নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ পঞ্চম পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(৫)
সুখেনকে দেখে ডাক্তারবাবু চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন-"কি ব্যাপার সুখেন বাবু? আপনি এখানে এলেন যে বড়? কোন অসুবিধা হয় নি তো?"
ম্লান হাসি হেসে সুখেন বলল-"কি আর সমস্যার কথা বলবব ডাক্তারবাবু?' এই রোগ হলেও সমস্যা, আর রোগমুক্ত হলেও সমস্যা।"
-"সেটা কি রকম সুখেনবাবু, ঠিক বুঝলাম না!"
-"বুঝলেন না কিছু? তাহলে শুনুন আমার কথা। আমার বাড়িতেও স্থান হয়নি,আর কর্মক্ষেত্রেও স্থান পাইনি?"
-"কেন! আপনি তো সবকিছু ফিরে পাবেন। আপনার কাছে তো সরকারী নথি রয়েছে।"
-"ওটা কাগজে কলমে। মানুষের মনে কিন্তু ভিন্ন ধারনা। তারা রোগমুক্ত মানুষকেও ভয় পায়। তাদের দুরে রাখে।"
-"তাহলে তো আপনি আদালতের সাহায্য নিতে পারেন।"
-"হ্যা, তা পারি, কিন্তু তাতে কি সামাজিক এই সমস্যা দুর হবে?"
- "তাহলে আপনি কি করছেন এখন?"
-"আমি এখন নির্বাসনে থাকি। অনেকটা সেই দ্বীপান্তরের মত।গ্রামের বাইরে জনগন বর্জিত স্থানে নির্বাসন।"
- "ভেরি স্যাড। মানুষের মধ্যে এখনও চেতনাই জাগেনি।"
- "আর মনে হয় জাগবেও না কোনদিন। সে যাই হোক, আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল। আপনার শোনার সময় হবে?"
-"হ্যাঁ, হ্যাঁ হবে। আপনি বলুন না।"
-"আচ্ছা ডাক্তারবাবু, এখানে সুস্থ হবার পর ঐ সব রোগীদের কোন খবর জানেন?"
- "না, সেরকম কোন খবর আমার কাছে নেই।"
- "ওরা এখান থেকে বের হয়ে ভিক্ষা করে, আর তা না হলে মৃত্যু বরন করে। আচ্ছা ডাক্তারবাবু ওদের পুনর্বাসন করা যায় না? যাতে ওরা অন্তত আত্মসম্মানের সাথে একটু বাঁচতে পারে।"
- "দেখুন সুখেনবাবু, আমরা রোগের চিকিৎসা করে রোগীকে সুস্থ করতে পারি। কিন্তু জনগন যদি সচেতন না হন, তাহলে আমরা কি করতে পারি?"
- "কিন্তু আমরা তো সরকারের কাছে এ ব্যাপারে জানাতে পারি?"
- "হ্যাঁ তা অবশ্য পারি। কিন্তু কাজটা তো অত সোজা নয়।"
- "সে আমি জানি। আমার তো এখন কোন কাজ নেই। আমি তো আছিই, তার সাথে আপনার একটু সাহায্য প্রয়োজন।"
- "আমি কি করে সাহায্য করতে পারি, বলুন?"
- "আপনার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে এরকম কিছু রোগমুক্ত মানুষের নাম ঠিকানা।"
- "হ্যাঁ, সেটা আমি নিশ্চয় পারব। ও হ্যাঁ, একটা কথা বলি।জুনবেদিয়ার কাছে এক ইংরেজ ভদ্রলোক অনেকটা জায়গা জুড়ে কুষ্ঠ হাসপাতাল ও একটা ট্রেনিং সেন্টার খুলেছে। আপনি ওখানে যোগাযোগ করতে পারেন।"
- "ঠিক আছে, ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। একবার সকলে মিলে চেষ্টা করে দেখি কিছূ করা যায় কিনা?"
- "আমার শুভেচ্ছা থাকল। আপনি জয়ী হন।"
ডাক্তারবাবুকে নমস্কার করে সুখেন রুম থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ঠিক করল, আজই সে ঐ বদড়ার কুষ্ঠাশ্রমে যাবে। গেট ছেড়ে বেরিয়ে নিজের আস্তানাতে না গিয়ে উপস্থিত হল বদড়ার কুষ্ঠাশ্রমে। ওদের অফিস একজায়গায় আর হাসপাতাল আরো এক জায়গায়। একটা ট্রাস্ট করে চলে এটা। মিশনারী সেবা সংস্থা। অর্থ আসে বিদেশ থেকে। শোনা যায় যারা ওখানে চিকিৎসার জন্য, আসে তাদেরকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। সে যাই হোক, মানুষের কথা তো ভাবে। আর্তের সেবার জন্য কৃষ্ট আর খ্রিস্টের মধ্যে কোন তফাৎ নেই।
সুখেন ওখানে পৌঁছে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সাথে সাথেই অনেক নতুন বিষয়ে জানতে পারল। ওখান থেকে পেল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি। সুখেন যে একজন রোগমুক্ত কুষ্ঠ রোগী, সেটা জানতে পেরে এখানের কর্তৃপক্ষের তরফে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়। সুখেন ওখান থেকে ভালো সাড়া পেয়ে আর গৌরীপুর থেকেও তথ্য পেয়ে বাড়িতে ফিরে এল।
বাড়িতে ফিরে সে খাওয়া দাওয়া সেরে ঐসব লেখা তথ্য নিয়ে বসল। তাকে তো আসলে জানতে হবে সবকিছু, নাহলে তো কিছু কাজ করা যাবে না। জানল ডাঃ জেরহার্ড আরমেয়ার হ্যানসেনের নাম। তিনিই আসলে কুষ্ঠের জীবানু আবিষ্কারক আর নিরাময়ের প্রধান হোতা। কুষ্ঠরোগের নাম শুনলে এখনও পর্যন্ত আমাদের চিন্তা চেতনা সেই আদিমযুগেই থেকে গেছে। রোগটি কেন হয়, কিভাবে ছড়ায়, রোগ চিকিৎসাতে সারে কিনা, এসব খবর আমাদের জনগন জানতেই চায় না। ফলে আমরা মানসিক দূষণাগ্রস্ত হয়ে আছি। আর ফলস্বরূপ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক অবরোধ সৃষ্টি করে আজও আমরা অসামাজিক হয়ে রোগী কিংবা রোগমুক্ত মানুষকে কোনঠাসা করে লোকালয় থেকে দূরে নির্জন দ্বীপবাসী করে তুলছি। চোখটা বুজে গৌরীপুরে চিকিৎসাধীন এক রোগমুক্ত মানুষের কথা চোখে ভেসে এল। নাম ছিল নরেন মাহাতো। খবর পেয়েছে সে একটা ফাঁকা জায়গায় বাস করছে। জনমানবহীন সেই জায়গাতে একটা ছোট মাটির কুঁড়ে ঘরে বাস করছে। একদিন গৌরীপুরে এসে ডাক্তারবাবূকে বলেছিল- "ডাক্তারবাবু আমাকে বাঁচালেন কেন? এই জীবন রাখার থেকে মরে যাওয়াও ঢের ভালো ছিল।" ডাক্তারবাবু তাকে কোন আশ্বাসবাণী শোনাতে পারেন নি। পরে নাকি নরেন মাহাতো নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। এরকম কত নরেন হারিয়ে যাচ্ছে, তার কোন সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। কিছু মানুষ বাঁচল কি মরল, তার জন্য সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের কোন তাপ উত্তাপ নেই। বরং মনে মনে ভাবে, ঐসব রোগীরা সমাজের বোঝা। তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেই সমাজের মঙ্গল। সুখেনের দু চোখ বেয়ে নেমে এল জল। আবছা হয়ে গেল সংগ্রহ করে আনা লেখাগুলো। বাইরে বেরিয়ে একটু মুক্ত বাতাস নিয়ে এল।
ফিরে এসে আবার পড়তে শুরু করল। কুষ্ঠ রোগ কি? কিভাবে সংক্রমিত হয় কখন এই রোগের সৃষ্টি, এসব জিনিস পড়তে শুরু করল। লেখার দিকে মনোনিবেশ করল সুখেন। আজও আমরা কিছুতেই কুসংস্কার আর ভুল ধারনাগুলোকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। এক অদ্ভুত মায়াজালে বন্দী হয়ে আছি আমরা। আর তাই সেই আদিম যুগের ধারনাকেই শিলমোহর লাগিয়ে দিন যাপন করে চলেছি। এখনও এই রোগকে "ভগবানের অভিশাপ", "পাপের ফল", সারানো "শিবের অসাধ্য", "বংশগত রোগ", প্রারব্ধ প্রভৃতি বিশেষণে ভূষিত হত আর এখনও হয়। সহস্র হাত দুরে থাকতে চায় নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে। মূল বিষয়ে দৃষ্টিপাত করল সুখেন। লেখা আছে কুষ্ঠরোগের ইতিহাস। কে এম নাম্নী একজনের লেখা। "ইতিহাস প্রাচীন, কেননা সে দুর অতীতের সাক্ষ্য বহন করে।কুষ্ঠরোগ অন্যান্য রোগের মতই খুব প্রাচীন এবং প্রাচীনতম রোগগুলির মধ্যে অন্যতম। এই রোগের সূত্রপাত কোন দেশে, সে সম্বন্ধে বিভিন্ন মতভেদ আছে। একটা মতানুযায়ী কুষ্ঠরোগের জন্মস্থান ছিল মধ্য আফ্রিকা। আফ্রিকাতে এই রোগের আবির্ভাব কখন ঘটে, সে সম্পর্কে প্রকৃত সাক্ষ্য প্রমান আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপর মধ্যযুগে সারা ইউরোপে তা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে পশ্চিম গোলার্ধে এই রোগের প্রসার ঘটেছিল। ভিন্ন একটি মতে, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে এই রোগ ছিল ও সেটি চীন ও জাপানে যায়। পরে খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা এই রোগটিকে ইউরোপে নিয়ে যায়।জন্মলগ্ন যাই হোক না কেন, একথা বলা চলে যে, ভারত এবং চীনদেশে কুষ্ঠরোগ সুপ্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। অবশ্য কুষ্ঠরোগ বিষয়ে অধিকতর সত্য নির্ভর ইতিহাস একমাত্র ভারতীয় ইতিহাস "মনুস্মৃতি" এবং "ঋকবেদে" উল্লিখিত রয়েছে (১৪০০খৃষ্ট পূর্ব)। বেদ অবশ্য মনু-স্মৃতি থেকে পুরানো। ভারতীয় ভেষজ বিজ্ঞানের নিদর্শন "চরক"ও "সুশ্রুত "শাস্ত্র। এই দুই শাস্ত্রেও কুষ্ঠের আলোচনা দেখতে পাই। এছাড়া "বাইবেলে"ও এই রোগের উল্লেখ আছে।" সুখেন খাতা বন্ধ রেখে একটু চুপচাপ বসে একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। মনে পড়ে যায় যযাতি ও পুরুর কথা। পুত্র পুরু তার পিতার কুষ্ঠরোগ নিজদেহে নিয়ে পিতাকে মুক্ত করেছিলেন। এছাড়া দুর্বাশা মুনির অভিশাপে কৃষ্ণপুত্র শাম্বও কুষ্ঠে আক্রান্ত হয়েছিলেন।সুখেন এবার আর চিন্তা করতে পারছিল না। শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
চলবে

খুব ভালো লাগছে গল্পটা।....মাম্পী দাস।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনঅসাধারণ। সুখেনের মত মানুষের এক জ্যান্ত দলিল ,তার পটভূমি বাঁকুড়া।সেই পটসীমা অতিক্রম ক'রে,এই কাহিনী দূরের সীমায় প্রবেশ করেছে ।সার্থক ।
উত্তরমুছুনশাম্ব দুর্বাসা র অভিশাপে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হয়েছিল,নাকি নিজ পিতা কৃষ্ণের অভিশাপে? সমরেশ বসু কি,ভুল তথ্য দিয়ে ছিলেন?
উত্তরমুছুনস্বপন কুমার পাল।
মতামতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সমরেশ বসু ভুল তথ্য দেননি। লেখক বিষয়টি অবশ্যই লক্ষ্য করবেন। আপনার পরামর্শ আমাদের সমৃদ্ধ করবে।
মুছুনযতটুকু জানি,কৃষ্ঞ বিরক্ত হয়ে শাম্বকে শাস্তি দান করতে চেয়েছিলেন,কিন্তু দুর্বাশার মাধ্যমে এই শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল।তারপর কৃষ্ঞ চাইলে শাম্বকে রোগমুক্ত করতে পারতেন,কিন্তু করেন নি।
উত্তরমুছুনমতামতের জন্য ধন্যবাদ। লেখক বিষয়টি অবশ্যই লক্ষ্য করবেন।
উত্তরমুছুনসাম্বপুরান অনুযায়ী বলা হয় যে,দুর্বাশা মুনির ক্রোধ নিয়ে ঠাট্টা মসকরা করেছিলেন সাম্ব।সাম্ব জানতেন যে তিনি কৃষ্ঞের পুত্র।তার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না।কিন্তু দুর্বাশা মুনি সেসব চিন্তা না করে ক্রোধে সাম্বকে কুষ্ঠ রোগাগ্রস্হ হবার অভিশাপ দেন।পরে নিরদমুনির ফরামর্শে সূর্যদেবের তফস্যা দ্বারা সুস্হ হয়ে উঠেন।কিন্তু ভিন্ন মত হল কৃষ্ঞপুত্র সাম্বের উপর নারদ মুনি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।আর তার শাস্তির জন্য নারদ মুনি কৃষ্ঞের শরনাপন্ন হলে,কৃষ্ঞ হেসে নারদকে বিদায় করেন।কীনাতু নারদের মাথার উপল চলছে প্রতিশোধ নেবার পালা।তাই কৃষ্ঞের প্রমোদকাননে সাম্বকে ছল করে ডেকে এনে কৃষ্ঞ কতৃক অভিশাপ লাভ করে শাম্ব।এইব্যাপারে কোন দাবিরুক্তি নেই।কিনাতো প্রশ্ন একটাইঃ পিতা হিসাবে শামাবকৈ এধরনের অভিশাপ দেওয়া আর প্রমোদকাননে কেন শামাব প্রবেশ করেছিলেন,সেটা তিনি অপ্তত বুঝতে পারতেন।আর তাই আমি দুরৃবাশা কোমতৃক শাপপ দেঔয়াটাকেই সঠিক মনে করে তুলে ধরেছি।
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়
ধন্যবাদ।
মুছুন