নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব : দশ () অতনু চট্টোপাধ্যায়

 

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ দশম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(১০)

আজ সকালে মনে মনে উচ্চারন করল সুখেন কবি রবীন্দ্রনাথের একটা গান। তার মনে হল, রবীন্দ্রনাথ যেন সমস্ত স্তরের মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতেন। গুন গুন করে গেয়ে উঠল সুখেন।

"বিপদে মোরে রক্ষা কর

এ নহে মোর প্রার্থনা

বিপদে আমি না যেন করি ভয়

দুঃখ তাপে ব্যথিত চিতে 

নাইবা দিলে সান্ত্বনা

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়

সহায় মোর না যদি জুটে

নিজের বল না যেন টুটে

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি

লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়

আমারে তুমি করিবে ত্রান

এ নহে মোর প্রার্থনা

তরিতে পারি শকতি যেন রয়

আমার ভার লাঘব করি

নাইবা দিলে সান্ত্বনা

বহিতে পারি এমনি যেন হয়

নম্র শিরে সুখের দিনে

তোমারি মুখ লইব চিনে

দুখের রাতে নিখিল ধরা

যেদিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।"

গানটা কবিতার মত করে বেশ কয়েকবার পড়ল সুখেন। মনের জোর বাড়ানোর এটা যেন এক মহৌষধ।

না, ভেঙে পড়লে চলবে না। নিজের জন্য না হলেও, বাকি রোগীদের জন্য তাকে কাজ করতে হবে। সমাজের কাছে কাজ ছিনিয়ে আনতে হবে। এটা যেন তার কর্তব্য বলে মনে হল।

আগেই ঠিক হয়েছিল, আজ প্রশাসনের কাছে দরবার করতে যাবে তারা। কাজের অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। মনে এক রাশ উদ্যম আর সাহস সঞ্চয় করে সুখেন চলল গৌরীপুর। আজ বদড়া আর গৌরীপুরের সব কুষ্ঠাক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটবে।হয়ত তাদের এই মিছিল দেখে সাধারন মানূষ নাক চাপা দিয়ে সমালোচনা করবে। কিন্তু ওদের তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে হবে।সুখেন এইসব চিন্তা করতে করতে এগিয়ে চলল। গৌরীপুরে পৌঁছে,  দেখল ওখানে অনেকেই উপস্থিত। তবে একটা জিনিস দেখে খুব ভালো লাগল। আর সেটা হল বেশ কয়েকটা ঝুপড়ির মত ঘর তৈরি হয়েছে। সেখানে লোকজন বাস করেছে। এইসব মানুষ কোন উদ্বাস্তু নয়, তারা এ মাটিরই সন্তান। সমাজ তাদের পৃথক করে মনুষ্যত্বের অপমান করে সমাজে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সুখেনের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। ওখানে পৌঁছে একদফা আলোচনা হল।গৌরীপুরের সাথে বদড়ার রোগমুক্তি ঘটা লোকেরাও জমা হবে।ঠিক হল, তাদের এই মিছিল যাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে। সুখেন বসে বসে কয়েকটা চিঠি লিখল। তারপর বেরিয়ে পড়ল গন্তব্যের দিকে। যাদের হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই, তারা কাঠের তৈরি ছোট গাড়িতে চড়ে রওনা দিল। মুখে কোন আওয়াজ নেই। প্রত্যেকের হাতে প্ল্যাকার্ড। নিঃশব্দে প্রতিবাদ চলল। দাবী একটাই -তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটা কথা, তাদের জন্য শিক্ষা, পানীয়জল, স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে।

জেলা শহরে যখন মিছিল উপস্থিত,তখন দুরে দাড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের টিপ্পনি আর ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। কোন কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ডিএম, মিউনিসিপ্যালটি সহ প্রশাসনের সমস্ত স্তরে দেওয়া হল চিঠি। আলোচনাও হল।আশ্বাসও দেওয়া হল। এরপর শুধু যোগাযোগ রাখতে হবে, কতটা আশ্বাস পৃরণ হল। ওরা সকলেই ধীরে ধীরে চলে এল। সুখেন আর গৌরীপুর গেল না। ফিরে এল তার জন্য বরাদ্দ কারাগারে।

সময় পেরিয়ে যায়, রোগীর সংখ্যা বাড়ে। সরকারী তরফে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুষ্ঠরোগী অনুসন্ধান করা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র আর রাজ্য স্তরে কুষ্ঠ নির্মূল করনের ডাক দেওয়া হয়েছে। যারা অনুসন্ধানে যাচ্ছে, তারাও যেমন ভয়ে ভীত নিজেদের নিয়ে, তেমনই যাদের বাড়িতে এই রোগ দেখা যাচ্ছে, সেটা গোপন করার এক প্রবনতা। পরিবারের ভয় যেন এটা লোক জানাজানি না হয়, তাহলে সমাজে তারা আপাংক্তেয় হয়ে উঠবে। বাড়ির মেয়েদের বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কথাটা যে একেবারে মিথ্যা নয়, সেটা সুখেন ভালোভাবে জানে।

অথচ এই রোগ পুষে রাখলে সমাজে অন্য কারো মধ্যে সংক্রমিত হবে। শিক্ষিত অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের মধ্যে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে আছে। এই ধারনার পরিবর্তন না ঘটালে তো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর হচ্ছেও। দু পাঁচজনের সাবধান বাণীতে কিছু হবে না, সেটা সুখেন জানে। কিন্তু তবুও কিছুটা প্রচারে মানুষের মনে একটা দোলা লাগছে। ঘোষিত হয়েছে "বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস"।গান্ধীজির মৃত্যুদিবস ৩০শে জানুয়ারী দিনটি পালন করা হয় বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। উদ্দেশ্য একটাই, বিশ্ব তথা ভারতবর্ষ থেকে কুষ্ঠ রোগকে নির্মূল করা। তবে যতটা ঢাকঢোল সহকারে এই দিবসটি পালন করা হয়, সেই অর্থে এর পেছনে যে উদ্দেশ্য থাকে, সেটি কি সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে। এখনও গ্রাম শহর সর্বত্র চিত্র একই-কুষ্ঠ রোগ দুরীকরন নয়, কুষ্ঠ রোগী থেকে দুরে থাকা। সুখেনের চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে যায় হঠাৎ। একটা কোকিল সমানে ডেকে চলেছে। তার মিষ্টি রবটাও যেন কর্কশ শোনাচ্ছে। 

চলবে 

এই সময়ের গল্পঃ ঘরোয়া গণতন্ত্র - বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

 ঘরোয়া গণতন্ত্র 

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

বাড়ির পরিবেশ গত তিনদিন ধরে এমন—মনে হচ্ছে যেন সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উঠেছে, আর সরকার টালমাটাল। কারণ একটাই—কাজের মেয়েটা আসছে না।

আমার স্ত্রী সকাল থেকে রাত অবধি এমনভাবে গজগজ করছে, যেন সে নিজেই একক বিরোধী দল।

 “এইভাবে সংসার চলে? লোকটা হাওয়া হয়ে গেল! আমার ঘুম উড়ে গেছে।”

 “আরে, একটা না একটা ব্যবস্থা তো হবেই,” আমি শান্ত গলায় বললাম, যেন অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করছেন।

সে চোখ কুঁচকে তাকাল— “তোমার মাথা খাটিয়ে কোনোদিন কিছু হয়েছে? তোমার বুদ্ধির উপর আমার কোনকালেই  ভরসা নেই।”

আমি একটু গম্ভীর হলাম। ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার নাকি অপমানের পরেই হয়। হঠাৎ যেন মাথায় বিদ্যুৎ চমকাল—  “ইউরেকা!”

স্ত্রী থমকে গেল— “এ আবার কী আজেবাজে বকছো ?”

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম— “এমন একটা বুদ্ধি এসেছে, এতে তোমার ভোট পর্যন্ত পেরিয়ে যাবে!”

 “ভোট আবার এলো কোথা থেকে?”

“শুনো না… এখন তো ভোটের বাজার। শুনছি যারা দাঁড়িয়েছে, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসন মাজছে, কাপড় কাচছে, এমনকি রুটি বেলেও দিচ্ছে। আমরা যদি একজনকে ডেকে নিই—এই ক’দিন তো দিব্যি কেটে যাবে!”

স্ত্রী প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর এমনভাবে তাকাল, যেন আমি সংবিধান বদলে ফেলেছি।- “তুমি সিরিয়াস?”

— “অবশ্যই! এটাকেই বলে গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রয়োগ —জনসেবার সরাসরি সুবিধা!”

সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল—  “ঠিক আছে, দেখি তোমার গণতন্ত্র কতদূর যায়।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা তুলে নিলাম। এলাকার এক পরিচিত ভোটপ্রার্থীর নম্বর ছিল—গত সপ্তাহেই লিফলেট দিয়ে গিয়েছিল।

— “হ্যালো দাদা, নমস্কার… হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বলছি… একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল…”

ওপাশ থেকে গলা এল— “বলুন, বলুন, মানুষের সেবার জন্যই তো আছি!”

আমি একটু কাশলাম— “আসলে আমাদের কাজের মেয়ে কয়েকদিন আসছে না… যদি একটু বাসন মাজা, কাপড় কাচা…”

ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দৃঢ় কণ্ঠ— “চিন্তা করবেন না! আমি এখনই আসছি। মানুষের পাশে আছি, থাকব।”

প্রায় আধঘণ্টার মধ্যে লোকটি হাজির। গলায় গামছা, হাতে হাসি, মুখে স্লোগান।

আমার স্ত্রী তখন রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, চোখে বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্রণ। “এই দিকটা একটু ভালো করে মাজবেন… হ্যাঁ, ওই হাঁড়িটা একটু কড়া কালো দাগটা জোরে ঘষতে হবে ।”

ভোটপ্রার্থী মাথা নেড়ে বললেন— “অবশ্যই, আপনাদের আশীর্বাদই আমার শক্তি।”

আমি পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি—গণতন্ত্র এতটা ঘরোয়া হতে পারে, আগে কে জানত!

সন্ধ্যার দিকে বাসনগুলো ঝকঝকে, কাপড়গুলো পরিষ্কার, আর আমার স্ত্রী মুখে একরাশ তৃপ্তির হাসি।

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “এই প্রথম তোমার মাথার বুদ্ধি কাজে লাগল।”

আমি মুচকি হেসে বললাম— “দেখলে তো, আমার মাথা ততটা  গোবর ভর্তি নয়, নেহাত পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না তাই।  নইলে কী যে হত বলা মুশকিল ।”

ভোটপ্রার্থী বিদায় নেওয়ার সময় বললেন— “দাদা, ভোটটা কিন্তু…”

আমি দ্রুত বললাম— আরও দু চারদিন আসুন কাজ দেখি।বাকিদেরও  কাজ দেখি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব কারা  বেশি পরিচ্ছন্ন প্রশাসন উপহার দিতে পারবে।

ছবিঃ ফেসবুক থেকে নেওয়া

সাংস্কৃতিক সংবাদঃ বিষ্ণুপুরে গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান

প্রকাশিত হলো 'নীল জঙ্গলের পদাবলি'

শহরনগর প্রতিবেদন, বিষ্ণুপুর (বাঁকুড়া): রবিবার মার্চের আট তারিখ দ্বারকেশ্বর নদের তীরে অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েত শিশু উদ্যানে আয়োজিত এক মনোজ্ঞ কবিসভায় প্রকাশিত হলো বিশিষ্ট কবি ও গল্পকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ  'নীল জঙ্গলের পদাবলি'। আগরতলা, ত্রিপুরার বজ্রকণ্ঠ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশক কবি রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ। শিশু উদ্যানের মনোরম পরিবেশে বিকেলের মেঘ, ছায়া ও আলোর ত্রিবেণীসংগমে বর্ষীয়ান কবি এবং ঘাসমাটি পত্রিকার সম্পাদক মুরলী দে কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন। সঙ্গে  ছিল স্পর্শ পত্রিকার কবিতার গাড়ি। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবি নবকুমার শীল, শীতল বিশ্বাস, অংশুমান কর্মকার, কবিতানুরাগী গোপালকৃষ্ণ ঘোষ এবং অজয় শীল।  উপস্থিত সবার হাতে একটি করে বই তুলে দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করেন কবি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।

গ্রন্থ প্রকাশের পর শুরু হয় কবিতা পাঠ ও কাব্য আলোচনা। উদ্বোধক কবি  মুরলী দে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কলেজ জীবনের স্মৃতি ও কাব্যকৃতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, জয়ন্তকে কবি বলে চিনতাম, কিন্তু সে যে মনেপ্রাণে কবিতা সাধক তা বুঝে উঠতে আমার সময় লেগেছে।

উপস্থিত সকলেই সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটি থেকে জয়ন্তবাবুর লেখা কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন এবং পঠিত কবিতার উপর তন্নিষ্ঠ আলোচনা চলে। কবিতায় মুখরিত এই সন্ধ্যায় উদ্যানে আগত দর্শকেরাও কৌতূহলী শ্রোতা হয়ে ওঠেন।

নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব নয় () অতনু চট্টোপাধ্যায়

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ নবম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(৯)

সারাটা দিন শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে বিকেল বেলায় উঠে একবার নদীর তীরে গেল। তার মনের কথা বলবার জন্য আর শোনাবার জন্য নদীই তার একমাত্র সাহারা। দাদাদের সাথে ধীরে ধীরে কিছুটা হলেও দূরত্ব কমে আসছিল। কিন্তু এই ঘটনাতে তাকেই দায়ী করা হবে, এটা বুঝেছিল সুখেন। কাছাকাছি আসার সেতুটা আবার ভেঙে পড়ল। তবে সব থেকে পীড়া দিচ্ছিল খুকীর ব্যপারটা। নাই বা তার সাথে সখ্যতা এখন, একটা সময়ে তো ঐ ভাইঝি তার প্রানাধিক প্রিয় ছিল। সে কি করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। সৃর্যাস্ত যাবার আগেই সে উঠে পড়ল। অন্য পাঁচটা দিন যেমন সে তার এই নিঃস্ব মনেও, প্রকৃতির সুধা নিয়ে সাময়িক স্বস্তি পেত, আজ পেল না।

ফিরে এসে খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখল, ওটা ঢাকা দেওয়াই পড়ে আছে। খাবার দেখেও খাবারে কোন রুচি এল না। নিজের অজান্তেই একটা পেন আর খাতা নিয়ে লিখতে বসল সে। কি লিখবে, প্রথমে কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারছিল না। শরীর ঠিক থাকলেও, মনটা যে ভেঙে টূকরো টুকরো হয়ে গেছে। কি সান্ত্বনা দেবে সে খুকীকে। তবুও একটা চিঠি সে লিখল।

স্নেহের খুকী,

আজ আমার জন্যেই তোর স্বপ্ন আর আকাংখা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। কিন্তু মা, এই ঘটনার জন্য আমার নিজের হাতে কিছুই নেই। তবুও তোর কপালে শাস্তির খাড়া নেমে এল। জানিনা, তোকে আমি কিভাবে সান্ত্বনা দেবো।

প্রথমেই তোকে জানাই, যে এই ঘটনাটাকে মন থেকে মুছে ফেল মা।জীবনটা অনেক অনেক বড়। আর জীবনে ঘাত প্রতিঘাত থাকবেই।এই ঘাত প্রতিঘাতের আবহেই মানুষকে পথ চলতে হয়। তোর কাছে বলতে লজ্জা নেই যে, আমিও একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম-নাম ছিল সুতপা। আমার এই রোগের কারনেই সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। তুই মা তোর মনটাকে শক্ত কর। তুই তো পড়াশোনাতে বেশ ভালো। তুই চাকরির জন্য পরিশ্রম কর। একটা নতুন জীবন পাবি। তারপর তোর পছন্দমত একটা জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবি। কাজটা শক্ত হলেও, অসম্ভব নয়। তুই আমাকে ক্ষমা কর।আমার কথাটা একটু ভেবে দেখ। হয়ত এটাই তোর জীবনে বিশল্যকরণী হিসাবে দেখা দেবে। কথা দে মা, তুই করবি। আমার অনেক স্নেহ আর ভালোবাসা নিবি।

ইতি

আশীর্বাদক

তোর অভাগা ছোটকাকা।

চিঠিটা লিখে মুড়ে রাখল। তারপর রাখালদার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রাখালদা অন্যদিনের তুলনায় একটু দেরি করে এল। তার মুখেও দেখল যন্ত্রনার একটা ছাপ। খাবার রাখতে যাওয়ার সময় দেখল, দুপুরের খাবার যেমন ছিল, তেমনই আছে। কিছু বলল না।সেও বুঝল তার মনের যন্ত্রনাটা। দুপুরের খাবারটা বাইরে ফেলে দিয়ে, ওর আনা খাবারটা রেখে দিল। তারপর ও যখন চলে যাচ্ছে, তখন চিঠিটা রাখালদার হাতে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলল- "রাখাল দা, এটা খুকী মায়ের হাতে দিবি। রাখালদা চলে গেল। শুধু তার পায়ের শব্দ শুনতে পেল।

সুখেনের বেশ মনে পড়ে তার গৌরীপুর যাওয়ার কথা, তার রোগ পরীক্ষার কথা। গ্রামের ডাক্তার কাকা প্রথম দিন দেখেই কেমন উৎকন্ঠা নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। সুখেন জিজ্ঞেস করেছিল-"ডাক্তার কাকা, আপনি কি অন্য কিছু ভাবছেন? কিছু হয়েছে নাকি আমার?"

- "না,আমি এখনও স্থির সিদ্ধান্তে আসছি না। তবে এটা একবার গৌরীপুরে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আয়। আমি হয়ত অন্য চিন্তা করছি।"

- "গৌরীপুর?" গলা দিয়ে সঠিক স্বর বের হচ্ছিল না।" এটা তাহলে কি দাদ নয়?"

- "দেখ একবার যখন সন্দেহ লাগছে, তখন পরীক্ষা করিয়ে আয়। দেরি করিস না। কালকেই যা।"

গ্রামের ডাক্তার কাকা বেশ অভিজ্ঞ একজন চিকিৎসক। তার চিকিৎসা অনেকাংশেই নির্ভুল। এমবিএস করা ডাক্তার। গ্রামেই থেকে গেছেন তিনি। টাকার প্রলোভনে বাইরে পা রাখেননি। উনি একথা বলার পর, সুখেন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। গৌরীপুর মানেই তো কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা। বাড়িতে এই ব্যাপারে কিছুই বলল না সুখেন। পরের দিন  'বাইরে যাচ্ছি" বলে উপস্থিত হল গৌরীপুরে।আউটডোরে নাম লেখানোর পর, ডাক পড়ল সুখেনের। দুরু দুরু বুকে হাজির হল সে। তার কানের লতির কাছে একটা ছোট রিঙের মত অংশ। লালাভো রঙ। ডাক্তারবাবু ঐ ছোট অংশটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন- "আপনার পরিবারের কারো কি এই রোগ ছিল?"

- "না"।

- "তাহলে কি আপনার পরিচিত কারো এই রোগ ছিল, যেটা আপনি না বূঝেই তার সাথে মেলামেশা করেছেন?"

- ",সেটা তো ঠিক বলতে পারব না।"

 "হু" বলে ডাক্তার বাবু একটা তুলো নিলেন হাতে। তারপর একটা পিন নিয়ে ঐ গোলাকার অংশে পিনটা ফোটাতে থাকলেন। আর জিজ্ঞেস করলেন- "কোন যন্ত্রনা হচ্ছে? কিছু অনুভব করতে পারছেন?"

- "না তো।"

ডাক্তারের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল। একটা পেন্সিল নিয়ে হাতের আঙুলগুলোতে ফোটাতে লাগলেন। সুখেনের তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে,সে কুষ্ঠে আক্রান্ত। সুখেনের মাথা ঘুরতে লাগল।হঠাৎ সে চেয়ার থেকে নিচে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সে দেখল একটা বেডে শুয়ে আছে।ডাক্তারবাবু তার কাছে এসে হেসে জিজ্ঞেস করলেন- "এত ভীতু আপনি? এত ভয় পাওয়ার কি আছে? এটাতো আর পাঁচটা রোগের মত একটা রোগ। আপনার একেবারেই প্রাথমিক স্টেজ। ভালো হয়ে যাবেন তাড়াতাড়ি।"

- "আমার কি তাহলে সত্যিই কুষ্ঠ হয়েছে?"

- "হ্যা। আচ্ছা বলুন তো, আপনার বাড়ি কোথায় আর বাড়িতে কে কে আছেন?"

- "কেন"

- "আপনি আর বাড়ি যেতে পারবেন না। আপনাকে এখানেই থাকতে হবে আজ থেকে। আর চিকিৎসাও শুরু হবে। আর একটা কথা আপনার কেসটা কি ধরনের তার পরীক্ষা চলছে। বিকেলেই খবর পাবেন।"

সুখেন একটা পেন আর কাগজ নিয়ে সবকিছু লিখে দিল। বিকেলেই ফিরে এল সেই লোক। কেউ আসেনি তার কাছে। আবার বিকেলেই ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, "আপনার যে রোগটা হয়েছে, সেটা ছোঁয়াচে নয়। আপনি সুস্থ হলেই আবার বাড়ি ফিরতে পারবেন। তবে এখানে ছমাস থাকতে হবে। সুখেন আর কোন কথা বলে না। নীরবে কেঁদে চলতে লাগল।

চলবে

 

(অনিবার্য কারণে সোমবারের পর্বটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য আমরা দুঃখিত। সেটি আজ প্রকাশ করা হলো। )


সাংস্কৃতিক সংবাদঃ কবিতা কুটিরের আয়োজনে কবিতা পাঠ

 বাঁকুড়ায় বিশ্ব কবিতা দিবস

শহর নগর প্রতিবেদন বাঁকুড়াঃ  বিশ্ব কবিতা দিবস উপলক্ষে কবিতা কুটিরের আয়োজনে পালিত হলো বিশ্ব কবিতা দিবস। শনিবার বিকেলে স্থানীয় বঙ্গ বিদ্যালয়ে এই অনুষ্ঠানে শতাধিক কবি, বাচিক শিল্পী ও কবিতাপ্রেমী অংশ নেন। উৎসবের শুরুতেই  এই আয়োজনের অন্যতম সংগঠক কবি ভজন দত্তের আকস্মিক

অসুস্থতার সংবাদে আগত সকলেই বিচলিত হয়ে পড়েন। কবির দ্রুত সুস্থতা কামনা করে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে কপালে আবিরের ফোঁটা দিয়ে ও কবিতা দিবসের ব্যাজ পরিয়ে বরণ করেন উদ্যোক্তারা। 

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রবীণ এবং নবীন কবি ও বাচিক শিল্পীদের সামগ্রিক উপস্থাপনায় একটি মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কবিতা পাঠের পর প্রত্যেক কবি ও শিল্পীদের একটি করে চারা গাছ ও কবি ভজন দত্তের একটি কাব্যগ্রন্থ স্মারক হিসেবে উপহার দেওয়া হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সামগ্রিক পরিচালনায় ছিলেন কবি শান্তনু পাত্র, মিলন রায় ও বাচিক শিল্পী স্নেহাশিস রায় এবং কবিতা কুটিরের সদস্যবৃন্দ। পরিশেষে কবিতা কুটিরের কর্ণধার শ্যামলী দাস উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান।



ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৩১ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

   অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।  প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ  একত্রিশ  পর্ব - সম্পাদক ।) 

মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল 

১৯০৪ সালের ঘটনা। ক্ষুদিরামের জামাইবাবু অমৃতলালের বদলির  চাকরি। অগত্যা তমলুক থেকে ক্ষুদিরাম সহ সপরিবারে এলেন মেদিনীপুরে। অমৃতলাল ছেলে ললিতমোহন এবং ক্ষুদিরামকে মেদিনীপুরের গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলে ফোর্থ স্ট্যান্ডার্ড বা চতুর্থ শ্রেণীতে (বর্তমান সপ্তম শ্রেণী তুল্য) ভর্তি করে দেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ঋষি রাজনারায়ণ বসু। এই বিখ্যাত ও সারস্বত, স্বাধীনতাকামী "বসু পরিবার" ই অরবিন্দ, বারীন্দ্রের মামাবাড়ি। রাজনারায়ণ বসুর ভাই অভয়চরণের ছেলে হলেন অগ্নিযুগের দুই সন্তান জ্ঞানেন্দ্রনাথ এবং সত্যেন্দ্রনাথ। বাবার মতই জ্ঞানেন্দ্রনাথও কলেজিয়েট স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। তিনি ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে পরোক্ষে স্বদেশীয়ানার আশ্রয় নিতেন। বিশ্বের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ছাত্রদের পড়াতেন তিনি। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে গণচেতনা ও দেশপ্রেমের জ্ঞানের আলো জ্বেলে দিয়েছেন শিক্ষক জ্ঞানেন্দ্রনাথ। এই স্কুলের চৌহদ্দিতে ক্ষুদিরাম পেলেন সশস্ত্র সংগ্রামের নিখাদ পঠনপাঠন। স্কুলের মধ্যেই ছিল শরীরচর্চার আলাদা ও বিশেষ ( ব্যায়ামাগার ) ব্যবস্থা। ক্ষুদিরামের দেহে মনে এক লহমায় খেলে গেল খুশির ঝিলিক। আরও সুখের কথা হল এই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন ক্ষুদিরামের জামাইবাবু অমৃতলাল । তিনি ছিলেন শিক্ষক অভয়চরণের প্রিয় ছাত্র। আবার সশস্ত্র বিপ্লবের আগুনে হাত সেঁকতে ক্ষুদিরামকে পথ দেখিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও হেমচন্দ্র কানুনগো। 

ঋষি রাজনারায়ণ বসু 
ক্ষুদিরামের বাল্য ও কৈশোরকাল ছিল দুঃখের চাদরে মোড়া। ছোটবেলাতেই মা বাবা, দুই দিদির অকাল মৃত্যুতে দিশেহারা ক্ষুদিরাম। মায়ের অপার স্নেহ কি জিনিষ সেটা পেয়েছিলেন বড়দিদি অপরূপার কাছ থেকে। দিদি জামাইবাবু তাকে নিজের সন্তান ললিত মোহনের মতোই আদরে আবদারে বড় করে তুলছেন। তিন মুঠো খুদ্ চাল দিয়ে নিজের ভাইকে কিনে সন্তানের মর্যাদায় প্রতিপালিত করেছেন। ক্ষুদিরামও দোসর হিসেবে পেয়েছেন ভাগ্নে ললিত মোহনকে। দু'এক বছর বয়সের তফাৎ মামা ভাগ্নের। সমস্ত রকম ভালো মন্দ কাজ কর্মের সাক্ষী এই ললিত মোহন। ছোটবেলার দস্যিপনা থেকে সমাজসেবা, দেহ চর্চা, লাঠি, ছুরি খেলা,কলেরা বসন্তের মতো মহামারী এমনকি কংসাবতীর ভয়াবহ বন্যায় আর্ত পীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো ক্ষুদিরামের স্বভাব হয়ে উঠেছিল । আরও দুটো গুণের কথা বলতেই হয় ডাকাবুকো ক্ষুদিরাম সম্পর্কে। বিষধর সাপ ধরার পাশাপাশি ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। কখনো মেঠোসুরে বাঁশিতে তুলতেন- "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি" কিম্বা বিদ্রোহের গান থেকে শ্যামা সঙ্গীতের সুরে মোহিত করে তুলতেন আপামর মানুষকে। মাতৃসমা বড়দিদি অপরূপার মনে শুধু ভয় - শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরীর মায়ের আশীর্বাদ ধন্য তার ক্ষুদিরাম যেন বেপরোয়া কিম্বা বোহেমিয়ান না হয়ে যায়। নিজের সন্তান ললিত মোহনকে সদা সর্বদা ক্ষুদিরামের সঙ্গে লেপ্টে থাকার নিদান দিতেন অপরূপা। একটি সৌখিন শখ ছিল বালক ক্ষুদিরামের। সেটা হলো - ডিটেক্টিভ বই পড়া। এই বিষয়টিকে তিনি নেশায় পরিনত করেছিলেন। তখনকার দিনে অসম্ভব জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্প লেখক হলেন-পাঁচকড়ি দে। গোয়েন্দা গিরির জন্য প্রখর বুদ্ধি, অদম্য সাহস আর সুদৃঢ় মনোবল ক্ষুদিরামকে চমৎকৃত করে তুলতো। ভাবনার গভীরে ডুবে থাকতেন তিনি। আগামীর রূপরেখা রচনার জন্য অনুপ্রাণিত হতেন। বড়দিদি অপরূপা লিখছেন তাঁর এই গুণধর ভাই সম্পর্কে - "খুব দুরন্ত, লেখাপড়ায় মন‌ নেই, শুধু খেলা আর খেলা। আবার যেদিন পড়ার ইচ্ছা হতো, সেদিন যেন তপস্যায় বসতো। মাস্টার আশু রায়ের যত কিছু শাস্তি ছিল, তার সবই হার মেনেছিল ক্ষুদিরামের একগুঁয়েমির কাছে।" এই ভাবেই স্বদেশীয়ানার বোধ জাগলো ক্ষুদিরামের।  মোহবনি কিম্বা হবিবপুর মহল্লা থেকে এলেন দাসপুর থানার হাটগাছিয়া (হাটগেছ্যা) গ্ৰামে। দিদির বাড়িতে খাওয়া পরার পাশাপাশি শিক্ষালাভের জন্য এখানকার গিরীশ মূখার্জীর পাঠশালায় ক্ষুদিরামকে ভর্তি করে দেন অমৃতলাল বাবু। ক্ষুদিরাম তখন ছয় সাত বছরের বালক। এই বয়স সন্ধিকালে ক্ষুদিরাম প্রতারিত হয়েছিলেন পৈত্রিক বিষয় আশয় থেকে। পৈত্রিক সম্পত্তি এবং বাবার কাছে গচ্ছিত থাকা নাড়াজোল জমিদারির মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় বাবারই ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়। দেনার দায়ে পিতৃসম্পত্তি বিক্রি হয়ে যায়। প্রথম প্রথম সদ্য মা বাবা হারানো অসহায় ক্ষুদিরাম আশ্রয় পেয়েছিলেন সুহৃদ প্রতিবেশী অবিনাশ চন্দ্র বসুর বাড়িতে। কিছুদিন পর ভাইয়ের অসহায়তার খবর পেয়ে অপরূপা নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তীব্র সঙ্কট আর অস্তিত্বের লড়াইয়ে ক্ষুদিরাম ঠাঁই পেলেন দিদি জামাইবাবুর সংসারে। এই ভাবে তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ক্ষুদিরাম বড় হয়ে উঠছিলেন। একই সঙ্গে দুরন্তপনা ও দুষ্টুমিরও খবর মিলছিল অনায়াসেই । 

কিছুদিন পর আবার বাসা বদল ঘটল তমলুকে। অমৃতলাল বাবুর ছিল বদলির চাকরি। সপরিবারে উঠে এলেন তমলুকে। এখানকার একটি প্রাথমিক স্কুলে ক্ষুদিরামকে ভর্তি করা হয়। চতুর্থ শ্রেণীতে হ্যামিল্টন স্কুলে ক্ষুদিরাম ও ললিতমোহনের শিক্ষাক্রম শুরু হয়। এখানে পড়াকালীন ক্ষুদিরাম হয়ে উঠলেন এক দূরন্ত, দুর্দমনীয় বালক। লেখাপড়ার জায়গায় প্রাধান্য পেল খেলাধূলা ব্যায়াম আর শরীরচর্চা। তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলো দূরন্তপনা আর দস্যিগিরি। একই সঙ্গে সঙ্গে চলল কলেরা মহামারীতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা শুশ্রুষার কাজ। আবার মৃতদেহ উদ্ধার করে শ্মশানে দাহ করার কাজে ক্ষুদিরাম হয়ে উঠলেন সিদ্ধহস্ত। এমন গুণপণার পাশাপাশি বিষধর সাপ ধরে মাথার উপর ঘোরানো, বাজি ধরে গভীর রাতে মহাশ্মশানে ভ্রমণ ছিল ক্ষুদিরামের কাছে জলভাত। ভালো কাজেও  বেনজির দৃষ্টান্ত রেখেছেন অকুতোভয় ক্ষুদিরাম। এখানে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট উদাহরণ দিলেই চেনা যাবে শৈশবের দেশপ্রেমী ক্ষুদিরামকে। 

চলবে 

বিশ্ব কবিতা দিবসের কবিতাঃ বিপ্রতীপ সময়ের কবিতা - সন্তোষ ভট্টাচার্য

বিপ্রতীপ সময়ের কবিতা 

সন্তোষ ভট্টাচার্য 

ফেসবুক এখন কবিতায় কবিতাময় 

কেউ কবিতায় প্রেম নিবেদন করে 

আবার কেউ ছড়ায় হিংসা

দুর্নীতি, বালি পাথর কয়লা 

গরু পাচার চাকরি চুরি

এ নিয়েও কবিতা লেখা হয় ভুরি ভুরি 

কমেন্টে কমেন্টে দেশ উদ্ধারের 

প্রতিযোগিতায় নষ্ট মানসিকতা 

কমেন্ট লোভে হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত কবি

লিঙ্ক পাঠায় জনে জনে কমেন্ট ভিক্ষা চেয়ে

প্রিয় এক কবি লিখেছিলেন -

'বসন্তে যদি শুকলো ফুল মলো কোকিল 

তবে বলো এ বসন্তের কী দরকার'।

আজও পলাশের আগুন মাখা দিনে

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বারুদের পোড়া গন্ধ 

শিশু নিধন আর আর্তনাদ শুনেও   

পলাশ পরবে মেতে থাকি যদি 

মানুষের কবিতা হয় না লেখা 

ফেসবুকের ওয়ালে জুড়ে ধরা পড়ে 

বরিষ্ঠ কবিদের অসহিষ্ণু কলুষিত যাপন চিত্র ।

আজ এই বিপ্রতীপ সময়ে

বিশ্ব কবিতা দিবসে চারণকবির  

সেই উদাত্ত আহ্বান শুনি 

'এসো ঐক্য এসো প্রেম মৈত্রী ভালোবাসা 

তুমি ছাড়া বড় শূন্য আমাদের ঘর।' 


আজকের কবিতাঃ কবিতা দিবস - শীতল বিশ্বাস

কবিতা দিবস          

শীতল বিশ্বাস

গাইছে সকাল মেঘমল্লার আকাশের মুখ ভার

প্রকৃতির ডানা ভিজে শপশপ কেঁদে কেটে একাকার

ভিজেছে আকাশ ভিজেছে বাতাস ভেজা ভেজা সব মন

আজকের দিনে স্বপ্ন আখরে দৃষ্টি ভাসে আনমন

ভেজে গন্ধেশ্বরী-দারকেশ্বর ভেজে পথ প্রান্তর

ভেজা মন গুলি আজ মৌসুমী সব প্রেমে বিভোর

আজকের দিনে সিক্ত বাতাসে উড়ে আসে পদাবলী

স্নিগ্ধ বাতাস খুঁজে খুঁজে মরে সূর্যের নামাবলী

আজকে সবার পুলকিত মন বিশ্ব কবিতা দিবস

শুশুনিয়া-কোড়ো নিজ মনে হাসে আর হাসেন চন্ডীদাস

নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব আট () অতনু চট্টোপাধ্যায়

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ অষ্টম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(৮)

সময় চলে যায়, সকালে সূর্য ওঠে আর সূর্যাস্তের সাথে সাথে নেমে আসে রাত্রি। মানুষজন রাতে স্বপ্ন দেখে, অপেক্ষা করে নতুন সূর্যের।তাদের আশা আকাংখা, প্রত্যাশা পূরণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। মানুষের জীবনে আলো-আঁধারের তফাৎ রয়েছে। কিন্তু তাদের জীবনে? না সেখানে কোন আলো নেই, নেই কোন স্বপ্ন-শুধুই মৃত্যুর দিন গোনা। শুধুই উপেক্ষা আর অসম্মান।

সুখেন বিছানা ছেড়ে উঠে। সব সময় একটা অস্থিরতা কাজ করে চলেছে। কাল খবর পেয়েছে দুজন নারী পুরুষ গৌরীপুর থেকে রোগমুক্তির পর বাড়ি থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হাসপাতালে ফিরে এসেছে। না, পাঁচশো বেডের হাসপাতালে আর ভর্তির জন্য নয়, তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। তারা দুজনেই হাসপাতালের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নেই কোন সম্পদ আর নেই কোন পেশা। তাদের দুজনের কারো কুষ্ঠ রোগে দেহ বিকৃতি ঘটেনি। তাদের মধ্যে নেই কোন জাতপাত। তাদের একজনের পদবী মাহাতো আর অন্য জনের পদবী চক্রবর্তী। তাদের এই অসম জাতের বিয়ে চলমান সমাজ মেনে নেবে না। কিন্তু তাদের এই বিয়েতে বাধা দেবার কেউ নেই। কিন্তু কিভাবে হবে বিয়ে? কিভাবে সংসার চালাবে? থাকবে কোথায়? অনেক অনেক প্রশ্ন।ডাক্তারবাবুর পা ধরে ওদের আকুতি। অনেক রোগী জমা হয়ে যায়।চলে আলোচনা। ওরা কোন স্টাফ নয় যে ওদের কোয়ার্টার মিলবে।কিন্তু তাহলে সমাধান কি করে সম্ভব? সারাদিন আলাপ আলোচনা করার পরে, ওদের দুজনের অস্থায়ী কাজ মিলে যায়। একজন কেন্দ্রের চিকিৎসালয়ে আর অন্যজন রাজ্যের হাসপাতালে। একটা খালি কোয়ার্টারে আপাততঃ ওদের থাকার ব্যবস্থাও হল। পরে ওরা হাসপাতালের পাশের জমিতে থাকার জন্য কাঁচা বাড়ি তৈরি করে নেবে। নাই বা থাকল তাদের মালিকানা? কেউ বাধা দিতে গেলে, একযোগে বাধা দেওয়া হবে।

সুখেন কাল খবরটা পেয়েছে। আজ থাকতে বলেছে ওকে গৌরীপুরে। ওদের দুজনার নতুন পথ চলার সাক্ষী থাকতে হবে।এখনও নাকি পুরোহিত কিংবা বিয়ের কোন কেনাকাটা হয়নি। কোন লগ্নের প্রয়োজন পড়ে না। সবকিছু ঠিক হলে, আজকেই বিয়ে হবে ওদের।

সুখেনদের প্রায়শই আড্ডা বসে। এতে ওরা ছাড়াও যোগ দেয় ডাক্তার বাবুরা। এখানে আসার আগে ডাক্তার বাবুদেরও একটা কিন্তু কিন্তু ভাব থাকে। যেহেতু স্বামী কুষ্ঠ হাসপাতালে কাজ করে, তাই বাড়ির গৃহিনীরাও অশান্তি ভোগ করে। লোকজন মেলামেশা করলেও থাকে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব। আর তাই ডাক্তার বাবুদের অশান্তি নেহাত কম ছিল না। তবে তাদের অধিকাংশেরই মেলামেশা ও পরামর্শ সুখেনদের বেশ ভালো লাগত। একদিন গল্পচ্ছলে একটা মজার অথচ বেদনাদায়ক ঘটনা শোনালেন এক ডাক্তারবাবু। তিনি সদ্য এমবিবিএস পাশ করেছেন। বাঁকুড়াতে বাড়ি। বাড়ির থেকেই যাতায়াত করেন বাসে। একদিন বাসে উঠে, একটা সিটে বসেছেন তিনি। কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে এলে, তাকে ভাড়া মিটিয়ে দেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল- "আপনি কোথায় নামবেন?"

"আমি গৌরীপুর যাব বলতেই কন্ডাক্টর সঠিক ভাড়া নিয়ে আমায় টিকিট আর বাকি পয়সা ফিরিয়ে দিল। আর আমাকে দেখে বাসে পাশাপাশি বসে থাকা লোকজন নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাউয়ি করতে লাগল। কথাটা শুনে ওদের মনে হল, আমি একটা অন্য জগতের লোক, যার মধ্যে কুষ্ঠ রোগের বাক্স রয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক আর আশ্চর্যের বিষয় হল, আমার পাশে বসা ভদ্রলোক আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেল। দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু  কেউ সিটে বসতে এল না। আমি নেমে যাওয়ার পর বাসের সহযাত্রীরা কি করেছিল জানা নেই।"

এই ঘটনাটা ডাক্তারবাবুর মুখ থেকে শুনে একটা ধারনা হয়ে গিয়েছিল যে, বিয়ে বাড়ির কাজ করার জন্য কোন পুরোহিত পাওয়া যাবে না। সুখেন যখন ওখানে পৌঁছালো, তখন বিয়ে বাড়ির জন্য কেনাকাটা করা হলেও, নাপিত আর পুরোহিতের কোন খোঁজখবর নেই। বিয়ে হবে হিন্দু মতে। পুরোহিত দরকার। অবশেষে স্বস্তি মিলল। এক ব্রাহ্মন কর্মচারীকে আর একজন নাপিতকে রাজী করানো হল। তারা এখানেই চাকরি করে। তবে দুজনাই এখানের রোগী ছিল একদা। তাদেরকে রাজী করিয়ে বেশ আনন্দের সাথে বিয়ে সম্পন্ন হল। সেদিন সুখেন বেশ রাত করে ওর আস্তানাতে ফিরে এসেছিল একরাশ আনন্দ নিয়ে।

এমন একটা দিন নাই যে, সুখেন নিজের কারাগার থেকে অন্যত্র থেকেছে। যত রাতই হোক, সে ফিরে এসেছে। তবে তাকে এখন দু জায়গাতেই পালা করে যেতে হয়। একটাই চিন্তা, কি করে পুনর্বাসন করা যাবে? এছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে চিন্তা মাথায় ঘোরাঘুরি করে। যদি সত্যিই এদের কেন্দ্রীভূত অবস্থায় পুনর্বাসন করা হয়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় বিবিধ জিনিসের ব্যবস্থা করতে হবে। ধরে নিতে হবে বাইরের কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না।এখন এইসব চিন্তা করেই সময় পেরিয়ে যায়।

আজ কদিন শরীরের বেশ কিছু ধকল হয়েছে। শরীরটা বেশ ভালো নয়, তাই আজ কোথাও বের হবে না সুখেন। বাড়িতেই কাটাবে।হঠাৎ একটা খবরে মনটা খারাপ হয়ে গেল সুখেনের। খবর পেল যে, বড়দার বড় মেয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে গেছে। রাখালদা সকালে এসে এই খবরটা দিল। রাখালদা আসতেই বলল- "জানো তো ছোট কর্তা, বড় কর্তার মেয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে গেছে?"

- "সে কিরে? খুকীর বিয়ের তো সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এই ফাল্গুনেই বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল।"

- "হ্যাঁ, সব তো ঠিকই ছিল। কিন্তু গতকাল একটা চিঠি এসেছে বড়দার নামে। লিখেছে, এই বিয়ে বাড়িটা হচ্ছে না।"

- "কোন কারন লেখেনি?"

- "না, তবে বড়দা আর মেজদা কাল ওদের বাড়িতে গিয়েছিল।ওদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে, বাড়িতে কুষ্ঠ রোগী আছে, তাই ঐ পরিবারে বিয়ে দিতে পারবে না।"

- "ওরা কিছু বলে নি?"

- "হ্যাঁ, ওদের হাতে পায়ে ধরে মিনতি করেছিল। বলেছিল আমার ছোট ভাই তো পরিবারের সাথে থাকে না, তাহলে কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? তা ছাড়া আমার ভাই তো বহুদিন যাবৎ সুস্থ হয়ে বাস করছে অন্যত্র।"

- "ওরা তার উত্তরে কিছু বলেনি?"

- "ওরা কোন কথাই শোনেনি। কাল ওরা ফিরে আসার পর বাড়িতে সকলেই চুপচাপ হয়ে গেছে। খুকী দিদিমনি তো ঘরে খিল দিয়ে বসে আছে।"

সুখেন আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। তার মুখটা শ্রাবনের মেঘের মত কালো হয়ে উঠল। তারজন্য খুকীর বিয়ে হল না? নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে। মনটা বিদ্রোহ করে উঠে। মনে হচ্ছিল যে, এই সমাজটাকে ভেঙে চুরে ফেলতে। এটাই কি সুস্থ আধুনিক সমাজ? মানুষ কি কোনদিন নিজেদের পরিবর্তন করবে না? তার এই রোগের জন্য একটা নতুন সংসার গড়ে উঠল না। সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারল না। চুপচাপ বসে থেকে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। কার পাপে এই পরিস্থিতি? এই প্রশ্নের কোন উত্তর সে পেল না। সারাদিন সে শুয়েই থাকল। স্নান খাওয়া পর্যন্ত করতে পারল না।

চলবে 

সাংস্কৃতিক সংবাদঃ "আমরা সবাই একসাথে"

 ষোড়শ সম্মেলনে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা 

শহর নগর প্রতিবেদন বাঁকুড়াঃ গত ১৫ মার্চ শহরের চাঁদমারিডাঙ্গায় একটি বেসরকারি ভবণে লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি কর্মীদের সংগঠন "আমরা সবাই একসাথে বাঁকুড়ার" ষোড়শ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্য বনপাল ডঃ সুধীর চন্দ্র দাস সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এবারের সম্মেলনে "মানসিক স্বাস্থ্য" নিয়ে আগামীদিনে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে এদিন "মানসিক স্বাস্থ্য" বিষয়ে ডঃ সমীর কুমার মুখার্জীর লেখা একটি ফোল্ডার উদ্বোধন করেন বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগের চিকিৎসক ডাঃ অরিত্র চক্রবর্ত্তী। ডাঃ অরিত্র চক্রবর্ত্তী ছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে অত্যন্ত মুল্যবান আলোচনা করেন বাঁকুড়ার জনপ্রিয় চিকিৎসক ডাঃ অমিতাভ চট্টরাজ ( তুফানদা), ডাঃ পার্থপ্রতিম মন্ডল, বাঁকুড়া সারদামনি মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডঃ সিদ্ধার্থ গুপ্ত, অধ্যাপক ডঃ সুবিকাশ চৌধুরী, প্রনতি সেনগুপ্ত সহ অন্যান্য বিশিষ্টজন। সম্মেলন উপলক্ষে একটি স্মরনিকা প্রকাশিত  হয়, যার মোড়ক উন্মোচন করেন বিশিষ্ট শিল্পী ও প্রাক্তন বিধায়ক শম্পা দরিপা। সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ গৌতম বুদ্ধ সুরাল। 

বিষ্ণু বাজোরিয়াকে সভাপতি ও সমীরণ সেনগুপ্তকে সাধারণ সম্পাদক করে আগামী আগামী দুবছরের কার্যকালের জন্য একটি শক্তিশালী কর্মসমিতি নির্বাচিত হয়।