নবপল্লীর মানুষেরা
(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে। কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ দ্বিতীয় পর্ব - সম্পাদক)
অতনু চট্টোপাধ্যায়
(২)
যেদিন সুতপার কথা উঠত, সেদিন সুখেনের দু চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বয়ে যেত। ওদের দুজনের সখ্যতা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, কোন বাধা ওদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় ভিন্ন। সুতপার সাথে সুখেনের ভালোবাসা দুদিনের ছিল না। ছিল প্রায় একযুগ। প্রথম দিকে সুতপাদের বাড়ি থেকে আপত্তি থাকলেও, ওদের দুজনের অকৃত্রিম প্রেমের কাছে হার মেনেছিল সকলেই। সুতপা কলেজের পর আর পড়ে নি। এদিকে সুখেন তখন মাষ্টার্স শেষ করে একটা স্কুলে যোগদান করেছে। ওদের চার হাত এক করতে আর কোন বাধা ছিল না।
হঠাৎ হল ছন্দপতন। সুখেনের কানের লতির কাছে একটা লাল দাগ। ডাক্তারের কাছে গেলে, ডাক্তার প্রাথমিকভাবে দাদের চিকিৎসা করলেও, সারে না ওতে। অবশেষে সুখেনকে পরামর্শ দেয় গৌরীপুরে দেখানোর জন্য। খবরটা পাঁচ কান হতে দেরি হল না। সুখেন গেল গৌরীপুর।
গৌরীপুর হল কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসা কেন্দ্র। ওখানে দেখানোর পর, ডাক্তারবাবু নিশ্চিত হন যে, সুখেনের শরীরে কুষ্ঠ রোগের জীবানু বাসা বেঁধেছে। অগত্যা ভর্তি হতে হল সুখেনকে। সুখেনকে ভর্তি করার পর বাড়ির লোকেরা ওর সাথে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে দিল। ষাটের দশকে এই রোগের সেভাবে চিকিৎসা ছিল না। তবে এই রোগের ঔষধ বের করার প্রয়াস চলছে। জার্মান সরকার আর ভারত সরকার এই রোগের ঔষধ বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।বর্তমান সময়ে এমডিটির প্রচলন ছিল না। তবে যে ওষুধ চিকিৎসার জন্য এসেছিল,তাতে প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত রোগীরা ভালো হয়ে উঠছে।কিন্তু যে সমস্ত রোগীর অঙ্গবিকৃতি হয়েছে,তাদের চিকিৎসা সেরকম ছিল না। শুধু ঐ রোগ যাতে না বাড়ে, তার জন্য চেষ্টা চালানো হত। কত রোগী, সব বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে চিকিৎসার জন্য। ওদের সাথে কথাবার্তা হয়। ওখানেই আলাপ হয়েছিল চন্দ্র মূর্মু আর হরেনের সাথে। হরেন ছিল সাধারন একজন চাষী আর চন্দ্র ছিল ক্ষেতমজুর। চন্দ্রের সারাশরীরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। যে সমস্ত ঘা হয়েছিল, তা থেকে পুঁজ রক্ত বের হচ্ছে। ওর মুখ থেকেই শোনা বিভিন্ন ঘটনা। ওর বাড়ি বাঁকুড়া- পুরুলিয়ার বর্ডারে। ওদের গ্রামে চিকিৎসক নেই। গ্রামেই জড়ি-বুটি খেয়ে চিকিৎসা চলছিল এর মধ্যে সরকারী টিম ওদের বাড়িতে যায়। আরো অন্য বাড়িতে ওরা আগে গিয়েছিল। সেটা অবশ্য ওর খুব ছোটবেলায়। তখন ওদের গ্রাম ছাড়াও অন্য গ্রাম থেকে আরো অনেককে তুলে এনেছিল। তাদের কোন খবর নেই। শুনেছিল লোকমুখে যে, ওদের চিকিৎসার জন্য এনে একসাথে অনেককে নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা করানোর অছিলায় সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে মেরে দিয়েছে। আজ পর্যন্ত ওদের কোন খোঁজখবর নেই।এটুকু বলে থামে চন্দ্র।
সুখেন জিজ্ঞেস করল- "তারপর?"
- "এবার আমার সাথে অন্য অনেককে আনা হল। আমি আসছিলাম না কিছুতেই। ঐ যে শুনেছিলাম, একবার এলে আর বাড়ি ফেরা যায় না। মনে ছিল এক আশঙ্কা। কিন্তু এখানে আনার পর আমাদের চিকিৎসা চলছে।"
- "বাড়ি থেকে কেউ আসে?"
- "না, কেউ আসে না।"
- "পরিবারের কোন খোঁজ খবর পাও না?"
- "না"। একথা বলে কাঁদতে শুরু করে দিল। সুখেন তার কান্না থামিয়ে বলল- "কি আর করবে বল? আমরা তো পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে গেছি। যে কদিন বাঁচবে, নিজের জন্যই বাঁচ।"
- "কিন্তু আমার তো হাত গুলোই চলে গেছে। আর কেইবা আমাদের কাজ দেবে?"
সুখেন কোন কথা বলতে পারে না। চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুখেন বুঝে গেছে যে, তারও আর বাড়ি ফেরা হবে না। তার জন্যেও অপেক্ষা করছে এক অজানা জগৎ। যে জগতে নেই কোন আত্মীয়তার বন্ধন।সুতপার কথা সে মাঝে মধ্যে ভাবলেও, তাকে যে আর এই জীবনে পাওয়া যাবে না,সেটা সে ভালোভাবেই বুঝে গেছে।মাঝে মাঝে মনে হয়, এই জীবন রেখে কি লাভ? এর জন্য তো সে কোনভাবেই দায়ী নয়। এটা তো অন্য আরো পাঁচটা রোগের মত রোগ। কিন্তু ওর ভাবনার সাথে তো অন্যের ভাবনা মিলবে না। ডাক্তাররা সর্বতোভাবে ওদের মনকে দৃঢ় করার চেষ্টা করে যায়।
সুখেন ওখানে ভর্তি থাকতে থাকতেই, একদিন একটা ঘটনা ঘটে গেল। বিহার থেকে এক বাঙালী ভদ্রলোক এসেছিলেন।মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। ওনারও কোন অঙ্গ বিকৃতি হয় নি।চিকিৎসা চলছিল। ওনার বাড়ি থেকে প্রায় একমাস যাবত কেউ আসেনি। সেই যে ভর্তি করিয়ে গেছে ওর স্ত্রী, তারপর আর খোঁজখবর নেয়নি। খুব চুপচাপ থাকতেন উনি। কোন কথা জিজ্ঞেস করলে, উনি হুঁ হাঁ করে জবাব দিতেন। বিকেলে সবার সাথে গেটের মধ্যে থাকা একটা শাল গাছের নিচে বসে থাকতেন। দেখে মনে হত, উনি ধ্যান করছেন। ওনার সম্পর্কে যেটুকু তথ্য সুখেন পেয়েছিল, তাতে ওনার নাম আর কিছু জানা গিয়েছিল। ওনার নাম ছিল বিকাশ। পদবী চক্রবর্তী।ব্রাহ্মন। চাকরি করতেন কারখানাতে। স্ত্রী আর দু ছেলের সংসার। এমনিতে কোন অভাব কিংবা অশান্তি ছিল না। কিন্তু এই সংসার ছেড়ে থাকাটা সে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।এই রোগটা তো আর অন্য পাঁচটা রোগের মত নয়। যাকে ধরে, সেইই বাদ চলে যায়। সংসারের বাকি সকলে তাকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে সংসারের চিন্তা করে। একমাত্র সংসারের কোন সদস্যের মৃত্যু ঘটলেই এরকমটা ঘটে। কিন্তু তারা তো বেঁচে থেকেও সংসারের কাছে মৃত। বরং সে সংসারে যাওয়ার চেষ্টা করলে, অন্য লোক তাদের বয়কট করবে। তার থেকে যার এই রোগ হয়েছে, তাকে ছেঁটে ফেলে নতুনভাবে সংসার চালানোই শ্রেয়। অবশ্য পরিবারের কোনো সদস্যের এই রোগ হলে এমনিতেই পরিবারের অন্য সদস্যদের এড়িয়েই চলে। তারা যে কুষ্ঠরোগীর ঘরের লোক। বিকাশবাবু হয়ত এইসব কথাই শালগাছের নিচে চিন্তা করতেন। ফিরে যাবার রাস্তাতে কাঁটা নয়, একটা বড় প্রাচীর গড়ে উঠেছে। বিকাশবাবু সুখেনের আগেই এখানে এসেছিল। ওর চিকিৎসাও শেষের মুখে। দু একদিনের মধ্যেই হয়ত ওনাকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু ছেড়ে দেবার কথা হলেও, ওনার মুখে কোন অভিব্যক্তি ছিল না। বরং ছিল এক অনিশ্চিয়তার কালো মেঘ। মনে চিন্তা- "এরপর কি হবে?"
যেদিন ওনাকে ছাড়া হবে, তার আগের দিন বিকেলে গাছের নিচে চুপচাপ বসে থাকলেন বিকাশ বাবু। সুখেনরা সব ঢুকে গেলেও, উনি ঢুকলেন না। রাতে খাবার দিতে এসে শোনা গেল, বিকাশবাবু নেই।
হাসপাতালের কর্মচারী সহ গার্ডরা খোঁজাখুঁজি শুরু করতে লাগল। নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু কোন উত্তর পাওয়া গেল না। খুঁজতে খুঁজতে ঐ শাল গাছটার উপরে টর্চের আলো ফেলতেই, সবার চোখ কপালে উঠে গেল। বিকাশবাবু গলায় দড়ি দিয়ে গাছে ঝুলছেন। ডাকা হল পুলিশ। লাশ নিচে নামানো হল। জামার পকেটে একটা চিঠি পাওয়া গেল। চিঠিটা ছিল এরকম- "আমি চললাম এই পৃথিবী ছেড়ে। এই পৃথিবী আমার কাছে অচেনা। বেঁচে থেকে যন্ত্রনা ভোগ করা থেকে, মরে যাওয়াই ভালো। আমার পরিবারের কারো কাছে কোন খবর যেন না দেওয়া হয়। ওরা ভালো থাকুক। জানি আমার ময়নাতদন্ত হবে। তবে ময়না তদন্তের পর যেন এই ধারে কাছের কোন শ্মশানেই আমায় দাহ করা হয়। সন্তান মুখাগ্নি করবে, সেই আশা আমি কবেই ছেড়ে দিয়েছি। যে কেউ আমার মুখে যেন আগুন দেয়। সব রোগীকে জানাই আমার ভালোবাসা। 'সুখে থাকুন' কথাটা বলতে পারছি না। আসছি বন্ধুরা। হ্যাঁ, আমার এই আত্মহত্যা নিয়ে কতৃপক্ষ কিংবা কোন রোগী দায়ী নয়। তারাই প্রকৃতপক্ষে আমার শেষ জীবনের বন্ধু ছিল।
ইতি- বিকাশ চক্রবর্তী।
চলবে


অসাধারণ সুন্দর ধারাবাহিক উপন্যাস।
উত্তরমুছুনমতামতের জন্য ধন্যবাদ জানাই।
মুছুনউপন্যাস টি সমাজের সত্য তথ্যে সমৃদ্ধ কথন মালা হয়ে ওঠায় অবশ্যই পাঠকের ভীষণ হৃদয়স্পর্শী এবং সমাজের মঙ্গলের জন্য নির্দ্বিধায় নিবেদিত- নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
উত্তরমুছুনমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।
মুছুনযেন সত্যি কোনো ঘটনা,পূর্বে ঘটে গেছে এমন।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
মুছুনখুব ভালো লাগলো
উত্তরমুছুন