নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ চতুর্থ পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(৪)
সুখেন খাটিয়াতে বসে একটা জিনিস লক্ষ্য করল যে, তার উপস্থিতি কারোরই পছন্দ হচ্ছে না। যে ভাইপো ভাইঝিরা তার প্রানের অধিক প্রিয় ছিল, তারাও কাছে আসছে না। অনেকটা দুরে তারা দাড়িয়ে আছে। মন চাইলেও, ওদেরকে ডাকতে সাহস করল না। একটু মুচকি হাসি হাপল শুধু। সুখেনরা তিন ভাই।ও সবার ছোট।মেজদা বাইরে ছিল।খবরটা পেয়ে বাড়িতে এল। বড়দা আর মেজদা একটু তফাতে দুটো চেয়ারে বসল। বড়দাই প্রথমে কথা শুরু করল। বলল-"ভাই তুই তো এলি, কিন্তু একসাথে তো থাকা যাবে না। আমরা সকলেই জানি যে, তুই রোগমুক্ত হয়ে এসেছিস, কিন্তু গ্রামের লোকেরা তো একসাথে আমাদের থাকতে দেবে না।" একটু দুরেই দাড়িয়ে ছিল মা। সব শুনে বলল- "এ তোরা কি কথা বলছিস? সুখু তাহলে থাকবে কোথায়?"
- "মা তুমি চুপ কর না । আমি তো ছোটর সাথে কথা বলছি।দেখো আমাদের সংসার রয়েছে, ছেলে মেয়ে আছে। পাড়া প্রতিবেশী আছে। সকলকে নিয়ে চলতে হবে।"
এতক্ষন কোন কথা বলে নি সুখেন। এরপর বলল- "দাদা, আমি তাহলে যাব কোথায়?"
- "দেখ,আমরা একটা কথা ভেবে রেখেছি। আমাদের নদীর ধারে যে জায়গা আছে, ওখানেই একটা ঘর তৈরি করে দেব। তুই ওখানেই থাকবি।"
- "কিন্তু ওখানে তো কেউই থাকে না। ওখানে থাকব কি করে?"
- "একটু মানিয়ে নে ভাই। তোর তিন বেলার খাবার পৌঁছে দিয়ে আসবে কেউ।"
সুখেন মুখটা নামিয়ে রাখল। কোন কথা বলল না। ওকে চুপ থাকতে দেখে দাদা আবার জিজ্ঞেস করল- "কিছু বলছিস না যে। আমরাও তো তোকে এখানে রাখতে চাই। কিন্তু কি করব বল?"
দুরে দাড়িয়ে মা চোখের জল মুছতে মুছতে বলে উঠল- " হ্যা রে তোরা এ কি কথা বলছিস? ও তোদের ছোট ভাই। কোনদিন এই পরিবার ছেড়ে যায়নি। ওকে তাহলে কেন বনবাসে পাঠাবি?"
বৌদিদের সুখেন খুব ভালবাসে। তারাও একটু দুরে শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে, কিন্তু কোন কথা বলছে না। সুখেন পরে বলে উঠল-"ঠিক আছে তোমরা যখন চাইছো না, তখন আমি ওখানেই থাকব।কিন্তু ওখানে বাড়ি না হওয়া অবধি আমি থাকব কোথায়?"
- "বাড়ি না হওয়া অবধি তুই আমাদের গোয়ালের পাশে যে ফাঁকা ঘরটা আছে, যেটাতে বসে বাবা কবরাজী করত, ওখানেই তুই থাকবি। ঘরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দেবো। সুখেনের চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল বের হতে লাগল। কারো মন অবশ্য তাতে ভিজল না শুধু মা আর বৌদিরা কাঁদতে লাগল।
সংসারের অটুট বন্ধন বলে একটা কথা প্রায়শই বলে থাকি। সত্যিই কি সেটা ঠিক? সংসারে বন্ধন বলে কিছু হয়না। এটা আসলে বোহেমিয়ানদের একটা তাঁবুতে থাকার মত বিষয়। তাঁবুতে বাস করা যায় কিন্তু নিরাপত্তা থাকে না। এখন সুখেন সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে। সংসারের রাশ থেকেও সমাজকে গুরুত্ব দেয় মানুষ বেশি। তাবু থেকে কেউ বেরিয়ে গেলে তাবুর অন্যান্যদের কারো মন বিচলিত হয় না।
সুখেন খাটিয়া থেকে উঠে ওর জন্য নির্ধারিত দাদুর ঘরে গিয়ে উঠল। ওর সাথে একমাত্র মা আর রাখালদা ছাড়া অন্য কেউ এল না। ঐ ঘরটাকে পরিষ্কার করে খাটিয়াটা ঢুকিয়েছে। মা তার জন্য বিছানাপত্র এনে দিল। বসে থেকে অনেক কথা বলল। তারপর একটা সময় চলে গেল ভেতরে। সুখেনের জন্য সব কিছু পৃথক করা হয়েছে। রাখালদা কাজ করলেও, সুখেনের একেবারে কাছে গেল না। হয়ত বা তাকে সেরকমই নির্দেশ দেওয়া আছে। এরপর যে কদিন ওখানে ছিল সুখেন, ততদিন তার জন্য বরাদ্দ খাবার এনে ওর থালাতে ঢেলে দিত। মা তার থালা বাসন ধুয়ে জল এনে দিত।মায়ের এই আচরনের জন্য বাড়িতে বেশ কড়া ধমক খেয়েছে।এমনকি মাকে ঘর আলাদা করে দিয়েছিল। মা সেটা মেনে নিয়েছিল। মা যেহেতু সুখেনের সংস্পর্শে আসে, তাই তাকেও শাস্তি পেতে হয়েছে। বেশিদিন থাকতে হল না সুখেনকে। পাড়াপড়শীর ক্রমাগত চাপে বাড়ি তৈরি হয়ে গেল সাতদিনের মধ্যে। আর সুখেনের স্থানান্তর ঘটল আট দিনের মাথায়। গ্রামে থেকেও তার এই নির্বাসন সকলেই মেনে নিল। প্রথম প্রথম সুখেনের দিন কাটানো ছিল খুবই কষ্টের। বন্ধু বান্ধবেরাও কেউ খবর নেয় না। ভগবানের কাছে মনে মনে জিজ্ঞাসা করে, কি তার অপরাধ? এই জীবনে তো সে কোন অন্যায় করেনি। তাহলে কি এটা পূর্বজন্মের ফল? হবেও বা তাই। দিন কয়েকের মধ্যে অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেল সুখেনের।দুদিন পরে সুখেন রাখালদাকে বলে ওর সাইকেলটা আনিয়ে নিয়েছে। ঐ সাইকেলে চেপেই সে স্কুলে যেত। সুখেনের মনে হল, একবার স্কুলে যাবে সে। আর সেইমত সে একদিন স্কুলে পৌঁছে গেল। ওকে দেখে শিক্ষক ছাত্র সকলেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল সকলেই। হেড হেডস্যারের রুমে ঢোকার আগেই খবর পেয়ে হেডস্যার বাইরে বেরিয়ে এলেন। কেউ তাকে বসতেও বলল না। হেডস্যারকে সার্টিফিকেটটা মেলে ধরলেও, হেডস্যার সেটা না দেখেই বললেন- "সুখেনবাবু, জানি আপনি রোগমুক্ত হয়েছেন, কিন্তু আপনার এই রোগ হবার পরেই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি আপনাকে বরখাস্ত করেছে। সুখেন মৃদু আপত্তি তুললেও, হেডস্যার তাকে যেতে বললেন স্কুল থেকে। এই জীবনে সুখেন আর শিক্ষকতা করতে পারবে না। মনে হল, ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে পৃথিবীটাই কেউ জোর করে কেড়ে নিচ্ছে। ওকে সকলেই জানিয়ে দিচ্ছে যে তার এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অধিকারই নেই। ওর খুব মনে আসত হেমিংওয়ের বিখ্যাত উপন্যাস- "দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি'-তে পড়া বৃদ্ধ জেলের কথা।চারিদিকে শুধুই জল, বেঁচে থাকার জন্য লড়াই। ওটা মনে করেই সুখেন একটা জোর পায় মনে। মনে মনে ভাবল, কিছু একটা করতে হবে তাকে। এইভাবে হেরে গিয়ে সে কিছুতেই বিকাশের মত আত্মহত্যা করবে না। রোগমুক্ত মানুষের জন্য একটা পুনর্বাসনের জন্য লড়াই করতে হবে।
ওখানে দিন চারেক বন্দি অবস্থাতে কাটালো। তারপর সাইকেলটা আসতেই সে সাইকেলে চড়ে পৌঁছে গেল গৌরীপুরে। ওখানে কোন দৈত্যের বাগানে লাগানো কোন পোস্টার নেই- "ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড"। বাইরে দারোয়ান ছিল। একটু মুচকি হেসে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল- "কি ব্যাপার দাদাবাবু, আপনি আবার এসেছেন? কোন দরকার আছে?"
-"না,না এমনিই এলাম। ডাক্তারবাবুর সাথে দেখা করতে এলাম।উনি আছেন তো?"
- "হ্যা ডাক্তারবাবু আছেন। আপনি যান। এখানে যারা কাজ করে সকলেই আগে এখানের পেশেন্ট ছিল। রোগমুক্তির পর এখানেই চাকরি পেয়েছে। সুখেনের ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠল। আশার আলো একটা আছে। তারপর ঢুকে গেল ডাক্তারবাবুর রুমে।
চলবে


দুর্দান্ত এক উপন্যাস ।এক কথায় অসাধারণ সুন্দর।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
মুছুন