নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ ষষ্ঠ পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(৬)
বিকেল হতেই সুখেন গিয়ে বসল গন্ধেশ্বরী নদীর বুকে। তার জন্য আসন পাতা আছে বালির উপরে। এই নদী তাকে সমাদর করে।কাছে বসিয়ে গল্প শোনে। কোন অবস্থাতেই তাড়িয়ে দেয় না। সুখেন ভাবে আর কবে এরকম আচরন করবে জনগন? না, এমনি এমনি হবে না। এর জন্য দরকার আন্দোলন। রোগমুক্ত সকলকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। সমাজের উঁচুস্তরে বসে থাকা মানুষজন এমনি এমনি তাদের সামাজিক, মানসিক আর অর্থনৈতিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে না। এটা অর্জন করে নিতে হবে।
সুখেন বই পড়ে অনেক কিছুই জানতে পারছে। এতদিন সে জানত না কুষ্ঠ কি, আর কিভাবে আচরন করা হত এইসব রোগীদের সঙ্গে?
এখন সুখেন জানে কুষ্ঠ কি? কুষ্ঠ হল অন্যান্য আর পাঁচটা সংক্রামক রোগের মতই একটা রোগ। ঠিক যেমন টিবি, ডিপথেরিয়া, বসন্ত, কলেরা, জন্ডিস প্রভৃতি রোগ যেমন জীবানু সংক্রমনের মাধ্যমে হয়, কুষ্ঠরোগও সেরকম একটা জীবানু ঘটিত রোগ। মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি নামে এক জীবানুর সফল আক্রমনের জেরে এই রোগ সৃষ্টি। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সংক্রামক রোগ। এই রোগে প্রাথমিকভাবে শরীরের চামড়া, মিউকাস মেমব্রেন এবং পেরিফিয়াল নার্ভ আক্রান্ত হয়। মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি এক দেহ থেকে অন্য দেহে যেতে পারে বলে রোগটি দেহ থেকে দেহান্তরের। সেই কারনেই এপিডামিওলজীর নিয়মানুসারে রোগটিকে সংক্রমিত রোগ বলা হয়। তবে সব কুষ্ঠ রোগীই রোগ সংক্রমিত করে না বা সব কুষ্ঠ রোগই সংক্রামক নয়। শতকরা ৮৫ ভাগ কুষ্ঠ রোগ অসংক্রামক ও শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ কুষ্ঠ রোগ সংক্রামক।
সুখেন আগে এইসব বিষয়ে কিছুই জানত না। আর জানার কোন আগ্রহও ছিল না। আর পাঁচটা সাধারন মানুষের মতই এই রোগের বাহক এবং ধারককে এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয় মনে করত। এখন সে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল বলেই, এই রোগ এবং রোগী সম্পর্কে জানার কৌতুহল বেড়েছে। তাছাড়াও তার এই কর্মহীন জীবনে কিছু কাজ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সুখেনের নাক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
সুখেনরা একটা কমিটি গঠন করেছে সম্প্রতি। সুখেন অবশ্য কমিটিতে থাকলেও, কমিটির কোন পদাধিকারী নয়। তবে চিঠিপত্র লেখা, বিভিন্ন জায়গাতে কথা বলা, গ্রামে পরিস্থিতি দেখতে যাওয়ার কাজে পুরোপুরি নিযুক্ত হয়ে গেল। এখন সে প্রতিরাতে আসতে পারে না। বিভিন্ন স্থানে তাকে থাকতে হয়। পরপর চিঠি দিয়ে চলেছে প্রশাসনের কাছে। দাবী একটাই-রোগমুক্ত মানুষের পুনর্বাসন চাই। সুখেন ভালোভাবেই জানে যে, একবার গেলেই সবকিছু পেয়ে যাবে না, সেই আশাও করে না। তবে কমিটিতে আলোচনা করে কিভাবে বারে বারে ধাক্কা দেওয়া যায়, সেটা সম্পূর্ণ করার জন্য। গৌরীপুর ও বদড়ার এডগার মিশনের সাথেও কথা চালাচ্ছিল। সুখেনরা আগামীকাল দক্ষিন বাঁকুড়ার একটা গ্রামে যাবে বলে ঠিক করেছে। ওখানে উৎকল আর সাওতালদের অনেকেই কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত। তারা বাড়িতেই থাকে। তবে পাশের গ্রামে একজন ছেলে গৌরীপুরে চিকিৎসা করিয়ে পড়াশোনা শিখে কলেজে প্রফেসর হয়েছে। অবশ্য এজন্য তাকে কম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি। কিন্তু সে সফল হয়েছে।
সুখেন ভাবে, যদি এই রোগ সম্পর্কে জনগন সতর্ক হয়, তাহলে অবস্থাটা এমন হত না। অনেক মানুষ সামাজিক সম্মান আর লোকলজ্জার ভয়ে কোন চিকিৎসা করায় না। কিন্তু যখন অঙ্গ বিকৃতি ঘটে, পুঁজ রক্ত পড়ে, তখন তাকে চিকিৎসার নামে মানসিক উৎপীড়ন চালায়। মনে হবে, দোষী তারা, তাদের জন্যই সংসারে এই অশান্তি।
রাতের বেলায় সুখেন পড়ছিল - আদিম যুগ থেকে মধ্যযুগে এই রোগের চিকিৎসা ও নিরাময় নিয়ে। একটা সময়ে এই রোগের চিকিৎসা তো ছিলই না, উল্টে এই সব রোগ হলে বলা হত, তার উপর ঈশ্বর ক্রোধিত হয়েছেন। আর এর বিধান দিতেন পুরোহিত কিংবা সমাজের মাথারা। তবে কবিরাজী প্রথার মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসার একটা চল ছিল। বনজ গাছ গাছড়ার মুল, ফুল আর ফল ছিল ঔষধ। শরীরে লেপন করা ও খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত সুস্থ হয়েও যেত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উল্টোটাই ঘটত। প্রকৃতির নিয়ম সম্পর্কে যখন মানুষ ছিল অজ্ঞানতার তমসায় আচ্ছন্ন, তখন ধর্মীয় নেতাদের ব্যাখ্যা মেনে নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হত। আর সেই সব বিধান বা ব্যাখ্যা ছিল নিজেদের শাসন ও শোষনকে বজায় রাখার জন্য সুবিধামত অপব্যাখ্যা। প্রাচীন বা মধ্যযুগে কুষ্ঠ রোগটি ছিল রহস্যের আবরনে মোড়া। মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টিয় যাজকেরা কুষ্ঠরোগটির রহস্যের ব্যাখ্যা করতেন একথা বলে - "অসুখটি ঈশ্বর প্রদত্ত, এ রোগ কখনও মাথা নোয়াতে জানে না। পাপ করেছো, তাই ঈশ্বর শাস্তি দিয়েছেন, এটা কর্মফল: মনুষ্য প্রদত্ত ভেষজে কুষ্ঠরোগ নিরাময় হবে না।" যাজকেরা যাকে "কুষ্ঠাক্রান্ত" বলে ঘোষনা করতেন, তাদের আর সমাজের বুকে ঠাঁই ছিল না। যাজকেরা মহা আড়ম্বরে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কুষ্ঠ রোগাক্রান্তকে সমাজে অস্পৃশ্য বলে ফতোয়া জারি করতেন। পৃথিবীর কাছে তারা হত মৃতের পর্যায়ভুক্ত।এমনকি এই যাজক সম্প্রদায় একজন কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত জীবিত মানুষের সামনে মৃত মানুষের মত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একটি অনুষ্ঠান করে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত জীবিত মানুষটিকে মৃত বলে ঘোষনা করতেন।ঘোষনা করেই অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটত না। অনুষ্ঠানটিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হত কবরস্থান পর্যন্ত। সেখানে খোঁড়া একটি গর্তের পাশে কুষ্ঠ রোগীটি নতজানু হয়ে বসত, আর শেষকৃত্যকারী যাজক একমুঠো মাটি তার উপর ছড়িয়ে দিতেন। অর্থাৎ তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সকলের কাছে তাকে মৃত বলে ঘোষনা করা হত।মৃতের সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারের মধ্যে বিলি করা হত। কি নিদারুন বেদনাদায়ক অমানবিক বিভৎস ঘৃন্য আচার অনুষ্ঠান। এটা ছিল ইউরোপে কুষ্ঠরোগীদের উপর প্রচলিত আচরন।
আর ভারতবর্ষে? এখানেও তার থেকে ব্যতিক্রম কিছু ঘটত না। প্রথমাবস্থায় তাকে চিকিৎসা করত চিকিৎসককুল। কিন্তু যখন গলিত হতে শুরু করত দেহ, তখন তাকে জঙ্গলে রেখে আসা হত।তাকে ছোঁয়া তো দুরস্ত, তার ছায়া পর্যন্ত মাড়াত না। গভীর জঙ্গলে অভুক্ত অবস্থায় হয় সে মারা যেত কিংবা বন্য প্রানী তাকে হত্যা করত।
সুখেন আর চিন্তা করতে পারে না। সে বর্তমান যুগের রোগীদের অবস্থা দেখতে যাবে আগামীকাল।
চলবে

অসাধারণ বিশ্লেষণে অণুজীব বিদ্যা অ্যানাটমির ধারণার পটভূমি ও এক জেলাবাসী অবহেলিতের মনস্তত্ত্ব পাঠকের উদ্দেশ্যে মেলে ধরায় সমকালীন সাহিত্যের ধারায় অভাবনীয় সার্থকতা প্রতিপন্ন হয় ।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাদের মতো পাঠকের মতামত আমাদের উৎসাহিত করে। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনআবারো একরাশ মুগ্ধতা। ভালো থাকবেন স্যার 🙏......মাম্পী দাস
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আপনাকে। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনবসন্ত রোগাক্রান্ত নগরের নটি বাসবদত্তাকে নগর প্রাকারের বাইরে বহিষ্কার করেছিল নগরবাসীরা। আবার, লালন ফকির, নবকুমারকেও ওই একই অপরাধে পরিত্যাগ করেছিল সহযাত্রীরা । কুষ্ঠ রোগীদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনা । আসল রোগ তো মানুষের মনে । শুধু অজ্ঞানতা নয়, অসহমর্মিতাও । এইচ আইভির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে দেখেছি । এরই মধ্যে আবার অনেক মানুষ আছে, যারা অপ্রেমের বাধা সরিয়ে ওই পরিত্যক্ত মানুষদের কাছে পৌঁছে যায়, তাদের নতুন জীবনের দিশা দেখায় । লেখক তাদেরই একজন । আত্মপর সমাজের কাছে ভালোবাসার জগতের বার্তা বহন করে আনুক তাঁর এই লেখা ।
উত্তরমুছুনডাঃ কেতকী বাগচী
সল্ট লেক, কলকাতা।
অবশ্যই অসাধারণ একটি উপন্যাস এর রূপ নেবে এই রচনা ,সেটাই স্বাভাবিক।
উত্তরমুছুনমতামতের জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুন