ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ২৯ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

  অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।  প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ  ঊনত্রিশ  পর্ব - সম্পাদক ।) 

জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু 

মেদিনীপুর শহরের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক  জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে নিবেদিত এবং বিপ্লববাদের অন্যতম দক্ষ সংগঠক জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরে হেমচন্দ্র এলেন গুপ্ত সমিতির ডেরায় । ১৯০২ এ আলাপ পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে । সেই সময় হেমচন্দ্র তাঁর জমিদার মামাবাড়ির প্রাসাদতুল্য অট্টালিকার পাশের বাগানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, শরীরচর্চা, লাঠি ও ছুরিখেলা, কুস্তি সহ নানান আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় ছেলেদের জন্য। এই ভাবেই সমিতি গঠন করে তিনি সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের  অস্ত্রগুরু হয়ে উঠলেন । ক্রমে তাঁর হাতে গড়া মেদিনীপুরের গুপ্ত সমিতি কলকাতার মুরারিপুকুরের সিক্রেট মিশনের (সশস্ত্র দলের) সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রতিটি বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় । এখানে একটি অজানা ও চিত্তাকর্ষক কাহিনি সংক্ষেপে আলোচনা করতেই হয় । হেমচন্দ্র প্রায়শই বড়বাজার দিয়ে যাতায়াত করতেন। রাস্তার ধারে  কিম্বা মোড়ের মাথায় একদল ছেলের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল থাকতো ক্ষুদিরাম নামের চোদ্দ বছরের একটি ছেলে। হেমচন্দ্রকে দেখলেই ছুটে চলে আসত তাঁর কাছে । মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে আবদার করে বলতো - আমায় একটা পিস্তল দেবে! দাও না একটা পিস্তল ! হেমচন্দ্র ক্ষুদিরামের এই আবদার কিম্বা বায়না শুনে অপ্রস্তুতে পড়ে যেতেন। জহুরির চোখ দিয়ে দেখতেন ছেলেটিকে । মাথায় অগোছালো  ঝাঁকড়া চুল, শানিত চোখ আর গায়ে খদ্দরের ফতুয়া। মালকোচা দেওয়া তাঁতের মোটা ছয়হাতি ধুতি পরা ছেলেটি নজরে ধরে গেল হেমচন্দ্রের। এই ভাবেই একদিন ক্ষুদিরাম পিস্তল চাইতেই হেমচন্দ্র বললেন - পিস্তল দিয়ে কি হবে ? প্রশ্ন শুনে ক্ষুদিরাম দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে বসলো - পিস্তল দিয়ে সাহেব মারবো । ডাকাবুকো এই ছেলের দুঃসাহসিক জবাব শুনে থ হয়ে গেলেন হেমচন্দ্র । ক্ষুদিরাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন তিনি । হেমচন্দ্র নিজে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন - ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরে কৃষি-শিল্প-প্রদর্শনী খোলা হয়েছিল। এই সময় ইংরেজের প্রতি বিদ্বেষ ও গালাগালিপূর্ণ 'সোনার বাংলা' নামক বে-নামী বাংলা "পাম্পলেট" একটা নাকি প্রচারিত হয়েছিল। তার ইংরেজী অনুবাদ 'পাইওনিয়ার'-এ পরে প্রকাশিত হলে ইংরেজ মহলে একটু চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। সত্যেন (সত্যেন্দ্রনাথ বসু- নরেন গোঁসাইকে হত্যার দায়ে তাঁর ও কানাইলাল দত্তের ফাঁসি হয় ) তার আবার বাংলা অনুবাদ করে হাজারখানেক ছাপিয়েছিল। উক্ত প্রদর্শনীর প্রবেশদ্বারের কাছে ক্ষুদিরাম নির্বিচারে সকলকে ঐ পাম্পলেটগুলি বিলি করছিল। এমন সময় একজন হেড কনেস্টবল এনে তাকে গ্ৰেপ্তার করাতে সে নাকি বক্সিংয়ের কেরামতি দেখিয়েছিল। 

