নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব : দশ () অতনু চট্টোপাধ্যায়

 

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ দশম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(১০)

আজ সকালে মনে মনে উচ্চারন করল সুখেন কবি রবীন্দ্রনাথের একটা গান। তার মনে হল, রবীন্দ্রনাথ যেন সমস্ত স্তরের মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতেন। গুন গুন করে গেয়ে উঠল সুখেন।

"বিপদে মোরে রক্ষা কর

এ নহে মোর প্রার্থনা

বিপদে আমি না যেন করি ভয়

দুঃখ তাপে ব্যথিত চিতে 

নাইবা দিলে সান্ত্বনা

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়

সহায় মোর না যদি জুটে

নিজের বল না যেন টুটে

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি

লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়

আমারে তুমি করিবে ত্রান

এ নহে মোর প্রার্থনা

তরিতে পারি শকতি যেন রয়

আমার ভার লাঘব করি

নাইবা দিলে সান্ত্বনা

বহিতে পারি এমনি যেন হয়

নম্র শিরে সুখের দিনে

তোমারি মুখ লইব চিনে

দুখের রাতে নিখিল ধরা

যেদিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।"

গানটা কবিতার মত করে বেশ কয়েকবার পড়ল সুখেন। মনের জোর বাড়ানোর এটা যেন এক মহৌষধ।

না, ভেঙে পড়লে চলবে না। নিজের জন্য না হলেও, বাকি রোগীদের জন্য তাকে কাজ করতে হবে। সমাজের কাছে কাজ ছিনিয়ে আনতে হবে। এটা যেন তার কর্তব্য বলে মনে হল।

আগেই ঠিক হয়েছিল, আজ প্রশাসনের কাছে দরবার করতে যাবে তারা। কাজের অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। মনে এক রাশ উদ্যম আর সাহস সঞ্চয় করে সুখেন চলল গৌরীপুর। আজ বদড়া আর গৌরীপুরের সব কুষ্ঠাক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটবে।হয়ত তাদের এই মিছিল দেখে সাধারন মানূষ নাক চাপা দিয়ে সমালোচনা করবে। কিন্তু ওদের তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে হবে।সুখেন এইসব চিন্তা করতে করতে এগিয়ে চলল। গৌরীপুরে পৌঁছে,  দেখল ওখানে অনেকেই উপস্থিত। তবে একটা জিনিস দেখে খুব ভালো লাগল। আর সেটা হল বেশ কয়েকটা ঝুপড়ির মত ঘর তৈরি হয়েছে। সেখানে লোকজন বাস করেছে। এইসব মানুষ কোন উদ্বাস্তু নয়, তারা এ মাটিরই সন্তান। সমাজ তাদের পৃথক করে মনুষ্যত্বের অপমান করে সমাজে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সুখেনের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। ওখানে পৌঁছে একদফা আলোচনা হল।গৌরীপুরের সাথে বদড়ার রোগমুক্তি ঘটা লোকেরাও জমা হবে।ঠিক হল, তাদের এই মিছিল যাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে। সুখেন বসে বসে কয়েকটা চিঠি লিখল। তারপর বেরিয়ে পড়ল গন্তব্যের দিকে। যাদের হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই, তারা কাঠের তৈরি ছোট গাড়িতে চড়ে রওনা দিল। মুখে কোন আওয়াজ নেই। প্রত্যেকের হাতে প্ল্যাকার্ড। নিঃশব্দে প্রতিবাদ চলল। দাবী একটাই -তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটা কথা, তাদের জন্য শিক্ষা, পানীয়জল, স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে।

জেলা শহরে যখন মিছিল উপস্থিত,তখন দুরে দাড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের টিপ্পনি আর ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। কোন কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ডিএম, মিউনিসিপ্যালটি সহ প্রশাসনের সমস্ত স্তরে দেওয়া হল চিঠি। আলোচনাও হল।আশ্বাসও দেওয়া হল। এরপর শুধু যোগাযোগ রাখতে হবে, কতটা আশ্বাস পৃরণ হল। ওরা সকলেই ধীরে ধীরে চলে এল। সুখেন আর গৌরীপুর গেল না। ফিরে এল তার জন্য বরাদ্দ কারাগারে।

সময় পেরিয়ে যায়, রোগীর সংখ্যা বাড়ে। সরকারী তরফে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুষ্ঠরোগী অনুসন্ধান করা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র আর রাজ্য স্তরে কুষ্ঠ নির্মূল করনের ডাক দেওয়া হয়েছে। যারা অনুসন্ধানে যাচ্ছে, তারাও যেমন ভয়ে ভীত নিজেদের নিয়ে, তেমনই যাদের বাড়িতে এই রোগ দেখা যাচ্ছে, সেটা গোপন করার এক প্রবনতা। পরিবারের ভয় যেন এটা লোক জানাজানি না হয়, তাহলে সমাজে তারা আপাংক্তেয় হয়ে উঠবে। বাড়ির মেয়েদের বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কথাটা যে একেবারে মিথ্যা নয়, সেটা সুখেন ভালোভাবে জানে।

অথচ এই রোগ পুষে রাখলে সমাজে অন্য কারো মধ্যে সংক্রমিত হবে। শিক্ষিত অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের মধ্যে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে আছে। এই ধারনার পরিবর্তন না ঘটালে তো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর হচ্ছেও। দু পাঁচজনের সাবধান বাণীতে কিছু হবে না, সেটা সুখেন জানে। কিন্তু তবুও কিছুটা প্রচারে মানুষের মনে একটা দোলা লাগছে। ঘোষিত হয়েছে "বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস"।গান্ধীজির মৃত্যুদিবস ৩০শে জানুয়ারী দিনটি পালন করা হয় বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। উদ্দেশ্য একটাই, বিশ্ব তথা ভারতবর্ষ থেকে কুষ্ঠ রোগকে নির্মূল করা। তবে যতটা ঢাকঢোল সহকারে এই দিবসটি পালন করা হয়, সেই অর্থে এর পেছনে যে উদ্দেশ্য থাকে, সেটি কি সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে। এখনও গ্রাম শহর সর্বত্র চিত্র একই-কুষ্ঠ রোগ দুরীকরন নয়, কুষ্ঠ রোগী থেকে দুরে থাকা। সুখেনের চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে যায় হঠাৎ। একটা কোকিল সমানে ডেকে চলেছে। তার মিষ্টি রবটাও যেন কর্কশ শোনাচ্ছে। 

চলবে 

৩টি মন্তব্য:

  1. জ্বলজ্যান্ত কাহিনি । অপরাজেয় কখনো অবদমিত হবে না। তাকে যে অসীম সাহসী করে তুলেছে , তীব্র নিন্দা ঘৃণা তাচ্ছিল্য ভৎর্সনার মত অযাচিত যন্ত্রণাসমূহ। সে সকলের সম্মিলিত ফল ,সুখেনের মত কোনো ব্যক্তির জয়ী হওয়ার পশ্চাতে সক্রিয়তা আনয়ন করে । মননকে সীমার মধ্যে রেখে মাত্রার বিভাজিত না ক'রেও ঘটনাপ্রবাহে ঘাতে প্রতিঘাতে‌ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গভীর জীবনবোধের দর্শন ,ও সে সংক্রান্ত নিখুঁত ধারণার ফল ।

    উত্তরমুছুন
  2. জ্বলজ্যান্ত কাহিনি ।কোনো হার না মানা জীবন কাহিনির প্রতি পরতে উঠে আসে । অপরাজেয় কখনো অবদমিত হবে না,তা সে যত বাধা বিঘ্ন ঘৃণা তাচ্ছিল্য যাই আসুক না কেন ! তাছাড়া তাচ্ছিল্য নিন্দা ঘৃণা আদি‌ সুখেনদের মত জনগণের কাউকে সাহসী করে তুলে । সীমার মধ্যে মাত্রার বিভাজন না রেখেও মনন ঘাতে প্রতিঘাতে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ায় গভীর জীবনবোধের দর্শন লেখকের অসামান্য উপস্থাপনকে দর্শায়।

    উত্তরমুছুন
  3. জীবন যুদ্ধে হেরে না গিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এভাবেই। স্যারের কলমকে শ্রদ্ধা জানাই 🙏..মাম্পী দাস

    উত্তরমুছুন