবু মারা যাবার পর থেকে, এখন ওখানে থাকা লোকজন বেশিক্ষন কাউকে বসতে দেয় না। পাঠিয়ে দেয় ঘরে। ওরাও ফিরে এল নিজের বেডে।
সুখেনেরও ছুটি হয়ে গেল। তার রোগমুক্তি ঘটল। মিলল সার্টিফিকেট। তার সাথে কেউ যেমন দেখা করতে আসেনি, তেমনই তাকে নিতেও কেউ আসে নি। তার জীবনে যে কোন আবাহনের সুর বাজবে না, সেটা সে বুঝে গেছে। তার জীবনে শুধুই বিসর্জনের সুর বেজে চলেছে। তাকে বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না যে, সে সদ্যই একটা রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে। তার অঙ্গে কোথাও কোন বিকৃতির চিহ্ন নেই। কানের লতির কাছের দাগটা চিরতরে মুছে গেছে। কেউ বলে না দিলে, কারো কোন সন্দেহ কিংবা দুরে রাখার কথা চিন্তা করবে না। মনে একটা ভরসা পেল সুখেন। মনে মনে ভাবল, তাকে বাড়িতেও নিশ্চয় মেনে নিয়ে আশ্রয় দেবে।ভাবতে ভাবতেই বাসে উঠে বসল সুখেন।
সুখেন যখন বাস থেকে নামল, তখন সে চায়ের দোকানে এক কাপ চা খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করল। চায়ের দোকানের কাছে পৌঁছাতেই দোকানী আর বসে থাকা দু পাঁচ জন খদ্দের নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। সুখেন একটা বেঞ্চে বসতে যেতেই দোকানী হা হা করে উঠল। তাকে বসতে দিল না। চায়ের অর্ডার দিল দাড়িয়েই। যতই হোক সে একজন শিক্ষিত মানুষ আর শিক্ষকও ছিলেন। তাই মুখের সামনে না বলে উঠতে পারল না দোকানী। তখন গ্রামে গ্রামে চা দেওয়া হত ছোট ছোট কাঁচের গ্লাসে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে একটা গ্লাসে চা এনে নামিয়ে দিল দুর থেকে সুখেনের বেশ কিছুটা সামনে। সুখেন সব বুঝেও কিছু বলল না। চা টা খেয়ে, গ্লাসের দাম সহ টাকা সামনেই নামিয়ে রেখে একটা পাথর চাপা দিয়ে দিল। গ্লাসটা একটু দুরে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর হন হন করে হাঁটতে লাগল বাড়ির উদ্দশ্যে। ওখানেও যে তাকে এই পরিস্থিতির শিকার হতে হবে, সেটা সে আন্দাজ করে নিয়েছে। তার জন্য কোন আপ্যায়ন থাকবে না, সেটা জোর দিয়েই বলতে পারছে সুখেন। বাড়ির গেট থেকেই দাদাকে ডাকতে লাগল। কখনও ভাইপোর নাম ধরে। সুখেনের গলার আওয়াজ পেয়ে বৃদ্ধা মা বেরিয়ে এল। সে তো মা। সুখেনকে জড়িয়ে ধরতে গেলে, সুখেন মানা করে মাকে। শুধু জিজ্ঞেস করে-"মা কেমন আছ?"
চোখের জল মুছতে মুছতে মা বলে উঠল- "আর বাছা আমার থাকা? আমি যে এই দূশ্য দেখার আগে মরলাম না কেন? তুই বাবা কেমন আছিস?"
ম্লান হাসি হেসে জবাব দিল- "মা, আমি তো শুধুই বেঁচে আছি।আমার তো আর কিছুই নেই।"
মা ছেলের কথোপকথনের মাঝেই বড়দা আর বড় বৌদি অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলে উঠল- "বাইরে কেন? ভেতরে আয়।"
প্রথমে সুখেন ভাবল, আর ভেতরে ঢুকবে না। কিন্তু কিসের একটা অমোঘ টানে ভেতরে ঢুকল। বাইরের বারান্দায় একটা খাটিয়া পেতে, ওখানে বসতে বলল। দেখতে দেখতে পাশাপাশি লোকজন ওকে দেখার জন্য একটু দুরে দাড়িয়ে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। সুখেন কিছু কথা বলল না। শুধু ওদের দিকে তাকিয়ে স্বগোতক্তি করে বলে উঠল- "হায়রে! এই দিনটাও দেখতে হচ্ছে। একজন অপরাধীকে যেমন লোকজন দেখে, তাকেও সেইভাবে দেখতে লাগল। সে তার অপরাধ কি সেটা জানে না।
চলবে


চোখের সামনে ছবির মতো ফুটে উঠছে গল্পটা। পরবর্তী অংশের জন্য অপেক্ষায় রইলাম স্যার।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ । শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনলোক সংস্কার ধরা দেয় পরতে পরতে।সুন্দর সুন্দর।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনঅসাধারণ।সার্থক উপস্থাপন।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আপনাকে। শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
উত্তরমুছুন