ঘরোয়া গণতন্ত্র
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
বাড়ির পরিবেশ গত তিনদিন ধরে এমন—মনে হচ্ছে যেন সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উঠেছে, আর সরকার টালমাটাল। কারণ একটাই—কাজের মেয়েটা আসছে না।
আমার স্ত্রী সকাল থেকে রাত অবধি এমনভাবে গজগজ করছে, যেন সে নিজেই একক বিরোধী দল।
“এইভাবে সংসার চলে? লোকটা হাওয়া হয়ে গেল! আমার ঘুম উড়ে গেছে।”
“আরে, একটা না একটা ব্যবস্থা তো হবেই,” আমি শান্ত গলায় বললাম, যেন অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করছেন।
সে চোখ কুঁচকে তাকাল— “তোমার মাথা খাটিয়ে কোনোদিন কিছু হয়েছে? তোমার বুদ্ধির উপর আমার কোনকালেই ভরসা নেই।”
আমি একটু গম্ভীর হলাম। ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার নাকি অপমানের পরেই হয়। হঠাৎ যেন মাথায় বিদ্যুৎ চমকাল— “ইউরেকা!”
স্ত্রী থমকে গেল— “এ আবার কী আজেবাজে বকছো ?”
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম— “এমন একটা বুদ্ধি এসেছে, এতে তোমার ভোট পর্যন্ত পেরিয়ে যাবে!”
“ভোট আবার এলো কোথা থেকে?”
“শুনো না… এখন তো ভোটের বাজার। শুনছি যারা দাঁড়িয়েছে, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসন মাজছে, কাপড় কাচছে, এমনকি রুটি বেলেও দিচ্ছে। আমরা যদি একজনকে ডেকে নিই—এই ক’দিন তো দিব্যি কেটে যাবে!”
স্ত্রী প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর এমনভাবে তাকাল, যেন আমি সংবিধান বদলে ফেলেছি।- “তুমি সিরিয়াস?”
— “অবশ্যই! এটাকেই বলে গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রয়োগ —জনসেবার সরাসরি সুবিধা!”
সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল— “ঠিক আছে, দেখি তোমার গণতন্ত্র কতদূর যায়।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা তুলে নিলাম। এলাকার এক পরিচিত ভোটপ্রার্থীর নম্বর ছিল—গত সপ্তাহেই লিফলেট দিয়ে গিয়েছিল।
— “হ্যালো দাদা, নমস্কার… হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বলছি… একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল…”
ওপাশ থেকে গলা এল— “বলুন, বলুন, মানুষের সেবার জন্যই তো আছি!”
আমি একটু কাশলাম— “আসলে আমাদের কাজের মেয়ে কয়েকদিন আসছে না… যদি একটু বাসন মাজা, কাপড় কাচা…”
ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দৃঢ় কণ্ঠ— “চিন্তা করবেন না! আমি এখনই আসছি। মানুষের পাশে আছি, থাকব।”
প্রায় আধঘণ্টার মধ্যে লোকটি হাজির। গলায় গামছা, হাতে হাসি, মুখে স্লোগান।
আমার স্ত্রী তখন রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, চোখে বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্রণ। “এই দিকটা একটু ভালো করে মাজবেন… হ্যাঁ, ওই হাঁড়িটা একটু কড়া কালো দাগটা জোরে ঘষতে হবে ।”
ভোটপ্রার্থী মাথা নেড়ে বললেন— “অবশ্যই, আপনাদের আশীর্বাদই আমার শক্তি।”
আমি পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি—গণতন্ত্র এতটা ঘরোয়া হতে পারে, আগে কে জানত!
সন্ধ্যার দিকে বাসনগুলো ঝকঝকে, কাপড়গুলো পরিষ্কার, আর আমার স্ত্রী মুখে একরাশ তৃপ্তির হাসি।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “এই প্রথম তোমার মাথার বুদ্ধি কাজে লাগল।”
আমি মুচকি হেসে বললাম— “দেখলে তো, আমার মাথা ততটা গোবর ভর্তি নয়, নেহাত পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না তাই। নইলে কী যে হত বলা মুশকিল ।”
ভোটপ্রার্থী বিদায় নেওয়ার সময় বললেন— “দাদা, ভোটটা কিন্তু…”
আমি দ্রুত বললাম— আরও দু চারদিন আসুন কাজ দেখি।বাকিদেরও কাজ দেখি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব কারা বেশি পরিচ্ছন্ন প্রশাসন উপহার দিতে পারবে।
ছবিঃ ফেসবুক থেকে নেওয়া

বিপ্লববাবু আমার আপনজনের মধ্যে একজন।আমি ওনার লেখা বেশ ভালো ভাবে পড়ি।এটাও পড়লাম,তবে বাহবা দিতে পারলাম না।এই ধরনের গল্প কিন্তু এখন ফোনে ঘুরছে।একটু অন্য আঙ্গিকে এটা করলে ভালৌ লাগত।
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়
উপভোগ করলাম হালকা চালে লেখা একটি গম্ভীর রাজনৈতিক স্যাটায়ার ধর্মী গল্প ।
উত্তরমুছুনকেতকী বাগচী, সল্ট লেক কলকাতা।