ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৩০ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

  অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।  প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ  তিরিশ  পর্ব - সম্পাদক ।) 

ক্ষুদিরাম বসু 

এই রাজদ্রোহের অভিযোগে বাংলা মায়ের দামাল ছেলে কিশোর ক্ষুদিরাম কিছুদিনের জন্য ফেরার হয়ে গেল। অন্যদিকে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ব্রিটিশ রাজরোষে পড়ে জেলা কালেক্টরভবনে কেরানীগিরির কাজ থেকে বরখাস্ত হয়ে সত্যেন আরও বেশি করে বিপ্লবীয়ানার কাজে মেদিনীপুরে জোয়ার আনলেন । এদিকে ক্ষুদিরাম কিছুদিন পর সমিতির দাদাদের নির্দেশ মতো মেদিনীপুর জেলা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। মামলা রুজু হলো দায়রা আদালতে। আদালতে রাজদ্রোহে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের পক্ষে বেশ কয়েকজন উকিল ব্যারিস্টার দাঁড়ালেন। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১, ১২৪ নং  ধারায় মামলা রুজু হলো। চূড়ান্ত পর্যায়ে আশ্চর্যজনকভাবে আদালত মামলাটিতে ক্ষুদিরামকে রেহাই দেয়। হেমচন্দ্র লিখেছেন -"একরার করাবার জন্য পুলিশ তা'কে কিরকম যন্ত্রণা দিতে পারে, যত দূর সম্ভব অতিরঞ্জিত ক'রে তা তাকে শোনান হয়েছিল এবং দোষী সাব্যস্ত হ'লে পরিণামে যে রকম ভীষণ দন্ড হ'তে পারে, তাও অনেক বাড়িয়ে চড়িয়ে তাকে বলা হয়েছিল। আমাদের ভয় হ'য়েছিল, সে পাছে মোকদ্দমার পরিণাম চিন্তা ক'রে পুলিশের অত্যাচার ও পট্টিতে সব হালচাল ব'লে দেয় । কিন্তু এতসব শোনবার পরও সে, যে রকম অম্লানবদনে পুলিশের হাতে ধরা দিতে রাজী হয়েছিল, তাতে আর আমাদের কোন দ্বিধা থাকেনি। আর ধরা দেবার পর পুলিশের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও সে কোন কথা প্রকাশ করেনি।"

মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষুদিরামের বাল্য-কৈশোরকালের অনেক অজানা কথা জানা যায় হেমচন্দ্র, সত্যেন  সহ কয়েকজন বিপ্লবীর স্মৃতি থেকে। হেমচন্দ্র ও সত্যেন এই আগুনপাখিকে চিনতে পেরেছিলেন তার দেশভক্তি ও মাতৃমুক্তির আকুতি দেখে । ক্ষুদিরামের রিভলবার প্রেম থেকে দক্ষ সংগঠক হয়ে ওঠা ও সামনে থেকে নেতৃত্ব দান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছুপা না হওয়া ছিল এই কিশোরের ইচ্ছাশক্তি। শুধু মেদিনীপুর শহরেই নয় তমলুক থেকে প্রত্যন্ত পল্লী বাংলায় ছিল ক্ষুদিরামের হাতে  গড়া বিপ্লবী আখড়া ও তার আড়ালে গুপ্ত সমিতি। বিপ্লববাদের প্রাথমিক পর্বে মেদিনীপুর শহরে আসা অগ্নিপুরুষ অরবিন্দ ঘোষ, ভগিনী নিবেদিতাকে দেখেছেন একেবারে কাছ থেকে। তাঁদের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন কিশোর ক্ষুদিরাম। আরও কাছ থেকে দেখেছেন হাটগাছিয়া পাঠশালা থেকে তমলুকের হেমিলটন স্কুল কিংবা মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের প্রাণপ্রিয় শিক্ষক ও সহপাঠীদের। বিধাতাপুরুষ যেন নিজের হাতে গড়ে দিয়েছেন তার অমৃতসন্তানকে । বিপ্লবীয়ানার কর্মকাণ্ডে ষোলকলা পূর্ণ করে দিয়েছেন হেমচন্দ্র, সত্যেন আর বারীণ।  সত্যেন নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলেছেন ক্ষুদিরামকে। মেদিনীপুর শহরে সত্যেনের ছিল একটি হ্যান্ডলুম কারখানা বা খাদি উৎপাদন কেন্দ্র। তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল "ছাত্র ভান্ডার" বা স্বদেশী কেন্দ্র। তারও ভিতরে ছিল গুপ্ত সমিতি। যুগান্তর, অনুশীলন সমিতির স্বেচ্ছাসেবক বা কর্মী বাহিনীকে দেওয়া হতো বিপ্লববাদের পাঠ ও প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি চলতো সমাজসেবার কাজকর্ম। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষুদিরামের দ্রুত উত্থান ও একজন প্রথম সারির নির্ভীক চরমপন্থী বিপ্লবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল অচিরেই।

চলবে 

৬টি মন্তব্য: