ধারাবাহিক উপন্যাসঃ নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব এক () অতনু চট্টোপাধ্যায়

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে আজ থেকে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হচ্ছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ প্রথম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(১)

সম্পূর্ন একা বাস করে সুখেন, কোন সঙ্গী সাথী ছাড়াই। রামপুর গ্রাম থেকে বেশ কিছুটা তফাতে সুখেন আছে বেশ কয়েক দশক ধরে। কেউ কোন খোঁজখবর নেয় না। তার যে বাড়িটা মাথা তুলে আছে একটা সমতল জায়গায়, ওটা দেখতে অনেকটা একটা বড় উঁইঢিবির মত। পাশে বয়ে চলা গন্ধেশ্বরী নদীর মতই সুখেনের জীবন। আর তাই নদীই তার সখা, কথা বলার এক সঙ্গী।

সারাটা দিন সুখেন যে কি করে, কেউ খবর রাখে না। আসলে ওকে যে সকলে এড়িয়ে চলে। এক সময় ছিল বই পড়ার নেশা। কিন্তু বই সে পাবে কোথা? কে দেবে তাকে বই? তবে সুখেনের বাড়িতে ঢোকার মুখেই রয়েছে একটা বাগান। আছে ফল ফুলের গাছ। ফল পেকে নিচে পড়ে থাকলেও, কেউ আসে না। এমনকি যারা এদিকে গরু চরাতে আসে, তারাও এদিক পানে আসে না। সারা সকাল বাগানের পরিচর্যা করার পর, নিজের হাতে স্টোভ জ্বালিয়ে চা খায়।ধূমপান করে না, কিন্তু দোক্তা চুন মুখে রাখে। দুপুরে খাওয়ার পর, একটা খাটিয়াতে শুয়ে কিছুটা সময় কাটায়। মাঝেমধ্যে একটু ঘুমিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যে রেডিওটার নব ঘুরিয়ে খবর শোনে, গান কিংবা নাটক শোনে। তারপর সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার সাথে সাথেই, সুখেন বেরিয়ে পড়ে। নদীর পাড়ে একটু হেঁটে বালির উপর বসে চিন্তার সাগরে ডুব দেয়। ফিরে যায় অতীতে। নিজের মনেই হাসে আবার কখনও কাঁদে।

এই নদীর পাড়ে বসেই সুখেন সূর্য ওঠা আর সূর্যাস্ত দেখে।পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়ার সাথে সাথে রঙীন আকাশটা দেখে।মেঘ ক্যানভাসে কোন এক শিল্পীর অপরূপ শিল্প সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে। নদীর পাড়ে একটা বড় অশ্বত্থ গাছের উপর পাক খেতে থাকা পাখিদের দেখে। তাদের কিচিরমিচির শব্দটাও যেন কত মিষ্টি শোনায় সুখেনের কানে। একমাত্র বর্ষাকালে সুখেন এই সুখভোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। ঐ সময়ে সে বড়ই একেলা। নদীও তার সাথে কথা বলে না, তাকে বসার জন্য বালিতে কোন আসন পেতে দেয়না। তখন নদীকে দেখলে মনে হয় এত খিদে তেষ্টা নিয়ে সে ছিল কি করে এতগুলো দিন। তাই মনের সুখে খাওয়া আর পান করা সেরেও, বুকে কিছুটা জমিয়ে রাখে পরবর্তী সময়ের জন্য। না, সে একা নিজের জন্য নয়, সুখেনও ঐ অমৃতের ভাগ পায়। ঋতু পর্যায়ে ঋতুরা আসে। শরৎ এলে জানান দেয় নদীর বুকে কাশফুল ফুটিয়ে। এভাবেই ডুবে থাকে সুখেন নিজেকে নিয়ে। আগে এই এলাকাটা ছিল পুরো ফাঁকা। সন্ধ্যে হবার আগে থেকেই ডাকত শেয়ালেরা এক সুরে- "হুক্কা হুয়া"। আর দেখা যেত নেকড়ে বাঘ।সুখেন কতবার প্রত্যক্ষ করেছে ওদের। ওরা কোন ক্ষতি করেনি।তবে ওদের চোখগুলো দেখে মনে হত যেন কোন টর্চ জ্বলছে দুরে জোড়াভাবে। আগে দিনের বেলায় দেখা যেত রাখাল বালক আর চাষীদের। কিন্তু সন্ধ্যে নামার সাথে সাথেই ওরা এদিক পানে আসত না। মাঝেমাঝে অবশ্য চোরেদের আনাগোনা টের পেত। হয়ত কোন শস্যক্ষেত থেকে কিছু চুরি করার জন্যে। হয়ত পেটের ক্ষিদে মেটানোর উপায় হিসাবে এই পেশাকেই বেছে নিয়েছে। এখন অবশ্য রাত পর্যন্ত লোকজন দেখা যায়। লিফ্ট ইরিগেশন কিংবা শ্যালো টিউবওয়েলের সৌজন্যে আশে পাশের সব জমিই কোন না কোন ফসলে পূর্ণ। সেগুলোর রক্ষা করার তাগিদে রাত পাহারা দেয়।ওদের কথা কানে আসে। এতে সুখেনের কিছু যায় আসে না। এখন কিছু মানুষ দুর থেকে কথা বলে যায় সুখেনের সাথে। না, ঘরে ঢোকে না কেউ।

রাতে শুয়ে শুয়ে সে আকাশ পাতাল ভাবে। ফিরে যায় তার অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোতে। বাড়ি- হ্যাঁ, তারও একটা বাড়ি ছিল। ছিল পরিবার, আর ছিল ভালোবাসা আর স্নেহের এক অটুট বন্ধন। অটুট শব্দটা মনে আসতেই, হাসি চলে এল ঠোঁটে। হ্যা, অটুটই তো! তাই তো সেই বন্ধনের টানে সুখেনের কপালে জোটে দুপুরের খাবার, সকালের জলখাবার আর রাতের খাবার ছাড়াও আরো টুকটাক জিনিসপত্র দরকার মত। অবশ্য আগে বাড়ির মুনিষকে দিয়ে এসব জিনিস পাঠাত। বাইরে দাড়িয়ে থাকত সে।ঘরে ঢোকার আগে হাঁক পাড়ত- "ছোট কর্তা, বাড়িতে আছ?" সুখেন "হ্যা"বলে হাসিমুখে ওর ব্যবহৃত থালা বাটি নামিয়ে দিত। ঐ মুনিষ তার থালাতে সব খাবার দুর থেকে ছুঁড়ে দিত সুখেনের থালাতে আর বাটিতে। তারপর ওগুলো দিয়ে "আসছি" বলে বিদায় নিত। না কোনদিনের জন্য ও বসত না, কিংবা কোন ঠেকাঠেকি করত না। দোক্তা, চুন, চা, চিনি, গুড়ো দুধ, কেরোসিনও সময়মত দিয়ে যেত। ঐ মুনিষের নাম ছিল রাখাল। ওকে রাখালদা হিসাবেই সুখেন ডাকত। প্রায় সমবয়সী ছিল ওরা। একটা সময়ে কি বিশাল সখ্যতা ছিল তাদের। আর সেই সখ্যতার খাতিরেই রাখালদা আসে। কোন কিছু স্পর্শ না করে,খাবার রেখে দুর থেকে কিছু খোঁজখবর নিয়ে সে চলে যায়। রাতের খাবার অবশ্য বিকেলেই দিয়ে যেত। সন্ধ্যে করত না কোনদিন। রাখালদাকে জিজ্ঞেস করলে বলত- "বাবা,তুমি বলেই আছ; সন্ধ্যেতে আমার আসার সাহস নেই।ভূতে আটকাবে,আর নয়তো নেকড়ে। আমি তোমাকে এই বিকেলেই দিয়ে যাব।"

একদিন জিজ্ঞেস করেছিল সুখেন- "আচ্ছা রাখাল দা, এই যে তুমি আস, এসে খাবার দিয়ে যাও, তো বাড়ির লোকেরা কিছু জিজ্ঞেস করে না?"

-"হ্যা,করে তো।"

-"কি বলে?"

-"হ্যা রে,বাসনপত্র ঠেকাস নি তো? ওখানে বসিস না তো? এসব কথা সব।"

সুখেনের ঠোঁটে একটু হাসি ফুঁটে ওঠে। তারপর জিজ্ঞেস করে-"তাহলে আস কেন?"

-"সত্যি বলব?"

-"হ্যা,বল।"

-"তোমাকে না দেখলে আমার মন খারাপ লাগে। কত বড় পরিবারের ছেলে তুমি। সকলকে কত ভালবাসতে। আমাকে কত ভালবাসতে। আমার তো মনে হয় তোমার সাথে থেকে যাই। কিন্তু ঐ যে তোমার কি যেন একটা রোগ হয়েছে, তাই তো সকলে বারন করে।"

-"তোমাকে থাকতে হবে না রাখাল দা। এই যে এখানে বন্দী আছি, তুমি তো অন্তত এসে আমাকে খাবার দিয়ে যাও, কাজ করে দাও, এটাই তো আমার পরম পাওনা। নিশ্চয় গত জন্মে তুমি আমার আপনজন ছিলে, তাই তো এই জন্মে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছ।"

-"আচ্ছা ছোটকর্তা, তুমিতো কত পড়াশোনা করেছো, কত জানো, তাহলে তোমাকে কে পারা খাওয়ালো বুঝতে পারলে না?"

-"দুর বোকা, ওসব পারা খাওয়ানো টাওয়ানো কিছু নয়।ওটা গ্রামের লোকেরা রটিয়ে বেড়ায়।এটা আসলে এক ধরনের রোগ।" -(হেসে) "রাখাল দাদা তবে যে লোকে বলে, তুমি যে মেয়েটাকে ভালবাসতে, ওদের ঘরের লোকের না কি তুমি বামুন নও বলে, বিয়ে দেবার ভয়ে তোমাকে খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল।"

-"তাহলে তো চিকিৎসা করালেই ভালো হয়ে যেতে।"

-"হ্যা, আমি তো ভালোই হয়ে গেছি। আমি তো হাসপাতালে ভর্তি হয়ে, সুস্থ হয়ে গেছি।"

-"তাহলে তোমাকে বাড়ি ফেরালো না কেন?"

-"সে তুই বুজবি না। অন্য একদিন তোকে এসব নিয়ে গল্প শোনাবো।"

-"আচ্ছা, সে না হয় হল। কিন্তু তুমি যে মেয়েটাকে ভালোবাসতে, সে কেন দুরে সরে গেল?"

-"আ, চুপ করে যাও। আর ভালো লাগছে না।"

রাখাল আর কোন কথা বলত না। ধীর পায়ে ফিরে যেত।

চলবে 

১০টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ সুন্দর

    উত্তরমুছুন
  2. ভীষণ ভালো লাগলো স্যার। দ্বিতীয় পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. পড়ে বেশ ভালো লাগলো।পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  4. ধন্যবাদ। নিয়মিত আমাদের সঙ্গে থাকুন।

    উত্তরমুছুন
  5. বর্ণনা সুন্দর,একটা একটু ধন্দে পড়ে গেলাম,ইরিগেশন বা লিফ্ট পাম্প যে দেখছে,সে কি নেকড়ে দেখতে পেত,? সুখেনের বয়স তাহলে কত? আবেগের জায়গা চলে আসছে, অপেক্ষা করছি।
    স্বপন কুমার পাল।

    উত্তরমুছুন
  6. মেঠোপথকে ছেড়ে এসেছি।ফেলে এসেছি পালকির গান ,কামারশালের হাপরের ব্য্যথাময় ধ্বনি । সুখেনের মানসলোক দিয়েই দেখতে চাই,অনুভব করতে চাই। ভালো লাগছে এই দুলকি চালের কথন ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।

      মুছুন