নবপল্লীর মানুষেরা - পর্ব আট () অতনু চট্টোপাধ্যায়

নবপল্লীর মানুষেরা

(পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন কালকুট তাঁর 'শাম্ব' উপন্যাসে।  কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে।  এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। এরকমই এক পটভূমিতে 'শহর নগর' ব্লগজিনে শুরু হয়েছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অনুগ্রহ করে প্রতি সোম ও শুক্রবার চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। আজ অষ্টম পর্ব - সম্পাদক) 

 অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(৮)

সময় চলে যায়, সকালে সূর্য ওঠে আর সূর্যাস্তের সাথে সাথে নেমে আসে রাত্রি। মানুষজন রাতে স্বপ্ন দেখে, অপেক্ষা করে নতুন সূর্যের।তাদের আশা আকাংখা, প্রত্যাশা পূরণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। মানুষের জীবনে আলো-আঁধারের তফাৎ রয়েছে। কিন্তু তাদের জীবনে? না সেখানে কোন আলো নেই, নেই কোন স্বপ্ন-শুধুই মৃত্যুর দিন গোনা। শুধুই উপেক্ষা আর অসম্মান।

সুখেন বিছানা ছেড়ে উঠে। সব সময় একটা অস্থিরতা কাজ করে চলেছে। কাল খবর পেয়েছে দুজন নারী পুরুষ গৌরীপুর থেকে রোগমুক্তির পর বাড়ি থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হাসপাতালে ফিরে এসেছে। না, পাঁচশো বেডের হাসপাতালে আর ভর্তির জন্য নয়, তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। তারা দুজনেই হাসপাতালের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নেই কোন সম্পদ আর নেই কোন পেশা। তাদের দুজনের কারো কুষ্ঠ রোগে দেহ বিকৃতি ঘটেনি। তাদের মধ্যে নেই কোন জাতপাত। তাদের একজনের পদবী মাহাতো আর অন্য জনের পদবী চক্রবর্তী। তাদের এই অসম জাতের বিয়ে চলমান সমাজ মেনে নেবে না। কিন্তু তাদের এই বিয়েতে বাধা দেবার কেউ নেই। কিন্তু কিভাবে হবে বিয়ে? কিভাবে সংসার চালাবে? থাকবে কোথায়? অনেক অনেক প্রশ্ন।ডাক্তারবাবুর পা ধরে ওদের আকুতি। অনেক রোগী জমা হয়ে যায়।চলে আলোচনা। ওরা কোন স্টাফ নয় যে ওদের কোয়ার্টার মিলবে।কিন্তু তাহলে সমাধান কি করে সম্ভব? সারাদিন আলাপ আলোচনা করার পরে, ওদের দুজনের অস্থায়ী কাজ মিলে যায়। একজন কেন্দ্রের চিকিৎসালয়ে আর অন্যজন রাজ্যের হাসপাতালে। একটা খালি কোয়ার্টারে আপাততঃ ওদের থাকার ব্যবস্থাও হল। পরে ওরা হাসপাতালের পাশের জমিতে থাকার জন্য কাঁচা বাড়ি তৈরি করে নেবে। নাই বা থাকল তাদের মালিকানা? কেউ বাধা দিতে গেলে, একযোগে বাধা দেওয়া হবে।

সুখেন কাল খবরটা পেয়েছে। আজ থাকতে বলেছে ওকে গৌরীপুরে। ওদের দুজনার নতুন পথ চলার সাক্ষী থাকতে হবে।এখনও নাকি পুরোহিত কিংবা বিয়ের কোন কেনাকাটা হয়নি। কোন লগ্নের প্রয়োজন পড়ে না। সবকিছু ঠিক হলে, আজকেই বিয়ে হবে ওদের।

সুখেনদের প্রায়শই আড্ডা বসে। এতে ওরা ছাড়াও যোগ দেয় ডাক্তার বাবুরা। এখানে আসার আগে ডাক্তার বাবুদেরও একটা কিন্তু কিন্তু ভাব থাকে। যেহেতু স্বামী কুষ্ঠ হাসপাতালে কাজ করে, তাই বাড়ির গৃহিনীরাও অশান্তি ভোগ করে। লোকজন মেলামেশা করলেও থাকে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব। আর তাই ডাক্তার বাবুদের অশান্তি নেহাত কম ছিল না। তবে তাদের অধিকাংশেরই মেলামেশা ও পরামর্শ সুখেনদের বেশ ভালো লাগত। একদিন গল্পচ্ছলে একটা মজার অথচ বেদনাদায়ক ঘটনা শোনালেন এক ডাক্তারবাবু। তিনি সদ্য এমবিবিএস পাশ করেছেন। বাঁকুড়াতে বাড়ি। বাড়ির থেকেই যাতায়াত করেন বাসে। একদিন বাসে উঠে, একটা সিটে বসেছেন তিনি। কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে এলে, তাকে ভাড়া মিটিয়ে দেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল- "আপনি কোথায় নামবেন?"

