শারদোৎসব ১৪৩৩ঃ প্রবন্ধ - শুভাশীষ পাইন

শহর নগর শারদোৎসব ১৪৩৩

 জাগ্রত দুর্গায় ঋষি অরবিন্দ

শুভাশীষ পাইন

বাঙালির দুর্গাপূজা কেবল ঢাকের বাদ্য আর আলোর উৎসব নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক জাতির আত্মার জাগরণের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ভাষ্যকার হলেন মহাযোগী ঋষি অরবিন্দ ঘোষ। যিনি একই সঙ্গে ছিলেন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ থেকে ফিরে আসা মেধাবী ছাত্র, বরোদার রাজকীয় অধ্যাপক, আবার কলকাতার গোপন বিপ্লবী দলের প্রাণপুরুষ। এই দুই সত্তার মেলবন্ধনেই তিনি দুর্গাকে নতুন করে চিনেছিলেন।

সময়টা উনিশশো পাঁচ সাল। বঙ্গভঙ্গের আগুনে জ্বলছে বাংলা। অরবিন্দ তখন বরোদার আরামের চাকরি ছেড়ে কলকাতায়। তিনি দেখলেন কেবল আবেদন-নিবেদনে কোনো জাতির মুক্তি আসে না। মুক্তির জন্য চাই শক্তির আরাধনা। তখনই তিনি লিখলেন তাঁর কালজয়ী গোপন পুস্তিকা ভবানী মন্দির। সেখানে তিনি স্পষ্ট লিখলেন, ভারতবর্ষ কোনো মানচিত্রের টুকরো নয়, ভারতবর্ষ হলেন এক জীবন্ত দেবী, তিনি ভবানী, তিনিই দুর্গা। ব্রিটিশ তাঁকে বন্দিনী করে রেখেছে। এই মাকে মুক্ত করাই আমাদের ধর্ম। তাই তিনি চেয়েছিলেন পাহাড়ের নির্জনে এমন একটি মন্দির হবে যেখানে দেশের তরুণরা ব্রহ্মচারী হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সাধনা করবে, ঠিক যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের সন্তানরা করত।বঙ্কিমের বন্দে মাতরম্ মন্ত্রকে অরবিন্দই প্রথম রাজনৈতিক মহামন্ত্রে পরিণত করেন। বন্দে মাতরম্ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি বোঝালেন, বন্দে মাতরমে্র মাতা আর কেউ নন, তিনিই দুর্গা। তিনি এক হাতে ধান-গমে ভরা জননী, অন্য হাতে অসুর বিনাশিনী রণরঙ্গিণী। তিনি নিজে সংস্কৃতে দুর্গা স্তোত্র রচনা করে বলেছিলেন, তুমিই দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী, তুমিই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।

কিন্তু অরবিন্দের দুর্গা দর্শন শুধু রাজনীতিতেই আটকে থাকেনি। উনিশশো আট সালে আলিপুর বোমা মামলায় যখন তাঁকে জেলে বন্দী করা হলো, তখন সেই নির্জন কারাগারই হয়ে উঠল তাঁর সাধনপীঠ। সেখানে তিনি যে দিব্য দর্শন লাভ করেন, তা তিনি পরে উত্তরপাড়া অভিভাষণে বলেছেন। তিনি দেখলেন জেলের বিচারক, কয়েদী, লোহার গরাদ সবকিছুর মধ্যেই সেই একই নারায়ণ, সেই একই মহাশক্তি দুর্গা বিরাজ করছেন। তখন তিনি বুঝলেন বাইরের ইংরেজকে তাড়ালেই শুধু হবে না, ভিতরের ভয়, দাসত্ব, দুর্বলতা, হতাশা এই অসুরগুলোকেও বধ করতে হবে। আর সেই বধের জন্যই দুর্গার আরাধনা।

পন্ডিচেরিতে এসে তাঁর যোগ সাধনা যখন পূর্ণতা পেল, তখন তিনি মহাশক্তির স্বরূপকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন দুর্গা এক, কিন্তু তাঁর প্রকাশ তিনটি। এক প্রকাশে তিনি মহাকালী, যিনি তেজ, বীর্য ও সংহারের প্রতীক, যিনি অন্যায়কে ধ্বংস করেন। আর এক প্রকাশে তিনি মহালক্ষ্মী, যিনি প্রেম, সৌন্দর্য ও ঐক্যের প্রতীক, যিনি ভারতের মতো বহু ভাষা, বহু ধর্মের দেশকে এক সুতোয় গাঁথেন। আর তৃতীয় প্রকাশে তিনি মহাসরস্বতী, যিনি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও নিখুঁত কর্মের প্রতীক, যিনি আমাদের শেখান কিভাবে একটি পরম বৈভবশালী আধুনিক ভারত গড়তে হয়। এই তিনের সমন্বয়েই তিনি পূর্ণা দুর্গা।

তাই আজ দুহাজার ছাব্বিশ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দুর্গাপূজা করি, তখন ঋষি অরবিন্দের এই দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আজকের অসুর আর বাইরের কোনো সাম্রাজ্য নয়, আজকের অসুর হলো আমাদের ভিতরের দুর্নীতি, বিভেদ, হতাশা এবং দেশের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টিকারী শক্তি। মা দুর্গা আমাদের মনে করিয়ে দেন তুমি দুর্বল নও, তোমার মধ্যেই দশ হাত, দশ অস্ত্র ধারণ করার শক্তি লুকিয়ে আছে, শুধু তাকে জাগাতে হবে। ঋষি অরবিন্দ সেই জাগরণেরই ঋষি ছিলেন, তিনি আজও আমাদের কানে কানে বলে চলেছেন ভারত উঠছে, কারণ তার ভিতরে দুর্গা জেগেছেন।

চিত্রকরঃ বিশ্বরূপ দত্ত 

৩টি মন্তব্য:

  1. ভালো লাগল বেশ।প্রাসঙ্গিক আলোচনা।এভাবেই আলোকিত হোক শহর নগরের ব্লগজিন।
    অতনু চট্টোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন
  2. এই শরতে পুজোর আবহে শুভাশীষের ছোট নিবন্ধটি পড়ে ভাল লাগল। ঋষি অরবিন্দর চেতনায় দুর্গা কী রূপে ধরা দিয়েছেন, জানা গেল। মেঘ মুখোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন