নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব সাত () অতনু চট্টোপাধ্যায়

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ সপ্তম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(৭)

সুখেন অন্য পাঁচটা দিনের মত সকালে শুয়ে থাকল না। ভোর হতেই সে প্রাতঃকৃত্য সেরে, মুখ হাত ধুয়ে তৈরি হয়ে গেল। তারপর স্টোভ জ্বালিয়ে চা তৈরি করে, প্যান্ট শার্ট পরে রেডি হয়ে গেল। গতকাল রাখালদাকে বলা আছে, আজ যেন দুপুরে খাবার না দেয়। রাতে ফিরে একেবারে খাবে। সুখেনের মা রাখালদার কাছ থেকেই তার খবর নেয়। ভালো মন্দ কিছু তৈরি করলে ছেলের জন্য পাঠায়।সময়ের সাথে সাথেই দাদারাও আসে, দুর থেকে খবরাখবর নেয়।ব্যাস ওটুকুই।

সুখেন সাইকেল চালিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেল। চায়ের দোকান থেকে চা না মিললেও, সাইকেল স্ট্যান্ডে সাইকেল রাখতে অসুবিধা হয় না। যদিও তার মতই সাইকেলটার পরিনতি। একপাশে এককভাবে তার সাইকেলটা রাখে। অন্যান্য সাইকেলের সাথে যেন না মিশে, এজন্যই এই ব্যবস্থা।প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও, এখন এটা মেনে নিয়েছে। কোন বাসে যাওয়া হবে, সেটা আগেই ঠিক হয়ে গেছে। বাসটা সময়মতই স্ট্যান্ডে দাড়াল। এই বাসে বিভিন্ন ধরনের লোক বিভিন্ন জায়গা থেকে উঠে। তারা কেউ জানে না যে, সে কুষ্ঠাক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু এই স্ট্যান্ড থেকে যারা উঠে, তারা দূরত্ব বজায় রেখেই উঠে। সুখেন যে গেট দিয়ে উঠে, তারা সেই গেট দিয়ে বাসে ওঠে না। যাইহোক, বাসে উঠে একটা সিট পেয়ে গেল সুখেন।অবশ্য আরো দুজন যাচ্ছে। একজন আগেই উঠে সিট রেখেছিল।আরেকজন পরের স্টপেজে উঠবে। তারা তিনজনই যাবে। তাদের গন্তব্যস্থল দক্ষিন বাঁকুড়ার একটা গ্রামে। গ্রামের নামটা ঠিক মনে পড়ল না তখন।

বেশ কিছুটা পথ হেঁটে গ্রামটাতে পৌঁছাতে হয়। বাস যায় না সেখানে। বাসস্টপ থেকে ঐ গ্রামের দূরত্ব প্রায় দু কিমি হবে। ঐ পথটা হাঁটতে হবে। বাসটি পরের স্টপে যেতেই তাদের তিন নম্বর সঙ্গী উঠে পড়ল। ও অবশ্য সাথে সাথে সিট পেল না। লোককে জিজ্ঞেস করে দুটো স্টপের পরে ও সিট পেল। এই সঙ্গীদের নামগুলো একটু বলে নিই। একজনের নাম অজিত আর অন্যজনের নাম চিত্ত। ওরাও রোগমুক্তির পর ঘরে জায়গা পায়নি।গৌরীপুরের পাশে একটা ছোট বাড়ি তৈরি করে থাকে ঐ দুজন।ওরা দুজনে গৌরীপুরেই চাকরি করে। একজন অফিসের ক্লার্ক আর অন্যজন পিওন। ওদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে ঘন্টা দেড়েক সময় লাগবে। চোখ বন্ধ করে ওরা যেতে লাগল। ভোরে উঠেছে বলেই, একটু ঘুমের রেশ থেকে গেছে। বাসটা মানবাজার যাবে। তার দুটো স্টপেজ আগেই ওদের নামতে হবে। যথারীতি ওরা সেখানে পৌঁছে গেল। তাদের শরীরে কোথাও রোগ লেখা নেই। তাই একটা চায়ের দোকানে চা খেয়ে নিল ওরা। তারপর সুখেন সাথে করে আনা দোক্তা মুখে দিল, আর বাকি দুজন সিগারেট ধরালো। এরপর ওরা হাঁটতে শুরু করল। ঐ গ্রামে যেতে ওদের আধ ঘন্টা সময় লাগল।ওরা আগেই আলোচনা করে নিয়েছে, কি পরিচয় দেবে। ওরা নিজেদের স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মী বলে পরিচয় দেবে। ওরা সার্ভে করতে এসেছে। 

গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিভিন্ন গাছ। শাল, সেগুন ছাড়াও আছে পলাশ গাছ। এখন বসন্ত ঋতু, তাই পলাশগাছে ফুল ফুটে আছে। গাছ আর ডুংরি ঘেরা গ্রাম। ওরা গ্রামের মোড়ে পৌঁছে, রোগাক্রান্ত মানুষের খবর নিতে শুরু করল। কেউ বলতে চায় না কিছু। মুখ বেঁকিয়ে চলে গেল। হঠাৎ একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের সাথে দেখা। তার মুখ থেকেই কিছু খবর মিলল। একটা বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, একজন উৎকল রোগী বাড়ি থেকে দুরে একটা ছোট বাড়িতে খাটিয়ার উপর বসে আছে। তার সাথে পরিচয় করে কিছু খবর পাওয়া গেল। তারও এই রোগ হয়েছিল। প্রথমে চিকিৎসা করায়নি সে লোকলজ্জার ভয়ে। পরে যখন শরীরে লক্ষনগুলো ফুটে উঠল, তখন গ্রামের লোকজন জোর করে তাকে গৌরীপুর পাঠিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে তার পায়ে বিকৃতি হয়ে গেছে। প্রায় দু বছর চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি ফিরলেও, তাকে সংসারের মধ্যে থাকতে দিল না। তারজন্য এই ব্যবস্থা। খাবার দিয়ে যায় পাতায় করে, দুয়ারে নামিয়ে। কেউ কথাও বলে না, কাছেও আসে না।ভদ্রলোকের চোখে জল। ওনার মাধ্যমেই খবর মিলল, একজন রোগীর- কমবয়সী মেয়ে সে। বাবার নাম জিজ্ঞেস করে তাদের বাড়িতে পৌঁছালো ওরা। বাড়িতে নিজেদের পরিচয় দিলেও, প্রথম দিকে ঘর থেকে বের হতে বলল ওর বাবা। কিন্তু ওরা বসে থেকে একবার দেখা করতে চাইলে, গ্রামের অন্যদের সাহায্যে দেখা করার অনুমতি মিলল। কোঠাঘরের এক অন্ধকার কুঠুরিতে ওকে রাখা হয়েছে। হাত পা বাঁধা। দেখতে বেশ সুন্দরী। ওর সারা শরীরে বিষাক্ত রোগের চিহ্ন। মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, ওর চিকিৎসা চলছে বাড়িতেই।হাসপাতালে পাঠায়নি। সোমত্ত মেয়ে বলে পাঠায়নি। সুখেনের ঠোঁটে একটু ব্যঙ্গের হাসি। দেখা গেল ওর সামনে রাখা আছে একটা ত্যাবড়ানো থালা, একটা গ্লাস। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, বাড়ির কোন জিনিস ব্যবহার করতে পারবে না বলেই এই ব্যবস্থা।সুখেনের মনে হল যেন কোন পোষা কুকুর বাঁধা আছে। আর কুকুরকে যেমন খাবার দেওয়া হয়, ওকেও তেমনই করে খাবার দেওয়া হয়, জল দেওয়া হয়। সুখেন জিজ্ঞেস করল- আর বাথরুম পায়খানা? উত্তরে মিলল সেই তথ্যও। প্রতিদিন ভোরে লোক ওঠার আগে ওকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের পুকুরে। ওকে ওর বাবাই নিয়ে যায় ঠিক যেমনটি চেনে বেঁধে কুকুরকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর বাকি সময় ওকে নিচে নামিয়ে পাশের ফাঁকা জায়গায় ঘেরা করা অংশে নিয়ে যাওয়া হয়। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকে সুখেনের চোখে জল চলে এল। এর নাম জীবন? আমি ঈশ্বরের কাছে ওর মৃত্যু কামনা করলাম। হয়ত বা, ওদের বাড়ির লোকও একই চিন্তা করে চলেছে।

এরপর আমরা এলাম সাঁওতাল পাড়াতে। যদিও উৎকল পাড়াতে আরো অনেক রোগী আছে, কিন্তু তারা কথা বলতে দেবে না বাইরের লোকের সাথে। সুখেন ভাবল, হয়ত তারাও একইরকমভাবে চরম নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে। মৃত্যুই একমাত্র মুক্তি। সাঁওতাল পাড়াতে দু তিনজন রোগীর সাথে কথা হল। তারাও একইভাবে একাকীত্বের জীবন ভোগ করছে। এই তিনজনের মধ্যে একজন মাত্র চিকিৎসা করাচ্ছে। বাকিরা সব ওদের সমাজের কবিরাজের ওষুধ খাচ্ছে। তাতে নিরাময় তো হয়নি, উল্টে উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে। চিকিৎসা করানোর কথা বলতেই তারা উত্তর দিল- "কি আর হবে, চিকিৎসা করিয়ে? এটা মারাংবুরুর অভিশাপ।" গ্রামের সম্পৃর্ন রোগীর তথ্য পাওয়া না গেলেও, যে কজনের সাথে কথা হল, তাতে একটা চিত্র ধরা পড়ল। ওরা তিনজন ফিরে এল মোড়ে। যে দোকান থেকে চা খেয়েছিল, সেখানেই চপ দিয়ে মুড়ি খেল। তারপর চা খেয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা। বাস আসবে সেই বিকেল তিনটার সময়। বসে বসে গল্প করতে লাগল তিনজন।

সুখেন যখন বাড়ি ফিরতে সাইকেল নিল, তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছিল। আজ ভাত খাবার কথা ছিল কোন হোটেলে। কিন্ত যেসব চিত্র ওরা দেখল, তাতে খিদের সামান্যতম ইচ্ছেটাই ছিল না।সুখেনের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তখন একটাই চিন্তা- কি করে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে? সাইকেল নিয়ে আসার সময় চোখ পড়ল পলাশগাছের দিকে।  দেখল রাখালেরা পলাশফুল পাড়ছে। তারা হয়ত কেউ রঙ তৈরি করবে, কেউ বা আবার রাজমুকুটের মত মাথায় পরবে। আবার অনেকেই আজকের যুবতীদের কিছু পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করবে। প্রকৃতির রঙিন সজ্জার সাথে অন্যান্য মানুষের আনন্দের প্রতিচ্ছবি। সুখেনের ভালো লাগে না এসব। তবুও চোখ পড়ে বলে দেখতে হয়।

সুখেন যখন বাড়ি ফিরল, তখন সন্ধ্যে নামার অপেক্ষা করছে।সূর্যদেব আপন কাজ সেরে বিশ্রামে গেছেন। প্রকৃতি তাদের রুটিনমাফিক কাজ করে চলেছে। কিন্তু তাদের মত নিপীড়িত কুষ্ঠরোগীরা? তাদের জীবনে আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই, নেই কোন আশা ভরসা- শুধুই অপমান আর অবজ্ঞার কন্ঠহার। একটাই প্রার্থনা- মৃত্যু দাও হে ঠাকুর। বাড়িতে ঢুকে তার জন্য নির্দিষ্ট খাটিয়াতে শুয়ে পড়ল। আজ সারাদিন খাওয়া কিংবা স্নান হয়নি।একবার ভাবল স্নান করে নিই। আবার পরক্ষনেই চিন্তা করল যে, এখন স্নান করলে ঠান্ডা লেগে যাবে। অসুখে পড়ে যাবে। কটাদিন ভোগ করতে হবে। তার থেকে হাত পা ধুয়ে মাথাটা ধুয়ে ভিজে গামছাতে গা মুছে নিল। তবুও একটু ভালো লাগছে। এতক্ষন যে ক্লান্তিটা ছিল, সেটা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন অল্প খিদেও পাচ্ছে। সুখেন ভাবল, এখনই খেয়ে নিই। আবার পরক্ষনেই ভাবল, থাক কিছু পরেই খাব। খাটিয়ার পাশে হ্যারিকেনটা জ্বালানো ছিল, কিন্তু তার শিখাকে কম করে রাখা ছিল। পলতেটা একটু উস্কে নিয়ে আলোর শিখাটা বাড়িয়ে দিল। তারপর চিন্তাতে ডুব দিল। মনে পড়ে গেল, কিভাবে এই রোগ নির্ধারন করা হয়। সুখেন এখন অনেক কিছুই জেনে গেছে, কিন্তু কাজ কিছুই করতে পারেনি।

সুখেন কোন চিকিৎসা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত নয় ঠিকই, কিন্তু ডাক্তারবাবুদের সাথে কথা বলে সব জেনে গেছে। কিভাবে কুষ্ঠ রোগ নির্নয় করে, এই সেটা সে জানে। এই রোগ পরীক্ষা করা হয় রোগীর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে। এই রোগের শুরুতেই অনেকসময় রোগের লক্ষনগুলো সঠিকভাবে বোঝা যায় না। আর তখন জীবানু পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নির্ধারন করা হয়। কুষ্ঠরোগের বহিঃপ্রকাশ হল এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর ঐ বহিঃপ্রকাশ থেকে রোগের একটা আভাস পাওয়া যায়। ঐ আভাস থেকে সন্দেহ করা যায়, কিন্তু কুষ্ঠ নির্নয় করা যায় না।ক্যানসারের ক্ষেত্রে যেমন বায়োপসি করে ক্যানসার নির্নয় করা যায়, তেমনই কুষ্ঠ নির্নয়ের ক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক লক্ষন পরীক্ষা প্রচলিত। ঐ তিনটির মধ্যে দুটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা আর অন্যটা জীবানু ভিত্তিক বাহ্যিক পরীক্ষা। সুখেনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল। তাই আপাততঃ চিন্তার জালকে বিশ্রাম দিয়ে খাবার খেতে বসে গেল। সুখেন রুটি পছন্দ করে না। দু বেলাতেই ভাত খায়। আর তাই রাত্রে ওর জন্য ভাত আসে। ভাত খেয়ে হাত মুখ ধুয়ে, থালাটাও ধুয়ে নির্দিষ্ট জায়গাতে রেখে দিল। তারপর বাইরে গিয়ে বাথরুম সেরে, আলোটা কমিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নিল। সাথে সাথেই ঘুম চলে এল। গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। অন্যদিন আরো একবার বাথরুম যায়। আজ আর রাত্রে উঠল না। একঘুমেই সকাল। 

চলবে 

৪টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগছে গল্পটা কিন্তু মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে।...মাম্পী দাস

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ আপনাকে। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন 🙏

      মুছুন
  2. উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ আপনাকে। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।

      মুছুন