ক্ষুদিরাম বসু 

ইত্যবসরে সত্যেন সেখানে এসে পড়ে বলে উঠল, "উও ডিপুটীকা লেড়কা হ্যায়, উসকো কেঁও পাকড়ায়া।" সত্যেন ছিল প্রদর্শনীর সহকারী সম্পাদক এবং তখন কালেক্টারীতে একজন ডেপুটী বাবুর এজলাসে কেরাণীর কাজ করত। জমাদার সত্যেনকে চিনত, সে ডেপুটীর নাম শুনে, নাকে রক্তপাত সত্ত্বেও ক্ষুদিরামকে ছেড়ে দিয়েছিল। পরক্ষণে যখন তার ভুল ভাঙ্গল, তখন আর ক্ষুদিরামকে খুঁজে পাওয়া গেল না।  পুলিশকে ধোঁকা দেবার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সত্যেনকে কৈফিয়ৎ দিতে হয়েছিল। তাতে বোধ হয়, তাকে দোষী সাব্যস্ত করবার মত কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সে নাকি বেপরোয়া ভাবে হেসে হেসে জবাব দিয়েছিল। তাই সঙ্গে সঙ্গে কেরাণীগিরি হতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে কিন্তু রাজদ্রোহের মামলা রুজু করা হল। বাংলাদেশে কোনো বিপ্লব-বাদীর বিরুদ্ধে এই প্রথম রাজদ্রোহের অভিযোগ বলে মনে করা হয়।

চলবে 

১০টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর হচ্ছে।পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা আর বর্ণনা মন ছুঁয়ে গেল।
    অতনু চট্টোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন
  2. ভাল লাগছে। সহজ সরস ভাষায় বাংলার বিপ্লবীদের কথা। দেশসেবা কখন যে লাভজনক পেশা হয়ে গেল! এই সব আত্মত্যাগ, জীবনপণ কি সত্য? ভ্রম হয়।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মতামতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।

      মুছুন
  3. যত বলা আর শোনা যায় তত ভাল। মেঘ

    উত্তরমুছুন
  4. অগ্নিশপথ একটি আনটোল্ড স্টোরি

    ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই -"শহরনগর "ব্লগজিন ও তার সম্পাদককে । না খুললে জানতে পারতাম না। এতো মনোজ্ঞ ও পরিশীলিত ভাষায় ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন হয় জানা ছিল না । ইতিহাসের খটখটে ভাষা এখানে ঠাঁই পেয়েছে সারল্যে ভরা কথাসাহিত্যের ঠাসা বুনোটে । যেখানে রয়েছে কথকতার ঢঙে আলাপচারিতা ।

    লেখনিতে কি আছে না আছে, তা না জানলে না পড়লে স্বাধীনতার ইতিহাসের না জানা, না বলা কথা হয়তো অনেক কিছুই অধরা থেকে যেত। যা ইতিহাসের পাতায় প্রণিধানযোগ্য । লেখার পরিসর স্বল্প হলেও সহজ সরল ভাষায় বর্ণিত বস্তু নিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ এবং যথেষ্ট মনোগ্রাহী ও চিত্তাকর্ষক । লেখাটি পড়ে খুবই আপ্লুত হলাম । নিজের জানার পরিসরকে আপডেট করলাম। কবির ভাষায়- এ যেন শেষ হইয়াও হইল না শেষ -- ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্নি পুরুষদের বৈপ্লবীক কর্মকাণ্ড নিয়ে এমনই এক অনালোকিত, আনটোল্ড স্টোরি - অগ্নিশপথ। যার মূল্যায়ন হয়তো তথা কথিত বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজে বিশাল আলোড়ন তৈরি না হলেও আমরা যারা কতিপয় পাঠক যারা এটা মনোযোগ দিয়ে পড়বো , লেখকের লেখার বিষয়বস্তু অনুধাবন করবো সেইসব পাঠক কুলের হৃদয়ে কিছুটা হলেও সমাদর লাভ করবে । আত্মতৃপ্তি বোধ জাগবে । এই আমার নিশ্চিত প্রত্যাশা।
    "শহরনগর"কে আরও একবার ধন্যবাদ,- বাঁকুড়ার কৃতী সন্তানদের সাহিত্য সৃজনকে সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য।
    কালোবরণ মন্ডল
    খাতড়া।

    উত্তরমুছুন
  5. মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাদের মতো পাঠকের মতামত আমাদের উৎসাহিত করে। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।

    উত্তরমুছুন