"আমি গৌরীপুর যাব বলতেই কন্ডাক্টর সঠিক ভাড়া নিয়ে আমায় টিকিট আর বাকি পয়সা ফিরিয়ে দিল। আর আমাকে দেখে বাসে পাশাপাশি বসে থাকা লোকজন নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাউয়ি করতে লাগল। কথাটা শুনে ওদের মনে হল, আমি একটা অন্য জগতের লোক, যার মধ্যে কুষ্ঠ রোগের বাক্স রয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক আর আশ্চর্যের বিষয় হল, আমার পাশে বসা ভদ্রলোক আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেল। দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু  কেউ সিটে বসতে এল না। আমি নেমে যাওয়ার পর বাসের সহযাত্রীরা কি করেছিল জানা নেই।"

এই ঘটনাটা ডাক্তারবাবুর মুখ থেকে শুনে একটা ধারনা হয়ে গিয়েছিল যে, বিয়ে বাড়ির কাজ করার জন্য কোন পুরোহিত পাওয়া যাবে না। সুখেন যখন ওখানে পৌঁছালো, তখন বিয়ে বাড়ির জন্য কেনাকাটা করা হলেও, নাপিত আর পুরোহিতের কোন খোঁজখবর নেই। বিয়ে হবে হিন্দু মতে। পুরোহিত দরকার। অবশেষে স্বস্তি মিলল। এক ব্রাহ্মন কর্মচারীকে আর একজন নাপিতকে রাজী করানো হল। তারা এখানেই চাকরি করে। তবে দুজনাই এখানের রোগী ছিল একদা। তাদেরকে রাজী করিয়ে বেশ আনন্দের সাথে বিয়ে সম্পন্ন হল। সেদিন সুখেন বেশ রাত করে ওর আস্তানাতে ফিরে এসেছিল একরাশ আনন্দ নিয়ে।

এমন একটা দিন নাই যে, সুখেন নিজের কারাগার থেকে অন্যত্র থেকেছে। যত রাতই হোক, সে ফিরে এসেছে। তবে তাকে এখন দু জায়গাতেই পালা করে যেতে হয়। একটাই চিন্তা, কি করে পুনর্বাসন করা যাবে? এছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে চিন্তা মাথায় ঘোরাঘুরি করে। যদি সত্যিই এদের কেন্দ্রীভূত অবস্থায় পুনর্বাসন করা হয়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় বিবিধ জিনিসের ব্যবস্থা করতে হবে। ধরে নিতে হবে বাইরের কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না।এখন এইসব চিন্তা করেই সময় পেরিয়ে যায়।

আজ কদিন শরীরের বেশ কিছু ধকল হয়েছে। শরীরটা বেশ ভালো নয়, তাই আজ কোথাও বের হবে না সুখেন। বাড়িতেই কাটাবে।হঠাৎ একটা খবরে মনটা খারাপ হয়ে গেল সুখেনের। খবর পেল যে, বড়দার বড় মেয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে গেছে। রাখালদা সকালে এসে এই খবরটা দিল। রাখালদা আসতেই বলল- "জানো তো ছোট কর্তা, বড় কর্তার মেয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে গেছে?"

- "সে কিরে? খুকীর বিয়ের তো সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এই ফাল্গুনেই বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল।"

- "হ্যাঁ, সব তো ঠিকই ছিল। কিন্তু গতকাল একটা চিঠি এসেছে বড়দার নামে। লিখেছে, এই বিয়ে বাড়িটা হচ্ছে না।"

- "কোন কারন লেখেনি?"

- "না, তবে বড়দা আর মেজদা কাল ওদের বাড়িতে গিয়েছিল।ওদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে, বাড়িতে কুষ্ঠ রোগী আছে, তাই ঐ পরিবারে বিয়ে দিতে পারবে না।"

- "ওরা কিছু বলে নি?"

- "হ্যাঁ, ওদের হাতে পায়ে ধরে মিনতি করেছিল। বলেছিল আমার ছোট ভাই তো পরিবারের সাথে থাকে না, তাহলে কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? তা ছাড়া আমার ভাই তো বহুদিন যাবৎ সুস্থ হয়ে বাস করছে অন্যত্র।"

- "ওরা তার উত্তরে কিছু বলেনি?"

- "ওরা কোন কথাই শোনেনি। কাল ওরা ফিরে আসার পর বাড়িতে সকলেই চুপচাপ হয়ে গেছে। খুকী দিদিমনি তো ঘরে খিল দিয়ে বসে আছে।"

সুখেন আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। তার মুখটা শ্রাবনের মেঘের মত কালো হয়ে উঠল। তারজন্য খুকীর বিয়ে হল না? নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে। মনটা বিদ্রোহ করে উঠে। মনে হচ্ছিল যে, এই সমাজটাকে ভেঙে চুরে ফেলতে। এটাই কি সুস্থ আধুনিক সমাজ? মানুষ কি কোনদিন নিজেদের পরিবর্তন করবে না? তার এই রোগের জন্য একটা নতুন সংসার গড়ে উঠল না। সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারল না। চুপচাপ বসে থেকে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। কার পাপে এই পরিস্থিতি? এই প্রশ্নের কোন উত্তর সে পেল না। সারাদিন সে শুয়েই থাকল। স্নান খাওয়া পর্যন্ত করতে পারল না।

চলবে 

৪টি মন্তব্য:

  1. শ্যামাশঙ্কর বরাট২০ মার্চ, ২০২৬ এ ১২:৪৫ PM

    বাস্তব সামাজিক সাংসারিক অভিব্যক্তি। সুন্দর সুন্দর।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। অনুগ্রহ করে পেজের ফলো বটমে চাপ দিয়ে এই ই-ম্যাগাজিনের একজন ফলোয়ার হয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন।

      মুছুন
  2. মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প তবে একরাশ মন খারাপ। তবে এটা একদম বাস্তব ঘটনা। ভালো থাকবেন স্যার।.....মাম্পী দাস

    উত্তরমুছুন
  3. নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। অনুগ্রহ করে পেজের ফলো বটমে চাপ দিয়ে এই ই-ম্যাগাজিনের একজন ফলোয়ার হয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন।

    উত্তরমুছুন