ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৬৩ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

"স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত  বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ' ।  প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসছে সেই অগ্নিযুগের কাহিনি এবং আগ্রহী পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি। আজ তেষট্টি পর্ব - সম্পাদক ।) 

কিষাণ অসন্তোষ এতো বড় বিদ্রোহের রূপ নেবে সেই ধারনা ছিল না কুঠিয়াল ইংরেজ শাসকদের। তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। প্রশাসনের ট্রিগার নিজেদের হাতে রাখার জন্য প্রশাসনিক কাঠামোর রদবদল ও সংস্কার, প্রশাসক বদল ও নতুন নিয়োগ শুরু করল। দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য সামরিক বিভাগে বিশেষ ফৌজ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়। ১৭৬৭ সালে জ্বলে ওঠা বিদ্রোহের আগুন প্রশমিত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জন গ্ৰাহাম সেনাপতি ফার্গুসনকে পাঠাল জঙ্গলমহলের জেদি ও অবাধ্য জমিদারদের জব্দ করতে। সবচেয়ে বড় বাধা এসেছিল রাইপুরের রাজা দুর্জন সিংহ, কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি, বগড়ির গোবর্দ্ধন দিকপতি প্রমূখের কাছে । ফার্গুসন ধলভূমগড়ের উদ্দেশ্যে সেনা অভিযান ও সেনা সমাবেশ করলে ভয়ঙ্কর সমস্যায় ফেলে দিয়ে গভীর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছিলেন । ধলভূমগড়ের রাজা জগন্নাথ ধল । ধূর্ত ও শঠ ইংরেজ কুটকচাল করে জগন্নাথের বদলে তাঁর ভাই নিমু ধলকে জমিদার পদে অভিষিক্ত করে। এই খবর পেয়ে আরও ক্ষিপ্ত ও ভয়ঙ্কর ইংরেজ বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন জগন্নাথ। ইংরেজ তাদের চরম ভুলটা বুঝতে পারলো অচিরেই। বিদ্রোহ আর একতরফা জঙ্গী আন্দোলন গড়ে উঠলে প্রমাদ গুনতে হল ব্রিটিশ শাসকদের। জগন্নাথ ও তার বাহিনীকে ঠেকাতে ১৭৬৮ খ্রি: নতুন সেনাপতি ক্যাপ্টেন মরগ্যানকে পাঠানো হলো। মিঃ মরগ্যান  এখানকার বিদ্রোহের মাটিতে পা দিয়েই বুঝেছেন এইভাবে জব্দ করা তো দূরস্ত , গোটা জঙ্গলমহলে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়বে। উপর মহলে শান্তি প্রস্তাব পাঠানো হল‌। ১৭৭৭ খ্রি: জগন্নাথ ধলকে  সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া হল । ক্যাপ্টেন  মরগ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলেন-"The whole country up in arms against the British authority ........"(J.C.price. notes on History of Midnapore - p 58.

ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট রাজা জমিদারদের জোটবদ্ধ  আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টি উপর মহলে জানিয়ে দিলেন । রাজা, জমিদার জোতদার এমনকি পুরুষানুক্রমে চাষ করে আসা পাইক, বরকন্দাজগণ স্বেচ্ছায় আন্দোলনে নামে। কুখ্যাত ভূমিসংস্কার আধিকারিক মিঃ জে.সি .প্রাইস এই কৃষক - রাজা জমিদারদের যৌথ আন্দোলনের নাম দিলেন" চুয়াড় বিদ্রোহ" । অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়েছেন নিজের লেখা বইয়ে।মেদিনীপুর ( বর্তমান ঝাড়গ্ৰাম ), বাঁকুড়া ও  পুরুলিয়া জেলার বৃহত্তর জঙ্গলমহল জুড়ে শুরু হয়ে গেছে তীব্র আন্দোলন। ১৭৯৮-'৯৯ মেদিনীপুর জেলার ‌পশ্চিমাংশ ও  বাঁকুড়ার দক্ষিণাংশের নানা প্রান্তে চলছে বিদ্রোহ, অগ্নিগর্ভ আন্দোলন। এর‌ই মাঝে বগড়িতে শুরু হয়েছে নায়েক বিদ্রোহ । এই ধারাবাহিক আন্দোলন, বিদ্রোহের মাঝেই জন্ম নিল - ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি । কিষাণ অসন্তোষের আগুন নেভানোর আগেই জ্বলে উঠলো বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের আগুন। 

চলবে

এই সপ্তাহের কবিতাঃ কবিতার রাতদিন - শীতল বিশ্বাস

কবিতার রাতদিন       


শীতল বিশ্বাস 

সকাল হলো

যার যা কাজ শুরু হলো

কর্মক্ষম দিন সেজে নিলো সাজ

দুপুর হলো

সূর্য ঘাম মুছল ,

বিকেলের দিকে দেখলো ,

শ্লথ হলো সময়,


বিকেল হলো

পাখিরা,এবং কাজ 

তল্পি গুটোতে শুরু করলো

সন্ধ্যে হলো 

সূর্য পাটে বসার আগে 

কনে দেখার আলোয় 

দেখল সবাইকে 


রাত হলো

দিনের নামাবলী 

খুলে রাখলো কুলুঙ্গিতে

সময়,

ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়ল

রাতের হৃদযে


রাতের জোনাকিরা 

আলোর আলপনায়

লিখে রাখবে

দিনের কড়চা



ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ মহাকাব্যে খল চরিত্রসমূহ (পর্ব ১৭) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যে খল চরিত্রসমূহ 

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "মহাকাব্যে খল চরিত্রসমূহ"। প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - সতের - সম্পাদক)

সাহিত্যে নায়ক, নায়িকা ছাড়াও পাঠকের দরবারে উপস্থাপিত করা হয় খলনায়ক ও খলনায়িকাদের। এই সব চরিত্রসমূহ গল্প উপন্যাস, নাটক কিংবা যাত্রাপালাতেও হাজির হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ের সাহিত্যেও এই ধরনের খল চরিত্র বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কি সিনেমা আর কি টিভি সিরিয়ালে এদের উনস্থিতি বেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যৌথ সংসার ভাঙা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কু মন্ত্রণা দানের মাধ্যমে এইসব খলনায়ক আর খলনায়িকাদের চরিত্র চিত্রিত হয়ে থাকে।অবশ্য অনেক সময় বাস্তবতার সীমারেখা অতিক্রম করে,পাঠক ও দর্শকদের অনেকসময় বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়।

সে যাই হোক, আমরা আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধ করব রামায়ণ মহাকাব্যে। তবে রামায়ণে খলনায়ক বা খলনায়িকাদের ভূমিকা ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে না, যতটা প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়ে আছে মহাভারত নামের মহাকাব্যে। মহাভারতের খল  নায়কের মধ্যে আমরা শুধু একজনের নামই স্মরণে আনি। কিন্তু আরো একজন বিশেষ কুটনীতি বিশেষজ্ঞের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।আর এই খলনায়কের নাম ছিল কণিক বা কণিকা।

কে এই কণিকা? এই কণিকা ছিলেন একজন শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত। তাঁর কুটনীতিতে ছিল অগাধ পান্ডিত্য। তিনি ছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের একেবারে কাছের কুটনীতিবিদ। আর এই কণিকের পরামর্শ মতই ধৃতরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, যদিও বিদুরের নীতি তিনি শুনতেন কিন্তু গ্রহণ করতেন না। তিনি পুরোপুরি মেনে চলতেন কণিকের নীতি। কি ছিল সেই সব নীতির মূল অংশ। কণিকের নীতিকে চারটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে।

একঃ শত্রুর মৃত্যু, তাকে বাঁচিয়ে রাখলেই প্রতি পদে বিপদ।

দুইঃ সাম, দান, দন্ড ও ভেদ নীতিকে গুরুত্ব প্রদান।

তিনঃ ছদ্মবেশ ও ধূর্ততার আশ্রয় গ্রহন।

চারঃ গুপ্তচরবৃত্তি ও সতর্কতা।

পাঁচঃ নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে আপনজনকেও পরিহার করা।

এগুলোই ছিল কণিকনীতি। কণিক ছাড়াও আমরা শকুনের নামও খলনায়ক হিসাবে এনে থাকি। কিন্তু আমাদের মহাভারত ছেড়ে আসতে হবে রামায়ণ নামক মহাকাব্যে। রামায়ণে আমরা যে সব খলনায়ক কিংবা খলনায়িকাদের পেয়ে থাকি, তাদের ভূমিকাতে একটা বড়সড় অঘটন না ঘটলেও দায়ী তো অবশ্যই। তবে রামায়ণে যতটা গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, অতীতের ঘটনা সমূহকে কিংবা ভবিতব্যকে, ততটা গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি খলনায়ক কিংবা খলনায়িকাদের ভূমিকার উপর। খলনায়িকাদের মধ্যে দুজন মহিলার নাম উঠে আসে। এদের একজনের নাম হল মন্থরা আর অন্যজন হলেন দ্বিতীয় রাজমাতা কৈকেয়ী। যদিও মন্থরার ভূমিকাই ছিল উল্লেখযোগ্য। দিনের পর দিন কুমন্ত্রণা দানের মাধ্যমে কৈকেয়ীকে উত্যক্ত করে আসল কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিল, ততটা দায়ী করা যায় না কৈকেয়ীকে। কেননা তাঁর মাতৃপ্রীতি ছিল রামের বনবাস ও ভরতের সিংহাসন প্রাপ্তির লক্ষ্যে। এক্ষেত্রে তাঁকে খলনায়িকার আসনে অধিষ্ঠিত করা যায় না। তবে বিভীষণকে খলনায়কের মর্যাদা দিতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে রাবণের সঙ্গ ছেড়ে রামচন্দ্রের পক্ষে যোগদান করাই নয়, বিভিন্ন সময়ে লঙ্কার বিভিন্ন গোপন তথ্য তুলে ধরেছিলেন রামচন্দ্রের কাছে। মেঘনাথের মৃত্যু, রাবণের মৃত্যু- সবক্ষেত্রেই তাঁর পরোক্ষ ভূমিকা ছিল সর্বজনবিদিত।

চিত্র ঋণঃ উইকিপিডিয়া 

চলবে

উত্তর সম্পাদকীয়ঃ ট্রাম্পের পতন - শুভাশীষ পাইন

 বার্বি পুতুলের সাম্রাজ্যের শেষের দিন গোনা শুরু 

 শুভাশীষ পাইন

মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প, আপনার বার্বি ডল কালেকশনের মতো সাজানো সাম্রাজ্য আজ সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ২০২৬-এর মধ্যবর্তী নির্বাচনে আপনার দল শুধু হারেনি, ইতিহাসের পাতায় এমনভাবে হেরেছে যা আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আপনি ভেবেছিলেন, আপনি অপরাজেয়। আপনি ভেবেছিলেন, ভারতের মতো একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশকে আপনি আপনার ট্যারিফের চাবুক দিয়ে, আপনার ডিপ স্টেটের নোংরা খেলা দিয়ে নতজানু করে দেবেন। কিন্তু আজ আমেরিকার মানুষই আপনাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।

আপনার পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই আসে আপনার অহংকার। আপনি আমেরিকায় বসবাসকারী নিরীহ ভারতীয়দের, যারা নিজেদের মেধা দিয়ে আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাদের একটা অংশকে জোর করে ভারতে ফেরত পাঠিয়ে আপনি কি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন? আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে আপনি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের শেষ প্রহরী। কিন্তু আপনি ভুলে গিয়েছিলেন, আমেরিকা আজ আর শুধু শ্বেতাঙ্গদের দেশ নয়। আর ভারত আজ আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ নয়। ভারতের উপর ৫০ শতাংশ, ১০০ শতাংশ ট্যারিফ চাপিয়ে আপনি ভেবেছিলেন ভারতের অর্থনীতিকে আপনি ভেঙে দেবেন। কিন্তু আপনি ভুলে গিয়েছিলেন, ভারত আজ বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল অর্থনীতি। আপনার ট্যারিফে ভারতের কিছুই হয়নি, উল্টে আমেরিকার সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, পেট্রোলের দাম বেড়েছে আপনার ইরান যুদ্ধের কারণে। আমেরিকার মানুষ তাই আপনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।


আপনার সবচেয়ে জঘন্য খেলাটা ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। আপনি ডিপ স্টেটকে ব্যবহার করে, লক্ষ লক্ষ ডলার ফান্ডিং করে ভারতের তথাকথিত ককরোচ জনতা পার্টির মতো ভারত বিরোধী শক্তিগুলোকে মদত দিয়েছেন। আপনার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ভারতের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করা। মণিপুরকে আপনি জ্বালিয়েছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বকে অশান্ত করার জন্য আপনার ডিপ স্টেট দিনের পর দিন টাকা ঢেলেছে। আপনি ভেবেছিলেন, ভারতকে ভিতর থেকে ভেঙে দিলে ভারত আপনার কাছে মাথা নত করবে। কিন্তু আপনি জানেন না, ভারতবর্ষ কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়। এটা একটা সভ্যতা। এই সভ্যতা হাজার হাজার বছর ধরে বিদেশি আক্রমণ সহ্য করে টিকে আছে। আপনার মতো একজন ব্যবসায়ী, যে বার্বি ডল কালেকশনের মতো দেশ চালাতে চায়, সে এই সভ্যতাকে বুঝবে কি করে?

আজ টেক্সাসে আপনার হার, কানসাসে আপনার হার, সাউথ ক্যারোলাইনায় আপনার হার, ওহাইওতে আপনার হার, এগুলো শুধু কয়েকটা আসনের হার নয়। এটা আপনার নীতির হার। এটা আপনার ভারত বিরোধী নীতির হার। এটা আপনার ডিপ স্টেটের হার। আমেরিকার মানুষ আজ বুঝে গেছে, আপনি আমেরিকার জন্য কতটা বিপজ্জনক। আপনি আমেরিকাকে বিশ্বের কাছে একটা লুণ্ঠনকারী, একটা ভিখারি দেশে পরিণত করেছেন। আপনি যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে তেল দখল করতে চেয়েছেন, যেভাবে ভারতকে অস্থির করতে চেয়েছেন, তার জবাব আজ ব্যালট বক্সে এসেছে।


মনে রাখবেন মিস্টার ট্রাম্প, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যে ইংল্যান্ড একদিন ভারতকে শোষণ করেছিল, আজ সে নিজেই একটি ডুবন্ত নৌকা। আপনার আমেরিকাও সেই পথেই যাচ্ছে। আপনার এই পরাজয় কেবল শুরু। একদিন আসবে, যেদিন আপনার দেশ বিশ্বের দরবারে সেরা ভিখারি হিসেবে পরিচিত হবে। কারণ যে দেশ অন্যের ক্ষতি করে বড় হতে চায়, তার পতন অনিবার্য। ভারত আজ জেগে উঠেছে। ভারত আজ স্থিতিশীল, ভারত আজ শক্তিশালী। আর আপনার পতন, আপনার দলের পতনই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।


নিবন্ধের বক্তব্য লেখকের নিজস্ব

ধারাবাহিক ফিচারঃ জীবনের সফরনামা (১) - অরুণ কুমার রায়

 জীবনের সফরনামা 

 অরুণ কুমার রায় 

পঁচাশি হাজার পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় 'শহর নগর ডট কম' ব্লগজিন এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ওয়েব পত্রিকার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রয়াগরাজ নিবাসী বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়। তাঁর বেশ কিছু মূল্যবান লেখায় এই পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত যে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বহুচর্চিত ও উচ্চ প্রশংসিত  গ্রন্থ 'মহাকুম্ভ ইতিহাস' এই বল্গজিনেই ২০২৫ এর মহাকুম্ভ চলাকালীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অরুণ কুমার রায় পুনরায়  তাঁর নতুন ধারাবাহিক  ‘জীবনের সফরনামা’ নিয়ে কলম ধরেছেন । জীবনের চলার পথে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসা লেখকের কলমে উঠে আসছে তাঁদের কথা।  এই ধারাবাহিক হতে চলেছে তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনার এক অনন্য কোলাজ।  জীবনের এই চলার পথে কত কথা, কত মানুষের আনাগোনা থাকবে। সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নায় ঘেরা মানুষের এই জীবন-সফর। আশা রাখি, লেখকের কলমের জাদুতে সেই নীরব সফর আরও সরব ও সরস হয়ে উঠবে। আপনারাও নিয়মিত চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। সঙ্গে থাকুন এবং আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন। - সম্পাদক।)

"জীবন খাতার প্রতি পাতায়

যতই লেখ হিসাব নিকাশ কিছুই রবে না।

লুকোচুরির এই যে খেলায়

প্রাণের যত দেয়া নেয়া পূর্ণ হবে না।।"


 সফরনামা -১

মানুষের জীবন শুধু ক্ষণস্থায়ী নয়, তা পরম অনিশ্চয়তায় ভরা। যে কারণে আমাদের যে কোনো সফর, যে কোনো মিলন-সাক্ষাৎকার, ঝগড়া-বিবাদ, প্রেম-বিচ্ছেদ বা আনন্দ—সবই সেই মুহূর্তেই পূর্ণ বিরামচিহ্নে শেষ হয়ে যায় শুধু নয়, তার আর পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। তার কারণ, জীবনের এই সফরনামা যেকোনো স্টেশনে এসেই থেমে যেতে পারে।

***

এসবই যে আমরা জানি না তা নয়, কিন্তু ভুলে থাকি; মনে পড়ে শুধু কোনো বিশেষ ঘটনার মুহূর্তে। এই যেমন গতকাল আমার—কিংবা বলা ভালো আমাদের সবার জীবনের এই সফরনামায়—আমি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম, যা অত্যন্ত বিষাদপূর্ণ ও শোকাবহ বার্তা বহন করে এনেছে। 

এই সমস্ত বহমান ঘটনার মধ্য দিয়ে একজন লেখক এগিয়ে যাবেন ঠিকই, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার এই মুহূর্তেই আবার ঘটনার বর্ণনায় তাকে পিছিয়ে যেতেও হবে - যদিও 'সফরনামা' সাধারণত এগিয়ে যাওয়ার পথকেই বলা হয়ে থাকে।

***

কোনো একজন বর্ষীয়ান মানুষকে অক্ষরের বিন্যাসে মহিমান্বিত করে তোলার খামোখা কোনো মানে হয় না ঠিকই, কিন্তু একজন কলম-লিখিয়ে হিসেবে কোনো ঘটনার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর স্মৃতিময় কথাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চলে আসতে বাধ্য। আবার এটাও ঠিক, যে আপনি আমি ও আমরা অতি সাধারণরাই তো কোনো এক মহান ঘটনার মহানায়ক ও চরিত্র হয়ে উঠি। সুতরাং, যে কোনো ঘটনার বিবরণগুলোর মধ্য থেকেই হয়তো আমরা সন্ধান পেতে পারি এবং জানতে পারি—অতি সাধারণ মানুষটির মধ্যেও ছিল এক অসাধারণ জিজীবিষা। ঠিক যেমন এই সফরনামার আগামী পর্বগুলোতে আমরা মুখোমুখি হতে চলেছি এমন কিছু পরিচিত, বিশিষ্ট ও অতি বিশিষ্ট কৃতি মানুষের, যাঁরা নিজেদের মেধা ও অনন্য জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাধারণের ক্যানভাসেই এঁকেছেন এক একটি অসাধারণ সফলতার চিত্র । 

হ্যাঁ পাঠক, গতকালের উল্লেখিত ঘটনার মূল চরিত্র গতকাল ঊষাকালে ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি যখন তা জানতে পারছি, ঠিক সেই মুহূর্তটাই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।  আজ সকাল থেকেই আমার গৃহে বেশ একটু বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে। আসলে আমাদের একমাত্র, ছোট্ট একরত্তি আত্মজা তার কর্মস্থল দক্ষিণ ভারতে ফিরে যাবে। সে ও তার মা ওই মুহূর্তে ভিতরের ঘরে একে অপরকে জড়িয়ে...। মাঝে মাঝে তাদের যে কথাগুলো আমার কানে আসছে, তা প্রায় পৃথিবীর সমস্ত  মা ও তার সন্তানের মধ্যে ঠিক বাড়ি থেকে বেরুবার সময়ে হয়েই থাকে। এই হৃদয় -নিংড়ানো আত্মিক সম্পর্কের লৌকিক আচারকে আমরা আমাদের মতো করে গড়ে নিয়েছি মৃন্ময়ী উমার চিন্ময়ী রূপের মধ্যে। তাই এই পুজোয় বাঙালির ঘরে ঘরে সন্তান-সন্ততিদের বাবা-মা, ঠাকুমা-দাদুর কাছে আসা—কী আনন্দ, কী উল্লাস! আর আজ তাদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার ঠিক এই মুহূর্তে তার বিপরীত।

আমি সামনের ঘরে বসে সেই মুহূর্তে, গত কয়েকদিন ধরে শহরের এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলার মহানবমীর দিনে নিজের প্রাসাদে পরলোকগমনের "শোক সংবাদ" লিখতে চাইছি। গত কয়েকদিন ধরে সেই লেখার সূত্র সন্ধানের তল্লাশে যখন মনের মধ্যে তোলপাড় চলছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই লেখাটির শিরোনাম খুঁজে পেলাম। নোটপ্যাডে সঙ্গে সঙ্গে তা লিখে ফেলতে না ফেলতেই মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটি পরিচিত মুঠোফোনের নম্বর। এই মুহূর্তে এই ফোন তো আসা উচিত নয়... তাহলে কী!

***

আশঙ্কাটাই অবশেষে সত্যি হলো। শ্রী বিজেন্দ্রনাথ দেহ রেখেছেন। বিপত্নীক বিজেন্দ্রনাথ বাবুর বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৮৪ বছর। এই স্বাধীনচেতা অশীতিপর মানুষটি চলে যাওয়ার আগের দিন রাত্রেও নিজের সান্ধ্য ভ্রমণের বন্ধুদের নিয়ে ফ্ল্যাটে একটি বিজয়া সম্মেলন তথা মিলন সভার আয়োজন করেছিলেন। আসলে এই মিলন সভাটি গত মাসেই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর আকস্মিক অসুস্থতার কারণে তা স্থগিত করতে হয়। বিজয়া দশমীর দিন চিরাচরিত প্রথা মাফিক তাঁকে বিজয়ার প্রণাম জানানো হয়েছিল। এমনকি নবমীর দিন তিনি দেশের বাড়ির প্রাচীন পুজোও দেখে এসেছেন; পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর সেই শেষ হাসিমুখের ছবি দেখা গেছে। বৃহত্তর পরিবারের তিনি ছিলেন এই মুহূর্তের অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান অভিভাবক। শ্রী বিজেন্দ্রনাথ বাবুর একমাত্র পুত্র বিপুলচন্দ্র—৪৮ বছর বয়সী, মাঝারি উচ্চতার, ইন্ডিয়ান আর্মির প্রাক্তন কর্নেল। প্রায় চার বছর হতে চলল  ভারতীয় সেনার চাকরি ছেড়ে একটি বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বহাল রয়েছেন তিনি। —হয়তো শ্রী বিজেন্দ্রনাথ বাবুর জীবন-সফরের কাহিনীটি এখানেই ইতি টানা যেত, কিন্তু তা করলে মনে হয় বড্ড বেশি সাবধানী হয়ে এক সফল সফরনামার সত্য কাহিনীর অপমৃত্যু ঘটানো হতো। মনে কি তবে কোনো ভয় বা সঙ্কোচ কাজ করছে যে, কোন সম্পর্কের টানাপোড়েন ঠিকভাবে পাঠকের দরবারে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে কি না ?

বিজেন্দ্রনাথ বাবুর নিজস্ব জীবনকাহিনীর মধ্যেও কিন্তু শোক ও দুঃখের এক গভীর স্রোত ছিল, যা পেরিয়ে তাঁকে ধীর পায়ে সফলতার দিকে অগ্রসর হতে হয়েছে। দীর্ঘ এলাহাবাদের প্রবাস জীবন কাটিয়ে তাঁর বাংলার মাটিতে ফিরে আসা এই মাত্র ১১ বছর। তাঁর দীর্ঘ এলাহাবাদ জীবনের স্মৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই শোক ও সফলতার কাহিনী, যেখান থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে আনা হচ্ছে।

কর্নেল বিপুলচন্দ্র ছিলেন শ্রী বিজেন্দ্রনাথ বাবুর তৃতীয় সন্তান। তাঁর প্রথম কন্যা সন্তানটি মাত্র ১১ বছর বয়সে এক গরমের ছুটিতে মামার বাড়ি ‘হরিণঘাটা’য় এসে আর কোনোদিন ফিরে যায়নি। কোনো এক অলস দুপুরে, সবার চোখের আড়ালে, মেয়েটি তার নতুন পাতানো গ্রাম্য সইয়ের সঙ্গে এক বিশাল দিঘিতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল। ওদের মনে সেই মুহূর্তে আরতি সাহা কিংবা বুলা চৌধুরী হয়ে ওঠার কোনো স্বপ্ন দানা বাঁধছিল কি না, কেউ আজও তা জানতে পারেনি। কিন্তু সেদিন সেই ছোট্ট মেয়েটি পুকুরের টলটলে জলের গভীরে হারিয়ে গেল, আর কোনোদিন উঠে এল না।

পরবর্তীতে বিজেন্দ্রনাথ বাবুর আরও একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান মাত্র তিন মাস আয়ু নিয়ে আসে। দুধে আলতা তার রঙ ছিল। এলাহাবাদে তিনি ও তাঁর পরিজনেরা মিলে একদিন তার ছোট্ট শরীরটাকে সাদা থানে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল যমুনার তীরে। কঠিন নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়েই তার এই অল্পায়ু পৃথিবীর জীবন -সফরনামায় চলে আসা ও ফিরে যাওয়া। বিজেন্দ্রনাথবাবুর জীবন সফরনামা আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাদামাটা, তেমন কোনো বিশেষ চমক নেই এতে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, বিদেশ-বিভুঁইয়ে তাঁর এবং তাঁর মতো শত শত বিজেন্দ্রনাথ বাবুর এই রোজকার লড়াইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ জীবনসংগ্রাম, সাহসিকতা আর হার না মানার জেদ। তবে এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ চলায় বিজেন্দ্রনাথ বাবুর একার লড়াই যেমন সত্য, তেমনই সত্য তাঁর ঘরের রমণীদের নীরব আত্মত্যাগ ও অবদান। বাঙালি জীবনে মায়েদের স্থান ও অবদান তো সবকিছুর ঊর্ধ্বে। দুটি সন্তানের অকালমৃত্যুর বুকফাটা হাহাকার ও মহাশূন্যতাকে নিজের আঁচলে চেপে রেখে যিনি সংসারকে ধরে রেখেছিলেন, তিনি বিপুলচন্দ্রের মা। মায়ের সেই অসীম ধৈর্য আর বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের যুগলবন্দিতেই মাত্র ষোলো বছর বয়সে ছেলে বিপুলচন্দ্র ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি'র পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে সিলেক্ট হতে পেরেছিল এবং ভারতীয় সেনায় যোগ দেওয়ার সাহস পেয়েছিল। প্রবাসে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার এই জেদ ও আত্মত্যাগ আসলে সমস্ত প্রবাসী বাঙালি দম্পতির বুকেই খোদাই করা থাকে।শুধু বিজেন্দ্রনাথ বাবু বা তাঁর উচ্চ মেধাবী ছেলে বিপুলচন্দ্রই নন, এমন অনেক প্রবাসী বাঙালির সন্তান আছেন যারা অ্যাটর্নি জেনারেল, অ্যাকাউন্টস জেনারেল, বিচারপতি, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, নামী চিকিৎসক কিংবা নামকরা স্থপতি আর আইনবিদ হয়েছেন। বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন, বিশাল সব সৌধ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পুস্তকালয়, খেলার মাঠ তৈরি করেছেন; মানুষের প্রাণ বাঁচাতে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছেন। আবার গান, বাজনা, নাটক, যাত্রা, নিজ ভাষা, সাহিত্যের সেবায় মেতে উঠেছেন, কিন্তু এরা কেউই প্রদেশ ও স্থানীয় রাজনীতির আঙিনায় পা বাড়াননি। দু-একটা অপবাদ যে নেই তা নয়, তবে প্রবাসে বৃহত্তর ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কাটিয়েও তারা কখনোই ওখানকার প্রদেশ বা স্থানীয় মানুষের কাছে নিজেদের মূল নিবাসী বলে দাবি করেননি। উল্টে, তাদের সঙ্গেই মিলেমিশে সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে উঠেছেন। আর তাই আজও বিজেন্দ্রনাথ বাবুরা ও তাঁদের সহধর্মিণীরা ওখান থেকে চলে গেলে স্থানীয় মানুষ তাঁদের কথা মনে করে শ্রদ্ধায় গুণগান গায়।

জীবন সফরনামার একেবারে শুরুর দিকেই বিজেন্দ্রনাথ বাবুর কথা চলে আসাটা হয়তো একটা ঘটনাচক্র মাত্র। তবুও যখন বিজেন্দ্রনাথ বাবুর কথা দিয়ে শুরুই হলো এই লেখা, তখন প্রবাসী বাঙালিদের জীবনের এই নেপথ্য নায়িকাদের কথা আর তাঁদের সামগ্রিক লড়াই নিয়ে এই কিছু কথা বলাটা বড্ড দরকারি ছিল। অবশ্য আমরা দেখলাম, বিজেন্দ্রনাথ বাবু তাঁর জীবনের শেষ চোদ্দ-পনেরো বছর নিজের মাটিতেই কাটিয়েছেন। মৃত্যুর আগের রাতেও সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে বিজয়ার মিলন উৎসবে মেতেছিলেন, আর তারপর রাতে নিজের বিছানায় শুয়ে একাকীই চিরঘুমে বিদায় নিলেন। সামনে কেউ নেই, শেষ সময়ে আসলে কেউ থাকেও না— । একাকী এই সফরনামা ভীষণভাবে অনিশ্চিত। সময়ের অন্তহীন পথ ধরে আমরাও সবাই তো আসলে হেঁটে চলেছি এক অনন্ত যাত্রাপথে। যাঁরা চলে যান, তাঁরা রেখে যান কেবলই কিছু অমলিন স্মৃতি। জীবনের সফরনামায়, রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শেষ করলাম এই পর্ব—

"ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানি,

মিলনের উৎসবের ফুরাবে না তো বাণী।"

চলবে।

আগামী পর্বে  অবগুণ্ঠিতা, আভিজাত্য বহনকারী এক নারীর জীবন সফরনামা।

 



সংস্কৃতি সংবাদঃ শারদ সাহিত্য পত্রিকা প্রকশের নানা অনুষ্ঠান

 শারদ সাহিত্য পত্রিকা প্রকশের নানা অনুষ্ঠান

শহর নগর প্রতিবেদনঃ শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে বাঙলার বিভিন্ন প্রান্তের লিটল ম্যাগাজিনগুলো মেতে ওঠে তাদের সাধ্যমত উৎসব সংখ্যা প্রকাশের চেষ্টায়। অনেক অনিয়মিত লিটলম্যাগেরও মুখ দেখা যায় এই উৎসব মরশুমে। এই রকমই কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশনা অনুষ্ঠানের সংবাদ আমাদের দপ্তরে এসেছে। 

গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে কবি ও নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য সম্পাদিত রঘুবংশ পত্রিকার শারদ সংখ্যা। বহু বিশিষ্ট কবি ও লেখকের লেখায় সেজে উঠেছে সংখ্যাটি। রাসবিহারী মুক্তাঙ্গনে গণপতি বসু স্মৃতিমঞ্চের এই অনুষ্ঠানে পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন করেন কবি রামকিশোর ভট্টাচার্য, তাঁকে সহযোগিতা করেন প্রখ্যাত নাট্য আলোচক রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়, কবি ও গল্পকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এবং টিম রঘুবংশ-এর পক্ষে কার্যকরী সম্পাদক মৃতুঞ্জয় জানা, ড. শান্তনু পান্ডা, ইন্দ্রদীপ সিনহা, রুবি আদক পান্ডা প্রমুখ কবি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সম্পাদক শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য স্বয়ং।

অনুষ্ঠানে ডঃ রুবী আদক পান্ডার প্রশ্নোত্তরে 'প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব' গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করে আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন কবি নৃপেন চক্রবর্তী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সভাপতি ডঃ শান্তনু পান্ডা।

গত ২ রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর ১৫৮ তম জন্মদিবসে বাপুজিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে খড়িগাড়া গ্রামের প্রবেশপথে মনোরম সোনাঝুরি বনে প্রকাশিত হলো 'স্পর্শ' পত্রিকার শারদীয় উৎসব সংখ্যা ১৪৩৩। বিশিষ্ট কবি ও গল্পকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, 'স্পর্শ' সম্পাদক কবি নবকুমার শীল, শিশু সাহিত্যিক ও কবি তারাশংকর চক্রবর্তী, শ্যামল জানা, অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপন কুমার কর্মকার, নির্মল রায়, সন্তু কর ও শীতল বিশ্বাসের উপস্থিতিতে সংখ্যাটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয়।  

এছাড়াও অনুষ্ঠান চলাকালীন উপস্থিত হন কবি আলোক মণ্ডল, বিকাশ মহাদণ্ড, অনুশ্রী সামুই প্রমুখ কবিরা।

সুন্দর সাজানো, ঝকঝকে প্রচ্ছদ, কাগজ ও ছাপাই, সবেতেই নজর কেড়েছে এই সংখ্যাটি। প্রচ্ছদ শিল্পী সকলের প্রিয় শ্রীমহাদেব। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবিরা কবিতা পাঠ করেন। এছাড়াও এদিনের অনুষ্ঠানে কবি অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ 'দ্রোহ লিপি' রং আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন কবি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। 

গত ১১ অক্টোবর বেঙ্গাই শরৎ  বিদ্যাপীঠের কমিউনিটি হলে  প্রকাশিত হয় সমীর ঘোষ সম্পাদিত "আবহমান" সাহিত্য পত্রিকার পূজা সংখ্যা। উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন কবি, সাহিত্যিক এবং সাহিত্য স্বজন। কাজল রায়ের উদ্বোধনী সংগীত দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর বর্তমান সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক প্রাবন্ধিক প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রাবন্ধিক লক্ষীকান্ত পাল, প্রসেনজিৎ সরকার, কবি মদনমোহন সরকার, গুরুদাস দাস, সাংবাদিক ও লেখক শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী, সমাজসেবী বিশ্বকান্তি সেন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশন করেন উপস্থিত কবি ও শিল্পীরা। প্রায় শতাধিক কবি-সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। দেবী দুর্গার বন্দনা গান দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষিত হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেখ জাহাঙ্গীর।

প্রতিবেদকঃ জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র (পর্ব ১৬) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

 শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র 

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র" । প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - ষোলো - সম্পাদক)


আমরা রামায়ন পাঠ করে শুধু বিশেষ কয়েকটি চরিত্র নিয়েই আলোচনা করি। অনেক চরিত্র অনালোকিত থেকে যায়। সেভাবে পাদ প্রদীপের আলোয় আসে না। আজ এই চরিত্র নিয়ে আলোচনা করছি।

শত্রুঘ্ন ছিলেন রাজা দশরথের কনিষ্ঠ পুত্র, তাঁর মাতা ছিলেন সুমিত্রা। লক্ষ্মণ ছিলেন শত্রুঘ্নের সহোদর ভ্রাতা। আর ভরত ও রামচন্দ্র ছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। পুরাণ অনুযায়ী তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের অবতার বলে বর্ণনা করা হয়। তিনিও ছিলেন একজন বীর ও ন্যায়ের প্রতীক। শিক্ষা সমাপ্তে তিনি একজন রাজ হিতৈষী হিসাবে রাজার আদেশ পালন করেছিলেন।কোনদিন তার অন্যথা হয়নি।  শত্রুঘ্নের বিবাহ হয়েছিল সীতার খুড়তুতো বোন শ্রুতকীর্তির সাথে। তাঁর দুই সন্তান, সুবাহু ও শত্রুঘাতী। এই শত্রুঘ্নের বিভিন্ন নামের মধ্যে একটি নাম ছিল বেশ প্রচলিত। তাঁর নাম ছিল রিপুদমন। রিপুদমনের প্রধান গুনের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রতিটি কার্যে। লোভ, অন্যায়, হিংসা, বিদ্বেষের কোন ছায়া তাঁর চরিত্রে প্রকাশ পায়নি। তাঁর এইসব গুনের বর্হিপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই রামের অবর্তমানে অযোধ্যা নগরীতে ন্যায়ের শাসনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমান করা। রামায়নে দশরথের চার পুত্রের সখ্যতা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু রামচন্দ্রের সাথে লক্ষ্মণ ও ভরতের সাথে শত্রুঘ্নের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ছিল একটু বেশিই। রামচন্দ্রের বনবাসকালে ভরতের সাথে শত্রুঘ্ন একদিকে পরিবারের দেখভাল আর অন্যদিকে রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভরত একইসাথে নন্দীগ্রাম ও অযোধ্যা শাসনের ভার লাভ করেছিলেন।আর ঐ সময়ে প্রজা পালনে যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন শত্রুঘ্ন। রামায়নে রামচন্দ্রের অবর্তমানে এমন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি যেখানে রাজ্য পরিচালনাতে কোন প্রশ্নচিহ্ন আমাদের চোখে পড়েছে। রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখার মত দুরূহ কাজও তিনি ভরতের সাথে যৌথভাবে পালন করেছিলেন।কোন অবস্থাতেই অযোধ্যা নগরীর নিজেরা রাজা বলে ভাবতেন না।ভরতের মত শত্রুঘ্নও রামচন্দ্রের দাস ভাবতেন। সাধারন অবস্থায় শত্রুঘ্নের মধ্যে ক্রোধের বর্হিপ্রকাশ আমরা দেখিনি। শুধু একবার তাঁর ক্রোধের প্রকাশ ঘটেছিল মন্থরার প্রতি কটুক্তি করা। এ ছাড়া আর কোন অবস্থাতেই তাঁর চরিত্রে কলঙ্কিত কোন অধ্যায় আমরা দেখিনি।

শত্রুঘ্ন যে বীর ছিলেন তার প্রমাণ আমরা পেয়ে থাকি। রামের নির্দেশে শত্রুঘ্ন মধুপুর রাজ্যের অসুর সম্রাট লবনাসুরকে বধ করে রাজ্য অযোধ্যার দখলে আনেন। রামচন্দ্র এই কার্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ঐ মধুপুর রাজ্যের রাজা ঘোষনা করেন। শত্রুঘ্ন ঐ রাজ্যের নামকরণে পরিবর্তন আনেন।নতুন নাম হয় মথুরা। এহেন শত্রুঘ্নের জন্যই কিন্তু রামচন্দ্র চৌদ্দ বছর বনবাস থেকে ফিরে এসেও নিজের রাজ্যে ন্যায়ের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হয়ত প্রজাপালক হিসাবে রামচন্দ্রের নাম উচ্চারিত হয় এককভাবে, কিন্তু শত্রুঘ্ন ও ভরতের ভূমিকা ছিল মুখ্য। শত্রুঘ্নের মধ্যে কোনদিন কোন বৈরিতা লক্ষ্য করা যায়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই উপেক্ষিত নায়ক পর্দার পেছনেই থেকে গেছেন। কথিত আছে যে, শত্রুঘ্নও নাকি সরযূ নদীতে রামচন্দ্রের মতই বিলীন হয়ে যান।

চলবে

----------------------------------------------------------------------------------------

সফরনামা

আসছে বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়ের নতুন ধারাবাহিক ‘সফরনামা'

চুরাশি হাজার পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় 'শহর নগর ডট কম' ব্লগজিন এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ওয়েব পত্রিকার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রয়াগরাজ নিবাসী বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়। তাঁর বেশ কিছু মূল্যবান লেখায় এই পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত যে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বহুচর্চিত ও উচ্চ প্রশংসিত  গ্রন্থ 'মহাকুম্ভ ইতিহাস' এই বল্গজিনেই ২০২৫ এর মহাকুম্ভ চলাকালীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অরুণ কুমার রায় পুনরায় আসছেন তাঁর নতুন ধারাবাহিক  ‘সফরনামা’ নিয়ে। জীবনের চলার পথে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসা লেখকের কলমে উঠে আসছে তাঁদের কথা।  জানি না তাঁর এই 'সফরনামা' শেষ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসের আকার নেবে কি না। এই ধারাবাহিক হতে চলেছে তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনার এক অনন্য কোলাজ।  জীবনের এই চলার পথে কত কথা, কত মানুষের আনাগোনা থাকবে। সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নায় ঘেরা মানুষের এই জীবন-সফর। আশা রাখি, লেখকের কলমের জাদুতে সেই নীরব সফর আরও সরব ও সরস হয়ে উঠবে। আগামী ৫ নভেম্বর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। সঙ্গে থাকুন এবং আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন। - সম্পাদক।)

------------------------------------------------------------------------------------------

ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৬২ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত  বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ' ।  প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসছে সেই অগ্নিযুগের কাহিনি এবং আগ্রহী পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি। আজ বাষট্টি পর্ব - সম্পাদক ।) 

আগের আলোচনায় বলেছিলাম ১৯০২ এ শুরু হওয়া সিক্রেট মিশনের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি দাঁড়িয়ে ছিল শক্ত ভিত্তিভূমির উপর। ব্রিটিশদের চক্রান্তে উৎখাত হওয়া রাজা,জমিদার, সামন্ত ও জোতদারগণ জঙ্গলমহলের মাটিতেই প্রথম প্রত্যাঘাত হানে কালাকানুনের বিরুদ্ধে। সংঘবদ্ধ হন "নয়মহল" এর রাজা, জমিদার, পত্তনিদার ও জোতদারগণ। বাংলা বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভের পরই একতরফাভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ক্ষমতা কায়েম করে। প্রথম ধাপেই কোম্পানি রেসিডেন্ট নিয়োগ করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে সামরিক বাহিনী নিয়ে ফার্গুসনের নেতৃত্বে জন গ্রাহাম চলেছে ঝাড়গ্রাম, ধেড়ুয়া, বলরামপুর সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে সেনা শিবির স্থাপন করলো ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার হাল হকিকত জানতে। ঝাড়গ্রামের পর ধলভূমের সুপুরে সেনা ছাউনি ফেলল। এখানকার সামন্তভূম (ছাতনা), ধলভূম (সুপুর ও অম্বিকানগর), জমিদারকে ডেকে পাঠানো হল এবং তাদের হাত করল কোম্পানি। তাদের খাজনা ধার্য করা হল - ১) ছাতনা - ৮৭৯ টাকা ১১ আনা, সুপুর পরগণা - ৫০ টাকা এবং অম্বিকানগর পরগণার- ৩১১ টাকা । ছাতনার জমিদার কোম্পানি নির্ধারিত খাজনা মিটিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানির আর্জি মতো এক হাজার পাইক পাঠিয়েছিলেন কোম্পানির সাহায্য হিসেবে। শুধু ব্যতিক্রমী হিসেবে রয়ে গেলেন রাইপুরের জমিদার প্রবল প্রতাপশালী - দুর্জন সিংহ ও অম্বিকানগরের জমিদার অনন্তলাল ধবলদেও।‌ অম্বিকানগরের জমিদার প্রথমে খাজনা মিটিয়ে দেওয়ার কথা বললেও তিনি ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করলেন। তিনি শুরু করলেন কুঠিবাড়ি, ডাক বিভাগের মেইল ব্যাগ লুঠ। রাজস্ব বিভাগ, আদায়কারী, নায়েব মূল টার্গেট হয়ে উঠলো। জঙ্গলমহলের মাটিতে পা রেখেই ব্রিটিশ সামরিক কর্তা ও উচ্চপদস্থ প্রশাসকবৃন্দ ভূমি সংস্কারের নামে লুঠতরাজ ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করে দিল। ১৭৮৬ সালে বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে এলো লর্ড কর্ণওয়ালিশ। সে আবার এক কাটা উপরে উঠে ১৭৮৯-'৯০ সালে চালু করে দিল দশশালা বন্দোবস্ত। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে দিল। যে সমস্ত আইন বা ভূমি সংস্কার বিধি চালু করছে তার পিছনে রয়েছে শোষনের মহা দূরভিসন্ধি। সাঁড়াশি অভিযানের মতো জমিদার, জোতদার কিম্বা বড় রায়তদের সঙ্গে সাধারণ কৃষকদেরও শোষণের যাঁতাকলে ফেলে দিল। বর্ধিত হারে খাজনা না দিলে সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি থেকে উচ্ছেদ করা হবে জমিদারদের। ঘটলোও তাই। বিপ্লবী রাজা রাইচরণের কাকা পত্তনিদার নিমাইচরণের আমলে খাজনা বকেয়া পড়ায় সূর্যাস্ত আইনের কোপে পড়ে জমিদারি নিলাম হয়ে গেল। প্রথমে কিনেছিলেন সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর। তারও কিছুদিন পর কেনেন শরৎ কামিনী দেবী। সবশেষে তিনি ছেড়ে দিলে জমিদারি কিনেছিলেন দ্বারভাঙার মহারাজ কামেশ্বর সিং। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো,- হীড়বাঁধ থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল হাঁসাডাঙ্গে বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ গোস্বামীদের (নরেণ গোঁসাই)  কাছারি বাড়ি ছিল। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ গোস্বামীর নামে ছিল এই জমিদারি। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পনা এমনকি আত্মগোপন করার উপযুক্ত স্থান এই কাছারি বাড়িটি । 

সাবেক আমলের ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করায় ক্ষমতা খর্ব করা হল জমিদারির এবং তাঁদের সম্মানজনক দায়দায়িত্ব। শেষ হয়ে গেল বাংলার চিরায়ত সেবা ভিত্তিক ভূমিদান ব্যবস্থা। জমিদারি ব্যবস্থায় ছিল পাইক বরকন্দাজদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা বংশানুক্রমে এতদিন সেবার বিনিময়ে নিষ্কর পাইকান জমি ভোগদখল করে আসছিল। এই কালা কানুনের ফলে বর্ধিত হারে খাজনা দিতে হবে সাধারন এই প্রজাকুলকে । তাদেরও ক্ষমতা খর্ব ও গুরুত্বহীন করে দিল । চারিদিকে জোট বেঁধে তীব্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু হল জঙ্গলমহলে ।

চলবে

উত্তর সম্পাদকীয়ঃ ১ নভেম্বর, পুরুলিয়ার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ নিবন্ধ - ভজন দত্ত

 পুরুলিয়ার জন্মদিন, এক দীর্ঘ অহিংস আন্দোলনের ইতিহাস 

 ভজন দত্ত

পাঠক মনে করুন, ১৯০৫- এর উত্তাল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলে  প্রায় ছ’বছর পর ১২ ডিসেম্বর, ১৯১১, দিল্লির দরবার উৎসবে রাজা পঞ্চম জর্জ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তাতে, বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করা হয় বলেই আমরা সবাই জানি। দেখা যাক কি কি ঘোষণা! 

# রাজধানী কোলকাতা থেকে দিল্লিতে চলে যাবে। (নিরাপদে থাকার জন্য। আন্দোলন, ডেপুটেশন, বিদ্রোহ, অন্তর্ঘাত এসব এড়ানো যাবে। বাঙলা ও বাঙালি জাতির থেকে দূরে থাকা যাবে।)

# বাঙলাদেশকে আবার দু’ভাগ করে দুটি রাজ্য হবে। (তাহলে রদ আর কি হলো?)  তার একটি রাজ্য বাঙলাদেশ (পূর্ববঙ্গ সহ), রাজধানী কোলকাতা। অপরটির নাম হবে বিহার-উড়িষ্যা, রাজধানী হবে পাটনা। ঐ ঘোষনাতেই মানভূম জেলাকে বিহার-উড়িষ্যা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। 

তৎকালীন মানভূম, বর্তমান পুরুলিয়া জেলার মানুষদের কাছে এই সিদ্ধান্তটি মেনে নেওয়া ছিল খুবই কষ্টকর। ১ এপ্রিল,১৯১২ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। মানভূমবাসীদের সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যার ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতির যোগ তেমন ছিল না, বাংলার সঙ্গে  যোগাযোগই ছিল বেশি। শুধু মানভূম নয় সুবর্ণরেখা নদী পেরিয়ে রাঁচি এমন কি টাটা বা জামশেদপুর পর্যন্ত এক বিরাট এলাকার মানুষ ছিলেন বাংলাভাষী। অনেকে এই এলাকাকে  'গ্রেটার বেঙ্গল' বলার পক্ষপাতি। ব্রিটিশ সরকার বাংলা ভাষায় কথা বলা এই বিরাট এলাকাকে ঠেলে দিল বিহার-উড়িষ্যা প্রদেশে। বিভেদের কৌশলে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা ছাড়া ব্রিটিশরা আর কি চায়! মানভূমবাসীদের প্রতি ব্রিটিশ সরকার ক্রোধ ও প্রতিহিংসাবশত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কোম্পানি  এই অঞ্চলে প্রবেশের সময় থেকেই প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।প্রজাদের সঙ্গে সরাসরি  কোম্পানির লড়াই হয়। সেই লড়াইয়ের ইতিহাস প্রায় পঁয়ষট্টি বছরের। ১৭৬৭-১৮৩২। ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী ও ঐতিহাসিকরা এদিককার স্বাধীনচেতা সাধারণ অন্তজ মানুষদের এ লড়াইকে নাম দিলেন ‘চুয়াড়’ বিদ্রোহ বলে। দেশীয় ইতিহাসবিদরাও সেই নামই মেনে নিলেন বিনা বাক্যব্যয়ে। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলন ছিল সাধারণ অন্তজশ্রেণির আন্দোলন। ১৮৩২ এ ‘গঙ্গানারায়ণ সিংহ-র হাঙ্গামা’ এই অঞ্চলে এক ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছিল। ১৮৫৫ তে সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন অল্প পরিমাণে হলেও মানভূমে লেগেছিল। ১৮৫৭-য় সিপাহী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য  পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিং-কে দশমাস ব্রিটিশ কারাগারে কাটাতে হয়। মানভূম ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনও রাজা বা জমিদার বন্দি হননি। মানভূমবাসীর এই বিরোধিতার প্রতিশোধ ব্রিটিশরা নিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে তাদের চিরতরে নির্বাসিত করে, বিহার-উড়িষ্যা প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করে।

মানভূম জেলাকে বিহার-উড়িষ্যায় সংযুক্তির বিরুদ্ধে প্রথমদিন থেকেই মানভূমে বিক্ষোভ হয়েছিল। কোলকাতা থেকে পুরুলিয়া শহরের দূরত্ব রেলপথে ৩২৬ কিমি, অপরদিকে পাটনার দূরত্ব ছিল ৩৮০ কিমি । এই দূরত্ব শতবর্ষ আগে অতিক্রম করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। প্রত্যন্ত বাংলাভাষী এই এলাকাটি কেন বাংলাদেশে বা স্বভূমে থাকতে পারবে না? সেকথা জানতে চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়, আন্দোলনও হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্বদান করেন পুরুলিয়া আদালতের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার, শরৎচন্দ্র সেন প্রমুখ। তাঁদের সহায়তা করেন কলিয়ারি মালিক, ব্যবসায়ী ও কয়েকজন জমিদার। সরকার এর পরিপ্রেক্ষিতে বিহার-উড়িষ্যা প্রদেশের গভর্ণরকে এবিষয়ে রিপোর্ট দিতে বলেন।মানভূমের বিশিষ্ট গবেষক সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপলব্ধি করতে পারেননি যে মানভূম ও ধলভূমের বাংলা ভাষাভাষী এক বৃহৎ অংশকে বিহার- উড়িষ্যা রাজ্যে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, সে অঞ্চলগুলি প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গদেশেরই অংশ হিসাবে গণ্য হয়ে এসেছে।”  আবুল ফজলের "আইন- ই-আকবরী"  গ্রন্থেও দেখা যায় সে সময় সুবা বাংলা যে ১৯ টি সরকারে বিভক্ত ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল মান্দারণ। ধলভূম ও মানভূম ছিল মান্দারণ সরকারের অন্তর্ভূক্ত।১৯১২ থেকেই মানভূমবাসী বিহার- উড়িষ্যা প্রদেশে সংযুক্তির প্রতিবাদে আবেদন- নিবেদনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন।তারা ব্রিটিশ সরকারকে আবেদনে জানালেন, মানভূমের ভৌগোলিক ও জাতিগত অবস্থান, ইতিহাস, ভাষা, আইনকানুন, জমি ও শাসনবিধি, বিচারের সাধারণ নিয়মকানুন প্রচলিত আইন  সবকিছুই তাদের বাংলাদেশের মতো, তবে কেন তাদের বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে! তাঁরা ভারত সরকারকে জানান, তাঁরা বাংলাদেশের মধ্যেই থাকতে চান। তাঁরা এও বলেন, বিহারিদের কাছে তারা কোনদিন  মর্যাদা পাবেন না এমন কি আইনসভায় নিজেদের প্রতিনিধি ঠিকঠাক পাঠাতে পারবেন না। ব্রিটিশ সরকার এই সব যুক্তি অগ্রাহ্য করে । বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশের প্রধান সেক্রেটারি যে রিপোর্ট দিলেন, তাতে বলা হল, ওসব ভীতি অমূলক। দিল্লী দরবারে ভারতের বড়লাট আনুষ্ঠানিক ভাবে যে ঘোষণা করেছেন তাকে বানচাল করা হলে জনগনের মধ্যে সরকারের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দেবে। তিনি মন্তব্য করেন, "It seems very desirable from all points of view that further agitation on the subject should be discourage* "প্রথমদিকের এই আবেদন-নিবেদনের পরিণতি এটাই। এর কারণ কি?  বিভিন্ন গবেষকগণের মত থেকে বলতে পারি -

১। এরকম একটি বিষয় নিয়ে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। 

২। সেই সময় সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বর অনুপস্থিতি।

৩।  বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের বোঝানোর ব্যর্থতা। 

৪। আবেদন- নিবেদন পদ্ধতির উপর আস্থা রাখা।

৫। পুরুলিয়া কোর্টের কয়েকজনমাত্র আইনজীবী এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন। তাঁরা, তাঁদের পেশাগত কারণেই সেইসময় প্রবল ব্রিটিশ বিরোধীতা করতে পারেন নি।

৬। বিষয়টি নিয়ে সারা বাংলাদেশে জনমত ও আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারা।

৭। বাংলা প্রদেশের নেতৃবৃন্দ সে সময় বঙ্গভঙ্গ রদ করতে পেরেছেন এই সাফল্যটি বড়ো করে দেখাতে চেয়ে মানভূমের বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশের অন্তর্ভূক্তির বিষয়টি সেভাবে প্রচার ও প্রতিবাদ করেন নি।৮। নিজেদের স্বতন্ত্র কোন সংগঠন না থাকা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ যে সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কারাবরণ করেছিলেন, পুলিশী নির্যাতন সয়ে ছিলেন তাঁরাই আবার স্বাধীনতার পর ক্ষমতা পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করে আবার এক নতুন সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করলেন। তার জন্য তাঁরা ত্যাগ করলেন তাঁদের প্রিয় কংগ্রেস দল। গড়ে তুললেন নিজেদের সংগঠন। কংগ্রেসের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন প্রতিষ্ঠা হয়  "লোকসেবক সংঘ"। মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি সত্তোরোর্ধ্ব অতুল চন্দ্র ঘোষ হলেন যার প্রধান কান্ডারি। 

অতুল চন্দ্র ঘোষ 

এই নতুন জেলাভিত্তিক দলটির ব্যবস্থাপক মন্ডলীর অন্যান্য সচিবগণ ছিলেন: বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত (তিনি মানভূম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন), সত্যকিঙ্কর মাহাত, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ (পুরুলিয়ার 'মা'), ভজহরি মাহাত, জগবন্ধু ভট্টাচার্য, ভীমচন্দ্র মাহাত, অরুণ চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। ১৯৪৮-৭৮ অব্দি পুরুলিয়া জেলার রাজনীতিতে আদ্যন্ত গান্ধিবাদী লোকসেবক সংঘের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।মানভূমের চিরন্তন সংস্কৃতি রাষ্ট্রশক্তি বিরোধীতা করার প্রেরণা জুগিয়েছিল বলা যেতে পারে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় কংগ্রেস দলকে পাশে পাবেন না বুঝেই তাদের নতুন দল তৈরি করা। মানভূম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি, সম্পাদক ছাড়াও জেলা কমিটির মোট চল্লিশ জন সদস্য সেদিন কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে নতুন দলটিতে যোগদান করেছিলেন সকল প্রলোভন ত্যাগ করে।

লাবণ্যপ্রভা ঘোষ

"বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করা যাবে না"-- বিহার সরকারের এমন ফরমানের (নোটিফিকেশন নং -১১৯৪ ই আর তাং ০৪/১১/১৯৩০) বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন শুরু হয় এবং তার সমাপ্তি ঘটে পুঞ্চা থানার পাকবিড়রা থেকে কোলকাতা পদযাত্রার (পদযাত্রার সূচনা হয় ২০ এপ্রিল, ১৯৫৬) মাধ্যমে।

মানভূমের মানুষদের এই ভাষা আন্দোলনকে প্রথম থেকেই ভালো চোখে দেখেননি বিহার সরকার। রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে তারা এই আন্দোলনের সবরকম বিরোধিতা করেছে। ‘বিহার জন নিরাপত্তা আইন’ নামে একটি কালাকানুনের সাহায্যে আন্দোলনকারীদের উপর দমনপীড়ন শুরু হয়। তিয়াত্তর বছর বয়সী মানভূমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা অতুলচন্দ্র ঘোষ মহাশয়কে মাতৃভাষার জন্য, স্বভূমের স্বীকৃতির জন্য যে যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল তা উল্লেখ করতেই হয়। স্বাধীন দেশের সরকারের কাছে এই প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী অনুমতি না নিয়ে টুসুগানের দল নিয়ে শোভাযাত্রা করেছিলেন, এই অভিযোগ ও 'অপরাধ'-এ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।  "তিনি ক্রনিক প্লুরিসিতে ভুগছিলেন। তার কাশি হচ্ছিল। মোকদ্দমার দিনগুলিতে তাকে দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত কিছু সময় কোর্টে বাকি সময় মলমূত্রযুক্ত হাজতে রাখা হত। জেলে তার জ্বরও হচ্ছিল। সকলেই জানেন লোকসেবক সংঘ জরিমানা দিতেন না -- অতএব ৬ মাসের কারাদণ্ডের সাথে ১০০০ টাকা জরিমানার অনাদায়ের জন্য আরও তিনমাসের জেল হল ৭৩ বৎসরের মানভূমের স্বাধীনতা যোদ্ধার। বিচারের সময় তাকে দাঁড়িয়েই থাকতে হত।" এখানেই শেষ নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪) কনকনে ঠান্ডায়, রাতের বেলায় একটি খোলা ট্রাকে আরো তেরজন সত্যাগ্রহীর সঙ্গে তাঁকে পুরুলিয়া জেল থেকে ১৩৫ কিমি দূরের হাজারিবাগে  জেলে পাঠানো হয়। এই হোল স্বাধীন দেশের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রতি রাষ্ট্রের ব্যবহার। তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছিলেন, সরকারি দলের সংশ্রব ত্যাগ করে নিজের দলের মনোনীত প্রার্থীকে সংসদে প্রেরণ করতে পেরেছেন তার ওপর আবার ভাষার জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাই রাষ্ট্র তাঁকে ছেড়ে কথা বলেনি। আন্দোলনে তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকেও গ্রেপ্তার করা হয়। স্বাধীনতার পর বিহার প্রাদেশিক সরকার একের পর এক সার্কুলার জারি করেন। যার লক্ষ্য ছিল মাতৃভাষার উপর আক্রমণ। বাংলাভাষী সব বিদ্যালয় পরিদর্শককে মানভূম জেলা থেকে ট্রান্সফার করা হলো বিহারের নানান জায়গায়। ডি. আইয়ের মাধ্যমে আদেশ দেওয়া হল, প্রতিটি বিদ্যালয়ে সরকারি নির্দেশ মত হিন্দি সাইনবোর্ড লাগাতে হবে। হিন্দি পড়ালেই কোন বিদ্যালয়ের অনুমোদন মিলবে, আবার কোন বিদ্যালয় যদি হিন্দি না পড়ায় তবে তার অনুমোদন বাতিল বা স্থগিত করা হবে। স্বাধীনতার আগে পাঠ্যবইগুলি হিন্দি ও বাংলায় ছাপা হত। স্বাধীনতার পর (১৯৪৮-৪৯)  এই প্রথম মাধ্যমিক স্তরের কোন পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষায় ছাপা হল না। ১৮/৩/৪৮ দুটি সার্কুলার জারি হয় ডি.আই. অফিস থেকে। তাতে জেলার পুরাতন স্কুলগুলিতে প্রচলিত বাংলা মাধ্যমের পরিবর্তে বাধ্যতামূলক ভাবে হিন্দি মাধ্যমে পড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং দেবনাগরী হরফে সাইনবোর্ড টাঙানোর আদেশ দেওয়া হয়। স্কুলের খাতাপত্র হিন্দিতে লেখা, রামধূন গাওয়া প্রভৃতি আদেশ দেওয়া হয়। বিভিন্ন সংস্থাকে সাহায্য দানের টোপ দিয়ে বলতে বলা হয়, মানভূমের ভাষা হল হিন্দি। এরকমই প্রস্তাব দেওয়া হয় ১৯২১ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত "হরিপদ সাহিত্য মন্দির"কে। ভাষা আন্দোলনের হাতিয়ার টুসু সত্যাগ্রহে টুসু গান লেখার জন্য লোকসভার নির্বাচিত সাংসদ ভজহরি মাহাতকে কোমরে দড়ি বেঁধে সাধারণ একজন আসামীর মত জেল থেকে কোর্ট হাজত পর্যন্ত হাঁটিয়ে আনা হয়। 

ভজহরি মাহাত
স্বাধীন ভারতে নির্বাচিত লোকসভা সদস্য ভজহরি মাহাত-র এক বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড ও একশ টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরো একমাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মাতৃভাষার জন্য টুসুগান রচনা ও সেই গান নিয়ে শোভাযাত্রা করাই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। এই অভিযোগে  তার জেল ও জরিমানা, ভাবা যায়! সারাভারতে এ দৃষ্টান্ত প্রায় বিরল। এসব ঘটনায় জনমানসে যেমন ক্ষোভ বাড়ে, তেমনি বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ও ভারতের লোকসভায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হয়। টুসু গান মানভূমের একটি জনপ্রিয় লোকগান।মানভূমকে অনেকে গানভূমও বলে থাকেন। লোকসেবক সংঘ এই টুসুগানকে ভাষা আন্দোলনে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। টুসুগানকে অবলম্বন করেই সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়। এর বৈশিষ্ট ছিল, এটি হত অহিংস। টুসু সত্যাগ্রহ প্রথম শুরু হয় ৯ জানুয়ারি, ১৯৫৪। দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলন চলে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত  চলে এই আন্দোলন। অপরদিকে টুসু সত্যাগ্রহ জন-জাগরণের রূপ নিলে বিহার সরকার সাধারণ মানুষদের উপর দমন পীড়ন শুরু করে। পুলিশ টুসুগান গাইতে দেবে না ঠিক করে। টুসুগান গাইলেই গ্রেপ্তার ও জরিমানা করে। অপরদিকে লোকসেবক সংঘ ‘টুসু গানে মানভূম’ শিরোনামে টুসুগানের বই ছাপিয়ে লক্ষ কপি বিক্রি করার ব্যবস্থা করেন। গানগুলির বিষয় ছিল বিহার সরকারের দ্বারা বাংলা ভাষা দমন, নিপীড়ন। কিছু বিখ্যাত গান, ভজহরি মাহাত-র ‘ও বিহারি ভাই তোরা রাখতে লারবি ডাঙ দ্যাখাই’, অরুণ ঘোষের ‘বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে’, জগবন্ধু ভট্টাচার্যের ‘প্রাণে আর সহে না হিন্দি কংগ্রেসিদের ছলনা’। এরকম আরো বহু টুসু গান সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরত ।

ভজহরি মাহাতর টুসু গান 

মানভূমের এই আন্দোলনে সারা দেশব্যপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।পাঁচজন লোকসভা সদস্য যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবাদ পত্র দিয়েছিলেন। এঁরা হলেন,এন সি চ্যাটার্জী, সুচেতা কৃপালনী, হীরেন্দ্রনাথ মুখার্জী, এস এন মোরে ও ভি জি দেশপান্ডে (মুক্তি, ১ মার্চ, ১৯৫৪)। ১৯৫৩ র ডিসেম্বরে, রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়। তাদের প্রথম সভা হয় ১০ ফেব্রুয়ারি১৯৫৪। ২৩ ফেব্রুয়ারি কমিশন হঠাৎ ঘোষণা করে সকলের দাবি, বক্তব্য ও মতামত ২৪এপ্রিলের মধ্যে কমিশনের কাছে জানাতে হবে। লোকসেবক সংঘ এসময় আন্দোলন বন্ধ করে কমিশনের জন্য কাগজপত্র তৈরি করতে উদ্যোগী হন। কাজে নেমে তাঁরা বুঝলেন এত স্বল্প সময়ে এত তথ্য যোগাড় করা সহজ কাজ না। তাই তাঁরা কমিশনের কাছে সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানান। তা মঞ্জুর হয়। ৩১মে অব্দি সময়সীমা বাড়ানো হয়। লোকসেবক সংঘ ঐ দিন, মানে একেবারে শেষদিনে ১২০০পাতার (পরে আরো ৪০০ পাতা দেওয়া হয়)  স্মারকলিপি কমিশনের কাছে জমা করেন। এছাড়াও সদর লোকাল বোর্ড,পুরুলিয়া বার এসোসিয়েশন, মানভূম বাঙালি সমিতি, সংযুক্ত প্রগতিশীল ব্লক, মানভূম নাগরিক সংঘ, হরিপদ সাহিত্য মন্দির, ধানবাদের জনসাধারণও নিজেদের নিজেদের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভুক্তির স্বপক্ষে স্মারকলিপি জমা করেন। এছাড়াও প্রাদেশিক ও সর্বভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানভূম ও ধলভূমকে পশ্চিমবঙ্গভুক্তির স্বপক্ষে স্মারকপত্র জমা করেন কমিশনের কাছে। এদের মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি, ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতীয় হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, ভারতীয় প্লান্টারস অ্যসোসিয়েশন প্রভৃতি।

বিহার সরকারও মানভূমকে এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে ছিল না। বিহার সরকার ও কংগ্রেস দল যৌথভাবে মানভূমের বাঙলা ভাষাভাষীদের প্রতি বিদ্বেষ জ্ঞাপন করে শুরু করেন অপপ্রচার। ১৯৫৪ র ৭-৯ জুন পুরুলিয়া শহরের বেলগুমায় বিহার প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সম্মেলন হয়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহ সহ সব মন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলন উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রায় যেসব ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড করা হয়েছিল তাতে লেখা ছিল ‘মানভূম বিহার মে রহেঙ্গে, বাঙ্গাল মে নেহি যায়েঙ্গে’।এখানে তিনদিন ধরে বাঙালিদের নাম ধরে ধরে কুৎসা করা হয়। স্বাধীন ভারতে  প্রাদেশিক কংগ্রেসের এই অধিবেশনে এত “নিম্নমানের জাতিবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতার প্রচার" হয় যার নজির আর কোথাও পাওয়া যায় না। শুধু মাত্র ভাষাকে কেন্দ্র করে বিহারি ও বাঙালিদের মধ্যে বিদ্বেষ সীমাবদ্ধ ছিল না। বঞ্চনা করা হয় চাকরি ক্ষেত্রে, ব্যবসার ক্ষেত্রেও। এমনকি সাধারণ মানুষ যাঁরা বনে জঙ্গলে কাঠ পাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো তাদেরও হয়রানি করা হয়। বিহার সরকার পুরো মানভূম জেলা জুড়ে সরকারি ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সভা-সমিতি সংগঠন করে নিজেদের পক্ষে। সেখানে শ্লোগান দেওয়া হয়, "মানভূম বাঙ্গাল মে নেহি যায়েগা, জানে পর খুন কি নদী বহা দেঙ্গে "। লড়াই চলে বিহার বিধানসভার ভেতরেও। উচ্চ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে বিধায়ক ভীমচন্দ্র মাহাত ১ মার্চ ১৯৫৪, খ্রিস্টাব্দে যে বক্তৃতা করেন তা ইতিহাস হয়ে আছে।সরকার তার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন  কমিশনের কাছে 'মানভূম বিহারে থাকবে, বাংলায় যাবে না ' তা কীভাবে বলতে হবে সে ব্যাপারে ভালো করে বুঝিয়ে দেয়। এদিকে ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছিল সরকার। জগবন্ধু ভট্টাচার্যকে ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৪ মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। ঝালদার এক জনসভায় যুবক শিশির গুপ্তকে সেখানকার দারোগার উপস্থিতিতে লাঠিপেটা করা হয়। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিহার সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী কৃষ্ণবল্লভ সহায়। বান্দোয়ান, রঘুনাথপুর, নিতুড়িয়া ছাড়াও ধানবাদ মহকুমার ঝরিয়া, সিন্দ্রি, ধানবাদের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। সেখানে বাঙালিদের বাড়িতে অব্দি আক্রমণ করা হয়েছে। রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন মানভূম জেলা পরিদর্শন করে ফিরে যাওয়ার (৬/২/৫৫) পর এই অঞ্চল পরিদর্শনে আসেন অতুল্য ঘোষ। বিহার সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েও তিনি এই এলাকা পরিদর্শনের অনুমতি পাননি। তাসত্ত্বেও তিনি আসেন। ৭-৮ ফেব্রুয়ারি,১৯৫৫ তিনি এই এলাকা ঘুরে দেখেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে, স্বচক্ষে দেখার পর ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫ (তিনি তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন) তাঁর একটি বিবৃতি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, "এই ব্যাপক সফরের ফলে আমি যে দুঃখদায়ক অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি তাহা অবর্ণনীয়। বাংলাভাষী জনগণ যাহাতে রাজ্য সীমানা পুনর্গঠন কমিশনের নিকট স্বাধীনভাবে বক্তব্য পেশ করতে না পারেন, তদুদ্দেশ্যে গত প্রায় একমাসকাল বিহারের কংগ্রেসি সরকার বাংলাভাষী অধিবাসীদের ভীতি প্রদর্শনে তাহাদের সাধ্যমত করিয়াছেন। সম্মেলন, শোভাযাত্রা,জনসভা ইত্যাদির অনুষ্ঠান করা হইয়াছে এবং বাংলাভাষী অধিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে বড় বড় লাঠি লইয়া কুচকাওয়াজ করা হইয়াছে।" তাঁর এই বক্তব্যে বাংলাভাষার মানুষদের ওপর সন্ত্রাসের ছবিটি স্পষ্ট হয় ও তা প্রচার হওয়ার ফলে জনমতও গঠিত হয়। বিধানচন্দ্র রায় বিহার সরকারের প্রতি প্রথম থেকেই নরম মনোভাবাপন্ন ছিলেন। অতুল্য ঘোষের মন্তব্যে তিনিও তাঁর ভুল বঝতে পারেন। গবেষকরা বলেছেন, বিধানচন্দ্র রায় "বাংলাভাষার জন্য আন্দোলনকারী জনগণের দাবীগুলির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না। "১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে তাতে নানান সুপারিশের সঙ্গে মানভূম জেলাকে খন্ডীকরণ করা হয়। জেলার দুটি মহকুমার একটিকে অর্থাৎ ধানবাদ মহকুমার দশটি থানাকেই বিহারে রাখার সুপারিশ করা হয়। আবার পুরুলিয়া সদর মহকুমার চাষ থানায় হিন্দিভাষীর সংখ্যা বেশি থাকায় সেটিও বাদ যায়। ফলে সদর মহকুমার একুশটি থানার একটি বাদ দিয়ে কুড়িটি থানাকেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ করা হয়।কমিশনের সুপারিশ সকল বাংলাভাষী মানুষকে খুশী করতে পারেনি। ধানবাদ, ধলভূম, সাঁওতাল পরগণা, কাছাড়, গোয়ালপাড়া প্রভৃতি এলাকার (প্রায় পনের হাজার বর্গমাইল) কুড়ি লক্ষ বাঙালিকে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে রাখা হলো। কমিশনের সুপারিশের ওপর প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ, শিক্ষা মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও কংগ্রেস সভাপতি ইউ,এন. দেবরকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন সাবকমিটি গঠিত হয়েছিল তারা আবার ঝালদা, জয়পুর, বাঘমুন্ডি, বরাবাজার,বান্দোয়ান থানাকেও বিহারে রাখার পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার আগেই তা প্রকাশ হয়ে যায় এবং তার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও মানভূমের বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া হওয়ায় সরকার তা কার্যকরী করা থেকে পিছিয়ে আসেন।  গবেষকরা দেখিয়েছেন, টাটা কোম্পানীর স্বার্থে বিধানচন্দ্র রায় কীভাবে সুকৌশলে চান্ডিল, ইচাগড় ও পটমদা থানার প্রায় ছশো বর্গমাইল এলাকা বিহারকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। শেষপর্যন্ত পুরুলিয়া সদর মহকুমার ষোলটি থানা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভূক্ত হয়।কমিশনের রিপোর্ট পেশের পরবর্তী ঘটনা খুবই উল্লেখযোগ্য। ২০ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ দক্ষিণ মানভূম কেন্দ্রের লোকসেবক সংঘের দুই লোকসভা সদস্য, ভজহরি মাহাত ও চৈতন মাঝি লোকসভায় কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আবার শুরু হয় টুসু সত্যাগ্রহ। ১৯৫৬ র ১৬ জানুয়ারি কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলে তার পরদিন বিহারব্যাপী হরতাল পালনের ডাক দেওয়া হয়। সেই ডাকে পুরুলিয়া শহর ও মানভূম জেলা সাড়া না দিলেও হরতালকে কেন্দ্র করে, তা সফল করার জন্য সরকারি তৎপরতা ছিল তুঙ্গে। আবার ২১ জানুয়ারি, ১৯৫৬ মানভূমসহ সারা পশ্চিমবঙ্গে হরতাল ও অরন্ধন পালিত হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়  ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন যেহেতু কমিশনের রায়ে দুটি রাজ্যই সন্তুষ্ট নয়, তাই পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে সংযুক্ত করে একটি পৃথক রাজ্য গঠিত হবে। তার নাম হবে, " পশ্চিমবঙ্গ বিহার সংযুক্ত প্রদেশ "। সরকারি ভাষা হবে বাংলা ও হিন্দি ইত্যাদি। এই ঘোষনায় সারা বাংলায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রস্তাবটি সর্বত্র  ধিকৃত ও নিন্দিত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ প্রস্তাবের বিরোধীতায় অনুষ্ঠিত হয় হরতাল। এর প্রতিবাদে কংগ্রেস ছাড়া সকল রাজনৈতিক দলের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুব, মহিলাদের নিয়ে কোলকাতার সিনেট হলে সারা বাংলা সম্মেলন হয়। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা এই সম্মলনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি ছাড়াও এই সম্মেলনের অন্যান্য বক্তারা হলেন হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, জ্যোতি বসু, মোহিত মৈত্র, গোপাল হালদার, দাশরথি তা, সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন সেনগুপ্ত, কাজী আবুল ওদুদ প্রমুখ। লোকসেবক সংঘের নেতৃত্বে এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করে লাগাতর আন্দোলন, বিক্ষোভ কর্মসূচি রূপায়িত হয়। ১৯৫৬-র ২০ এপ্রিল তাঁরা এক পদযাত্রার আয়োজন করেন। ১০০৫ জন পদযাত্রী পুঞ্চা থানার ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্নস্থল পাকবিড়রা থেকে কোলকাতা পৌঁছান ৬ মে সকাল দশটায়। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র পথের দুপাশে মানুষজন ভীড় করে তাঁদের সাহায্য ও সমর্থন করেন, সম্বর্ধিত করেন। ৭ মে তাঁরা অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ করে ৯৬৫ জন কোলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে ১৪৪ ধারা অমান্য করে কারাবরণ করেন। ৯ মে আরো ৩৪ জন একই জায়গায় আইন অমান্য করে কারাবরণ করেন।তাঁদের প্রেসিডেন্সি, আলিপুর,আলিপুর স্পেশাল জেলে বন্দি করা হয়। ১৩ দিন কারাবাসের পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।১৭ আগস্ট, ১৯৫৬ মানভূম জেলার পুরুলিয়া মহকুমা পূর্বোল্লিখিত থানাগুলি বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তা কার্যকরী হয় ১ নভেম্বর ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে। তার আগে বিহার সরকার জেলা গ্রন্থাগার থেকে আলমারিসহ সব দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, কোর্টের সব রেকর্ড এমনকি সার্কিট হাউস থেকে ফার্নিচার, এমনকি পর্দাসহ সবকিছুই রাতারাতি ট্রাকে করে ধানবাদ ও অন্যত্র চালান করে দেওয়া হয়।

শেষপর্যন্ত  নির্দিষ্ট দিনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সহধর্মীনী বাসন্তী দেবীর সভানেত্রীত্বে বর্তমান পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভূক্ত হয়। 

বাসন্তী দেবী 

মাতৃভাষার জন্য স্বভূমির এই লড়াই ভারত ইতিহাসের এক অনালোকিত দিক আজও রয়ে গেছে। এই বিষয়ে পুরুলিয়ার বিদ্বজ্জনেরা বেশকিছু গবেষণামূলক কাজ করেছেন, কিন্তু সেগুলির তেমন প্রচার ও স্বীকৃতি নেই। সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে এর আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না, তা কি শুধু হিন্দি ভাষাকে মেনে নিতে না পারার জন্য? সংগ্রামী মানভূমের মানুষদের সংগ্রাম কিন্তু আলো পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই আমরা আজকের পুরুলিয়া জেলাকে পেয়েছি একথা আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না। 


বিশেষ সহায়ক গ্রন্থ :

১। মানভূমের ভাষা আন্দোলন ও পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি- দিলীপকুমার গোস্বামী, বজ্রভূমি প্রকাশনী,পুরুলিয়া ২০০৬।

 ঋণ:

১। পুরুলিয়া : তরুণদেব ভট্টাচার্য্য, ফার্মা কে এল এম, কোলকাতা : ১৯৮৬। ২। পশ্চিমবঙ্গ ( পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা),জুন, ২০০৭। ৩।অহল্যাভূমি পুরুলিয়া : সম্পাদনা, দেবপ্রসাদ জানা, দীপ প্রকাশন, কোলকাতা : জুলাই, ২০০৩। ৪। আমাদের যেটুকু আকাশ : সম্পাদক : মানবেন্দু রায়,সোমনাথ দাস, তারপদ হাজরা, প্রান্তর, দুর্গাপুর।

নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া 

-------------------------------------------------------------------------------------------------+-----

জীবনের সফরনামা

আসছে বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়ের নতুন ধারাবাহিক ‘জীবনের সফরনামা'

চুরাশি হাজার পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় 'শহর নগর ডট কম' ব্লগজিন এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ওয়েব পত্রিকার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রয়াগরাজ নিবাসী বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়। তাঁর বেশ কিছু মূল্যবান লেখায় এই পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত যে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বহুচর্চিত ও উচ্চ প্রশংসিত  গ্রন্থ 'মহাকুম্ভ ইতিহাস' এই বল্গজিনেই ২০২৫ এর মহাকুম্ভ চলাকালীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অরুণ কুমার রায় পুনরায় আসছেন তাঁর নতুন ধারাবাহিক  ‘জীবনের সফরনামা’ নিয়ে। জীবনের চলার পথে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসা লেখকের কলমে উঠে আসছে তাঁদের কথা।  জানি না তাঁর এই 'জীবনের সফরনামা' শেষ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসের আকার নেবে কি না। এই ধারাবাহিক হতে চলেছে তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনার এক অনন্য কোলাজ।  জীবনের এই চলার পথে কত কথা, কত মানুষের আনাগোনা থাকবে। সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নায় ঘেরা মানুষের এই জীবন-সফর। আশা রাখি, লেখকের কলমের জাদুতে সেই নীরব সফর আরও সরব ও সরস হয়ে উঠবে। আপনারাও নিয়মিত চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। সঙ্গে থাকুন এবং আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন। - সম্পাদক।)

------------------------------------------------------------------------------------------

এই সময়ের কবিতাঃ উৎসব - শীতল বিশ্বাস

 উৎসব 

 শীতল বিশ্বাস 


দশ চক্রে ভগবান যা হয়, নীল শৃগাল হয় রাজা

ছাগল হয় কুকুর। কুমির বাচ্চা গোনে শেয়াল

সবাই বহু রূপে, শোলের গব্বরের সবাই প্রজা

যা হবার তাই হোক, উল্টে দেখ চেয়ে, সবই খেয়াল 

সবই গণতন্ত্র, প্রথা মাফিক চলে, সূর্য ডোবে বিকেলে 

যে যা খুশি বলুক, যীশুর জন্ম আস্তাবলে, কৃষ্ণর জন্ম 

জেলে,

রক্তের রং লাল, আকাশের রং নীল

ভেদাভেদ সব ভাঙতে গেলে, ভাঙ্গো জার্মানির পাঁচিল

শত্রু মিত্র হয় না, মানুষই বানায় সব

ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে চল করি উৎসব

আয় সব করি উৎসব, সব করি উৎসব।


চিত্রাঙ্কনঃ দেবানন্দ মুখোপাধ্যায়