অগ্নিশপথ
সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ সাতাশ পর্ব - সম্পাদক ।)
১৯০৮ সালে হেমচন্দ্র এবং আর এক সশস্ত্র তরুন বিপ্লবী উল্লাসকর মিলে ট্রায়াল পর্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমাটি বানিয়েই ঝড় তুলে দিলেন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে। অভিনব ও ভয়ঙ্কর "pcric Bomb" বানিয়ে ফেললেন অনায়াসে। এই বোমা ব্যুমেরাং হয়ে যায় দেওঘরের দিঘরিয়া ডুংরিতে। পরের বোমাটি প্রয়োগ করা হয় ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের মেয়রকে পৃথিবী থেকে নিকেশ করার লক্ষ্যে। তিনি কপাল জোরে বেঁচে যান। দ্বিতীয় বোমাটি ছিল বিষ্ফোরণে ঠাসা এক পত্রবোমা। একটি প্রমাণ সাইজ বইয়ের আকারে, যার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম স্প্রিং লাগানো ছিল। কুখ্যাত বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ড বরাত জোরে বেঁচে যান। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তির মারণবোমাটির বিষ্ফোরণ ঘটেনি। এই প্রাণঘাতী হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ব্রিটিশ প্রশাসনে ও জনমানসে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ পুলিশ বিভাগ ও প্রশাসনের উচ্চবিভাগে ত্রাসের সঞ্চার হয়। বিচারক থেকে মেয়র কিম্বা ছোটলাটকে হার্ড টার্গেট করে উপুর্যপরি নৃশংস হত্যার ছকে নড়েচড়ে বসলো তারা। তদন্ত এবং পুলিশি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিল ব্রিটিশ সরকার। বিশেষ ক্ষমতা দিল কলকাতা পুলিশ কমিশনার অগাস্টাস চার্লস টেগার্টকে। প্রসঙ্গত বিপ্লবের চুড়ান্ত পর্বে এই দুই কর্তাভজা ব্রিটিশ দাস'কে প্রশাসনের মুখ হিসেবে উপস্থিত করা হয়েছিল। তার মধ্যে বিচারক কিংসফোর্ডকে রক্ষা করার জন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে জেলা জজ হিসেবে বদলি করা হল মজ্জফরপুরে। ভারতীয়দের ঘৃনার চোখে দেখতে অভ্যস্ত এই দুই ব্রিটিশ পোষ্য দাস। বিচারের নামে প্রহসনে পরিণত করতে সদা ব্যস্ত হাকিম কিংসফোর্ড সাহেব ।
হেমচন্দ্রের নেতৃত্বে শুধু বোমা নয়, বন্দুক, পিস্তল আর গুলি-গোলা বিতরণ করা হলো তরুন, কিশোর বিপ্লবীদের হাতে। চারিদিকে সমর সজ্জায় সাজানো হলো মৃত্যুঞ্জয়ী বীরদের। শুরু হতে চলেছে মহারণ। এরই মাঝে কাজ করতে গিয়ে হেমচন্দ্রের ঘুম, ক্ষিদে তেষ্টা উড়ে গেল। মুরারি পুকুর বাগানবাড়ির পাশাপাশি ব্রিটিশ চর ও পুলিশের নজর এড়িয়ে খুবই গোপনে নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে তাঁর আস্তানায় মজুদ হত আগ্নেয়াস্ত্র ।
এই রকম দুঃসাহসিক হয়ে ওঠার মতো ছিলেন না হেমচন্দ্র । খুবই প্রতিভাবান শিল্পী ছিলেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ভারতীয় শিল্প কলা চর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। শুধুমাত্র মাতৃভূমির টানে, তাঁর জীবন- যৌবন, শিক্ষা- দীক্ষা সবই সঁপে দিলেন দেশমাতার পায়ে। বারিণের তত্ত্বাবধানে এবং হেমচন্দ্রের প্রয়োগ কৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে ছোরা খেলা, লাঠি খেলা, ব্যায়াম, শরীরচর্চা, কুস্তির আখড়াকে সামনে রেখে শুরু হয়ে যায় সামরিক মহড়া। একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনির রূপ ধারণ করে। সুনির্দিষ্ট মেয়াদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে তাদের নিয়ে গড়ে ওঠে "জাতীয় স্বেচ্ছা সেনাবাহিনি"। হেমচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনী "বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা"তে গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম ও সশস্ত্র বিপ্লববাদ নিয়ে রোমহর্ষক কাহিনি লিখে গেছেন। তিনি ঈর্ষনীয় একটি কাজের মধ্যে থেকে শুধুমাত্র দেশমাতার সেবার জন্য সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়েছেন। হেমচন্দ্র দাস এর জন্ম বিপ্লববাদের তীর্থভূমি মেদিনীপুরের রাধানগর গ্রামে। বাবার নাম ক্ষেত্রমোহন দাস। হেমচন্দ্রদের আদি বাসভূমি ছিল ওড়িশার জাজপুরে । জমি জরিপের কাজে নিয়োজিত থাকতেন বলে 'কানুনগো' পদবী হয়ে যায়। হেমচন্দ্রের স্কুলজীবন শুরু হয় মেদিনীপুর টাউন স্কুল থেকে। এখান থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে মেদিনীপুর কলেজে এফ.এ. পড়তে পড়তেই ক্যাম্বেল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পরিবারের আপত্তিতে ডাক্তারি পড়া হলো না।
চলবে

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন