রবিবাসরীয় অণুগল্পঃ প্রশিক্ষক () জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

 প্রশিক্ষক  


জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

খচখচ খচখচ কাঁচি চলছে। মানা একমনে চুলের প্লাস-মাইনাসের হিসেব কষছে। গোপাল চাইছে তাড়াতাড়ি সেটা শেষ হোক, তারপর আরও নাকি একজন, তারও পরে আসবে ওর পালা।
বিরক্তি আসে, তাড়া আছে, দূরে যেতে হবে।
মানার ভ্রূক্ষেপ নেই, কাঁচি আর চিরুনির যুগলবন্দি
চলছে। মনে হচ্ছে যেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া আর উস্তাদ জাকির হোসেনের বাঁশি-তবলার
বোলবোলা চলছে! শালা! কাটবি তো ওই চুল-দাড়ি, তার এত পাঁয়তারা কিসের? তুই কি কাউকে
উত্তম কুমার বানাতে পারবি?
একটা এনফিল্ড বুলেট এসে থামে, মানুষকে উত্যক্ত করা শব্দে জানায় সেই হলো --  দ্যা বস!
একটা স্ল্যাং ভেবে তাকিয়ে দেখে ভোলাদা নামছে। সে এলাকার দাদা। সবাই তাকে মান্য করে, অন্তত সামনে ।
-- কত দেরি রে মানা?
-- দেরি হবে দাদা। এরপর একজন আছে, তারপর উনি, তারপর তোমাকে ধরতে পারবো।
-- ও তুই তো আবার সিরিয়াল ভাঙবি না। যাক তোর নিয়ম আমি ভাঙতে চাই না, কার লাইন বলতো?
চেয়ারে বসা একজন অচেনা মানুষকে ইঙ্গিত করে মানা পরামানিক।
ভোলাদার চোখ হতাশ, ফিরে আসে।
-- তারপর কে?
এবার গোপালের দিকে ইঙ্গিত করে মানা, তাকায় ভোলাদা।
-- ও এবার আপনার পালা? আমার একটু তাড়া আছে, আমার পরে আপনি  বসবেন।
আদেশ না অনুরোধ -- ক্লাসিফিকেশন টেবিলে ফেলার আগেই গোপাল ঘাড় নাড়ে। কে আর দাদাকে চটায় ?
যদি কোনোদিন ওর কাছে যেতে হয়।
অসহায় দৃষ্টিতে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে মানা কাজ চালিয়ে যায়। সে কি বিরক্ত?
ভোলাদা রাজার মতো ভঙ্গিতে বেরিয়ে যায়, ওর দিকে তাকায়ও না। চেয়ারে বসতে গিয়ে নিজেকে ফতুর জমিদার বলে মনে হয় গোপালের।
-- আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। আমাকে একটা কাজে যেতে হবে।
-- আপনি ভোলাদাকে বললেই পারতেন!
-- আসলে বলবো ভেবেও বলতে পারলাম না। যদি কিছু ভাবেন। উনি প্রভাবশালী লোক।
-- তাতে কী হয়েছে? কাল এসডিও সাহেব ডেকেছিলেন, আমি জানিয়ে দিই, হাতের কাজগুলি না সেরে
যেতে পারবো না। উনি বিরক্ত হয়েছিলেন নিশ্চয়, কিন্তু পরে বুঝেছেন।
মানার মতো সিদ্ধান্তে স্থির থাকাই ভালো, কিন্তু সে পারবে কি?
-- মানা, এসডিপিও সাহেব তোমাকে ডাকছেন। হাতের কাজ সেরেই এসো -- কনস্টেবল শ্রেণির একজন এসে বললেন।
মানা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। গোপাল ভাবে অতি সাধারণ সামান্য একজন নাপিতের যে মানসিক
দৃঢ়তা আছে,bএকজন অফিসার হলেও তার তা নেই।মাথা নত হয়ে আসে। মনে মনে মানাকে বলে, হ্যাটস অফ টু ইউ !
    বাড়ির সামনে এসে দেখে লংকা, গুল্লু আর মন্টা তিনজন তার বাড়ির দিকেই যাচ্ছে। তিন উচ্ছন্ন
পার্টি, হাফ মস্তান, নানা ছলছুতোয় শুধু চাঁদা তোলে আর নেশা করে। ক্লাবের নামটা ব্যবহার করে বটে,
কিন্তু ভয়ে কেউই ওদের ঘাঁটায় না, চাঁদা দিয়ে দেয়।
লংকা ওকে দেখতে পায়, বলে, আরে ওইতো দাদা এসে গ্যাচে। ক্লাবের চাঁদাটা দাও দাদা।
-- কীসের চাঁদা?
-- ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস আছে না! অনুষ্ঠান হবে, নাচা-গানা হবে। এবার পুরো হাজার লাগবে।
-- হাজার! টাকা কি গাছে ফলে?
নিজের গলা আজ তার অচেনা লাগে। এত দৃঢ় উচ্চারণ কি তার?
তিনটে কুচুটে মুখ আরও বেঁকে যায়।
-- যা বলচো ভেবে বলচো তো দাদা? পরে আমাদের দোষ দিয়ো না। -- বলে গুল্লু।
-- দুস্থদের কাপড় বা কম্বল বিলির আয়োজন করবি হাজার টাকাই দেবো, কিন্তু ক্লাবের নামে নেশা করবি তার জন্য এক পয়সাও আমি দেবো না।
মন্টা বলে বসে, তুমি তাহলে আমাদের সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছো?
-- হ্যাঁ পাঙ্গাই সই। কী করবি তোরা? টোন কাটবি আর ঘরে ঢিল মারবি তো? তাহলে তোদেরও জেল
খাটিয়ে ছাড়বো, এটা মনে রাখিস।
আস্তে আস্তে ওরা চলে যায়, চোখেমুখে রাগ নয়, যেন বিভ্রান্তি খেলা করে।
নিজের এই ভূমিকাকে বেশ উপভোগ করে গোপাল আর মনে মনে আবার বলে, হ্যাটস অফ
টু ইউ মানা!


(লেখক পরিচিতিঃ বিষ্ণুপুর শহরের গোপেশ্বর পল্লীর জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় মূলত কবি ও গল্পকার হিসেবে পরিচিত। অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক জয়ন্তর জন্ম ১৯৫৯ এর ২৫ জুলাই বাঁকুড়া জেলার কুশমুড়ি গ্রামে । কবিতা ও গল্প লেখার পাশাপাশি প্রবন্ধ, রম্যরচনা, নাটক, ফিচার প্রভৃতি লেখাতেও দক্ষতার ছাপ। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - "অভীষ্ট শব্দের উজানে",  "ত্রিভুজ সংক্রান্ত সমীকরণ" এবং অণুগল্প গ্রন্থ - "অণু অম্বুবান"। সম্পাদিত পত্রিকা : তন্বী, দোলা ও স্বচ্ছন্দ। শহর নগর ব্লগজিনের জন্য এই প্রথম কলম ধরেছেন। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।)

 

২টি মন্তব্য: