অগ্নিশপথ
সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ'। লিখছেন প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতি রবিবার প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ বত্রিশ পর্ব - সম্পাদক ।)
কিশোরবেলার ক্ষুদিরামের দুঃসাহসিক কাজের বহু নজির আছে। তেমনি আছে মানবিক কাজেরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সম্পর্কে দারুন মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করেছেন অস্ত্রগুরু হেমচন্দ্র। খুব কাছ থেকে তিনি এই অগ্নি বালককে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অন্তদৃষ্টি দিয়ে জরিপ করেছেন আপাদমস্তক। ক্ষুদিরামের বুকে বিপ্লবের জ্বলন্ত আগুন দেখেছেন তিনি। তাঁরই আত্মকথার বয়ানে লিখেছেন - "ক্ষুদিরামেের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ওপরে লিখিত ঘটনার কয়েক মাস পূর্ব্বে। একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি মেদিনীপুরের কোন নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তা থেকে একটু দূরে কয়েকজন ছেলে ব'সেছিল। তার মধ্যে থেকে ক্ষুদিরাম দৌড়ে এসে আমার বাইক আটকে, অত্যন্ত সহজ ভাবে বলেছিল, তা'কে একটি রিভলবার দিতে হবে। তখন তার বয়স আন্দাজ ১৪ বছর, কিন্তু তাকে দেখে তখন আমার মনে হয়েছিল মাত্র বার কি তের বছর । দেখতে ছোট খাট পাতলা হ'লেও শক্ত ও দৃঢ় ছিল।
আমার কাছে যে রিভলবার থাকত বা রিভলবার ব্যবহার করার যে শিক্ষা দেওয়া হ'ত, এত কচি ছেলে যখন তা জানতে পেরেছে, তখন অনেকের মধ্যে কথাটা জানাজানি হ'য়েছে, এই সন্দেহে ভারি বিরক্ত হ'য়ে তাকে একচোট বেশ ব'কে দিলাম । কিন্তু তা'তে সে কিছু মাত্র অপ্রতিভ না হ'য়ে, তাকে যে একটা রিভলবার দিতেই হবে, তা' এমন অকুন্ঠিত আগ্রহের সহিত জেদ ধরেছিল যে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হয়েছিলাম, রিভলবার নিয়ে সে কি করবে । উত্তরে সে বলেছিল, সে একটা "সাহেব" মারবে ।" সাহেব " মারবার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে খুব উত্তেজিত হয়ে যা বলেছিল, তা শুনে আমি অবাক হয়ে গেছলাম । এক কথায় তার ভাবটা ছিল এই যে, ভারতের ওপর ইংরেজ যে অন্যায় অত্যাচার করেছে, তার প্রতিশোধ তাকে নিতেই হবে। ওই তার প্রতি আমার তখনকার হঠাৎ উদ্দীপিত মনের ভাবটা চেপে, রাগ ও বিরক্তির ভান করে তাকে বেশ ধমকে দিয়েছিলাম। পরে সত্যেনের কাছে খোঁজ করে তার সব খবর পাই। সেই হ'তে তা'র ছোট খাট কাজের ভেতর থেকে তার কয়েকটি অনন্য সাধারণ গুণের পরিচয় পেয়েছিলাম। একটি হচ্ছে নিজের বা অন্যের প্রতি আচরিত কারও অন্যায় অত্যাচার সে সহ্য করতে পারত না ।"
হেমচন্দ্র আরও বিস্তৃতভাবে এবং শৈশবকাল থেকে ক্ষুদিরামের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রটিকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন।I পারিবারিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট তার উপর ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছিল বলে হেমচন্দ্রের দৃঢ় বিশ্বাস। শৈশবে ক্ষুদিরামকে চরম দুঃখের সাগর অতিক্রম করতে হয়েছিল। ক্ষণজন্মা এই বিদ্রাহী বীরের কাজের ধারা ছিল সুবিস্তৃত। শুধু দিদি, জামাইবাবু আর ভাগনে ললিত মোহনকে নিয়েই ক্ষুদিরামের বাঁচা মরা নয়। তার কাছে দেশমাতার মুক্তিই প্রধান লক্ষ্য। শেকল খোলার জন্যই তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই লক্ষ্যে সংগঠিত করেছেন আখড়া , ব্যায়াম সমিতি, ক্লাব। ভেতরে চলত গুপ্ত সমিতির কাজ। কখনো হাটগেছিয়া, কখনো তমলুক কিম্বা মেদিনীপুরের মাটি ক্ষুদিরামকে এনে দিয়েছিল বিপ্লববাদের সঞ্জীবনী মন্ত্র। ১৯০১ থেকে ১৯০৩ ছিল প্রস্ততির বছর। ১৯০১ সালে মেদিনীপুর শহরে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তখনকার দিনের বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা "নেশন" এর সম্পাদক এন .এন. ঘোষ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন অবিসংবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, 'সঞ্জীবনী' সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র প্রমূখ। সম্মেলনকে ঘিরে স্থানীয় কিশোর, যুব কর্মীদের মনে জাতীয়তাবোধের বিপূল জাগরণ ঘটে। এই গণজাগরণের মধ্য দিয়ে এখানে স্থানীয় স্তরে একটি বিপ্লবী কেন্দ্রের জন্ম হয়। নেতৃত্বে ছিলেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ এবং হেমচন্দ্র I কলকাতার পর ক্রমশ মেদিনীপুরই হয়ে উঠেছিল বিপ্লববাদের বৃহত্তম সাধনক্ষেত্র। ১৯০৩ সালে এখানকার নবগঠিত গুপ্ত সমিতি অরবিন্দ ও ভগিনী নিবেদিতাকে নিয়ে আসেন তাদের কর্মসূচূ ও বৈপ্লবিক কাজকর্মের নীতিনির্ধারণের লক্ষ্য নিয়ে।
চলবে


চলুক আপন গতিতে
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়
বানান ভুল থাকছে কেন?বৈপ্লবিক, কিংবা,কর্মসূচি... 'আশৈশবকাল থেকে' - প্রয়োগটি ভুল।শেকল খোলা কি? শেকল ভাঙা বা ছেঁড়া হয়, নয় কি? আলোক মণ্ডল।
উত্তরমুছুন