ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৩১ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

   অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।  প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ  একত্রিশ  পর্ব - সম্পাদক ।) 

মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল 

১৯০৪ সালের ঘটনা। ক্ষুদিরামের জামাইবাবু অমৃতলালের বদলির  চাকরি। অগত্যা তমলুক থেকে ক্ষুদিরাম সহ সপরিবারে এলেন মেদিনীপুরে। অমৃতলাল ছেলে ললিতমোহন এবং ক্ষুদিরামকে মেদিনীপুরের গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলে ফোর্থ স্ট্যান্ডার্ড বা চতুর্থ শ্রেণীতে (বর্তমান সপ্তম শ্রেণী তুল্য) ভর্তি করে দেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ঋষি রাজনারায়ণ বসু। এই বিখ্যাত ও সারস্বত, স্বাধীনতাকামী "বসু পরিবার" ই অরবিন্দ, বারীন্দ্রের মামাবাড়ি। রাজনারায়ণ বসুর ভাই অভয়চরণের ছেলে হলেন অগ্নিযুগের দুই সন্তান জ্ঞানেন্দ্রনাথ এবং সত্যেন্দ্রনাথ। বাবার মতই জ্ঞানেন্দ্রনাথও কলেজিয়েট স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। তিনি ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে পরোক্ষে স্বদেশীয়ানার আশ্রয় নিতেন। বিশ্বের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ছাত্রদের পড়াতেন তিনি। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে গণচেতনা ও দেশপ্রেমের জ্ঞানের আলো জ্বেলে দিয়েছেন শিক্ষক জ্ঞানেন্দ্রনাথ। এই স্কুলের চৌহদ্দিতে ক্ষুদিরাম পেলেন সশস্ত্র সংগ্রামের নিখাদ পঠনপাঠন। স্কুলের মধ্যেই ছিল শরীরচর্চার আলাদা ও বিশেষ ( ব্যায়ামাগার ) ব্যবস্থা। ক্ষুদিরামের দেহে মনে এক লহমায় খেলে গেল খুশির ঝিলিক। আরও সুখের কথা হল এই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন ক্ষুদিরামের জামাইবাবু অমৃতলাল । তিনি ছিলেন শিক্ষক অভয়চরণের প্রিয় ছাত্র। আবার সশস্ত্র বিপ্লবের আগুনে হাত সেঁকতে ক্ষুদিরামকে পথ দেখিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও হেমচন্দ্র কানুনগো। 

ঋষি রাজনারায়ণ বসু 
ক্ষুদিরামের বাল্য ও কৈশোরকাল ছিল দুঃখের চাদরে মোড়া। ছোটবেলাতেই মা বাবা, দুই দিদির অকাল মৃত্যুতে দিশেহারা ক্ষুদিরাম। মায়ের অপার স্নেহ কি জিনিষ সেটা পেয়েছিলেন বড়দিদি অপরূপার কাছ থেকে। দিদি জামাইবাবু তাকে নিজের সন্তান ললিত মোহনের মতোই আদরে আবদারে বড় করে তুলছেন। তিন মুঠো খুদ্ চাল দিয়ে নিজের ভাইকে কিনে সন্তানের মর্যাদায় প্রতিপালিত করেছেন। ক্ষুদিরামও দোসর হিসেবে পেয়েছেন ভাগ্নে ললিত মোহনকে। দু'এক বছর বয়সের তফাৎ মামা ভাগ্নের। সমস্ত রকম ভালো মন্দ কাজ কর্মের সাক্ষী এই ললিত মোহন। ছোটবেলার দস্যিপনা থেকে সমাজসেবা, দেহ চর্চা, লাঠি, ছুরি খেলা,কলেরা বসন্তের মতো মহামারী এমনকি কংসাবতীর ভয়াবহ বন্যায় আর্ত পীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো ক্ষুদিরামের স্বভাব হয়ে উঠেছিল । আরও দুটো গুণের কথা বলতেই হয় ডাকাবুকো ক্ষুদিরাম সম্পর্কে। বিষধর সাপ ধরার পাশাপাশি ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। কখনো মেঠোসুরে বাঁশিতে তুলতেন- "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি" কিম্বা বিদ্রোহের গান থেকে শ্যামা সঙ্গীতের সুরে মোহিত করে তুলতেন আপামর মানুষকে। মাতৃসমা বড়দিদি অপরূপার মনে শুধু ভয় - শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরীর মায়ের আশীর্বাদ ধন্য তার ক্ষুদিরাম যেন বেপরোয়া কিম্বা বোহেমিয়ান না হয়ে যায়। নিজের সন্তান ললিত মোহনকে সদা সর্বদা ক্ষুদিরামের সঙ্গে লেপ্টে থাকার নিদান দিতেন অপরূপা। একটি সৌখিন শখ ছিল বালক ক্ষুদিরামের। সেটা হলো - ডিটেক্টিভ বই পড়া। এই বিষয়টিকে তিনি নেশায় পরিনত করেছিলেন। তখনকার দিনে অসম্ভব জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্প লেখক হলেন-পাঁচকড়ি দে। গোয়েন্দা গিরির জন্য প্রখর বুদ্ধি, অদম্য সাহস আর সুদৃঢ় মনোবল ক্ষুদিরামকে চমৎকৃত করে তুলতো। ভাবনার গভীরে ডুবে থাকতেন তিনি। আগামীর রূপরেখা রচনার জন্য অনুপ্রাণিত হতেন। বড়দিদি অপরূপা লিখছেন তাঁর এই গুণধর ভাই সম্পর্কে - "খুব দুরন্ত, লেখাপড়ায় মন‌ নেই, শুধু খেলা আর খেলা। আবার যেদিন পড়ার ইচ্ছা হতো, সেদিন যেন তপস্যায় বসতো। মাস্টার আশু রায়ের যত কিছু শাস্তি ছিল, তার সবই হার মেনেছিল ক্ষুদিরামের একগুঁয়েমির কাছে।" এই ভাবেই স্বদেশীয়ানার বোধ জাগলো ক্ষুদিরামের।  মোহবনি কিম্বা হবিবপুর মহল্লা থেকে এলেন দাসপুর থানার হাটগাছিয়া (হাটগেছ্যা) গ্ৰামে। দিদির বাড়িতে খাওয়া পরার পাশাপাশি শিক্ষালাভের জন্য এখানকার গিরীশ মূখার্জীর পাঠশালায় ক্ষুদিরামকে ভর্তি করে দেন অমৃতলাল বাবু। ক্ষুদিরাম তখন ছয় সাত বছরের বালক। এই বয়স সন্ধিকালে ক্ষুদিরাম প্রতারিত হয়েছিলেন পৈত্রিক বিষয় আশয় থেকে। পৈত্রিক সম্পত্তি এবং বাবার কাছে গচ্ছিত থাকা নাড়াজোল জমিদারির মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় বাবারই ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়। দেনার দায়ে পিতৃসম্পত্তি বিক্রি হয়ে যায়। প্রথম প্রথম সদ্য মা বাবা হারানো অসহায় ক্ষুদিরাম আশ্রয় পেয়েছিলেন সুহৃদ প্রতিবেশী অবিনাশ চন্দ্র বসুর বাড়িতে। কিছুদিন পর ভাইয়ের অসহায়তার খবর পেয়ে অপরূপা নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তীব্র সঙ্কট আর অস্তিত্বের লড়াইয়ে ক্ষুদিরাম ঠাঁই পেলেন দিদি জামাইবাবুর সংসারে। এই ভাবে তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ক্ষুদিরাম বড় হয়ে উঠছিলেন। একই সঙ্গে দুরন্তপনা ও দুষ্টুমিরও খবর মিলছিল অনায়াসেই । 

কিছুদিন পর আবার বাসা বদল ঘটল তমলুকে। অমৃতলাল বাবুর ছিল বদলির চাকরি। সপরিবারে উঠে এলেন তমলুকে। এখানকার একটি প্রাথমিক স্কুলে ক্ষুদিরামকে ভর্তি করা হয়। চতুর্থ শ্রেণীতে হ্যামিল্টন স্কুলে ক্ষুদিরাম ও ললিতমোহনের শিক্ষাক্রম শুরু হয়। এখানে পড়াকালীন ক্ষুদিরাম হয়ে উঠলেন এক দূরন্ত, দুর্দমনীয় বালক। লেখাপড়ার জায়গায় প্রাধান্য পেল খেলাধূলা ব্যায়াম আর শরীরচর্চা। তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলো দূরন্তপনা আর দস্যিগিরি। একই সঙ্গে সঙ্গে চলল কলেরা মহামারীতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা শুশ্রুষার কাজ। আবার মৃতদেহ উদ্ধার করে শ্মশানে দাহ করার কাজে ক্ষুদিরাম হয়ে উঠলেন সিদ্ধহস্ত। এমন গুণপণার পাশাপাশি বিষধর সাপ ধরে মাথার উপর ঘোরানো, বাজি ধরে গভীর রাতে মহাশ্মশানে ভ্রমণ ছিল ক্ষুদিরামের কাছে জলভাত। ভালো কাজেও  বেনজির দৃষ্টান্ত রেখেছেন অকুতোভয় ক্ষুদিরাম। এখানে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট উদাহরণ দিলেই চেনা যাবে শৈশবের দেশপ্রেমী ক্ষুদিরামকে। 

চলবে 

৩টি মন্তব্য: