ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ মারীচ ও সুবাহু কথা (পর্ব ১০) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

মারীচ ও সুবাহু কথা

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "মারীচ ও সুবাহু কথা"। প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি।  আজ পর্ব - দশ। - সম্পাদক)

(১০)

পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে মা তাড়কার সাথে দু ভাইও নিয়মিত যোগ দিত। সাথে আরো অনেক রাক্ষস নাকি যোগ দিত যজ্ঞ পণ্ড করার উদ্দেশ্যে। বিশ্বামিত্র মুনি এই রাক্ষসের দলকে হত্যা করার উদ্দ্যেশ্যে রামচন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতা লক্ষ্মণকে নিয়ে আসেন। যজ্ঞে উৎপাত করা বলতে মুল রামায়ণে কথিত আছে যে, ঐ সব রাক্ষসের দল যজ্ঞস্থলে ফেলত হাড়, মাংস, রক্ত প্রভৃতি। রামায়ণের তথ্য অনুযায়ী ঐসব রাক্ষসের দল ভক্ষণ করত কাঁচা মাংস ও রক্ত।

কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। আর সেটা হল, সত্যিই কি তারা কাঁচা মাংস খাদ্য হিসাবে গ্রহন করত? এখানেও আসে প্রশ্ন। তাড়কার স্বামী কিন্তু আশ্রমে ফলমূল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এসেছিল। তখন তো রক্ত মাংস ভক্ষণের কথা উত্থাপিত হয়নি? এছাড়া যদি ধরেই নিই যে, ওরা কাঁচা মাংস  ভক্ষণ করত, তাহলে ওরা সত্যিকারের অনার্যভূত ছিল, যারা আর্যদের ঘৃণা করতেন।  জঙ্গলে আর্যদের আগমনে তাদের ফলমূল কেড়ে নিয়ে তাদের রুটি অধিকারে এবং রোজগারে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য ঐ ধরনের কাণ্ড করত। যদিও মানব জীবনের বিবর্তনের ইতিহাসে কাঁচা মাংস ভক্ষণ করার কথা উল্লিখিত আছে।

স্বামীহারা তাড়কা দুই সন্তান সহ বেঁচে থাকার তাগিদে যদি ফলমূল কেড়ে নেবার প্রচেষ্টা চালায়, তবে সেটা বেঁচে থাকার তাগিদেই ছিল। অনার্য সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে রাক্ষস বানিয়ে তাদের আর্যদের থেকে দুরে ঠেলে দেবার এক প্রয়াস থাকতেও পারে।

মা তাড়কা সহ পুত্র সুবাহুকে রামচন্দ্র হত্যা করে। আর মারীচকে বাণ দ্বারা এমন আঘাত করে যে, মারীচ মারা না গেলেও দুরে গিয়ে পড়ে। সম্ভবত মারীচ ঐ সময়ে রাবণের রাজত্বে চলে যায় এবং তাঁর কাছে আশ্রয় পায়। সে রাবণের অনুগতও হয়ে ওঠে। এটাই গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে।

এবার আসা যাক সীতা হরণের প্রসঙ্গে মারীচের ভূমিকায়। সুর্পনখা লক্ষণের কাছে আহত ও অপমানিত হয়ে দাদা রাবণের শরনাপন্ন হলে, রাবণ সীতা হরণের জন্য মারীচের সাহায্য চায়। কিন্তু সেটা কি ভাবে সম্ভব হবে? মারীচ নাকি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারত। হরিণের রূপ ধরে উপস্থিত হয় রামচন্দ্রের কুটিরের সামনে। এক্ষেত্রেও প্রশ্ন থেকেই যায়। কাহিনিতে অবাস্তব আর অলৌকিকে মোড়া বিভিন্ন সব ঘটনা। অনেকটা বর্তমান সময়ের প্রচলিত ভূত প্রেতদের মত, যারা ইচ্ছেমত রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। মন সায় দেয় না। হয়ত বা এর মধ্যে কোন একটা পেশা জড়িয়ে থাকতে পারে। আর এটা সম্ভবত বহুরূপী সজ্জার একটা অঙ্গ। মারীচ মারা যায় রামচন্দ্রের হাতে। মারা যাবর আগে সে যে রামচন্দ্রের গলা নকল করে ডেকেছিল, সেটাও কোন অলৌকিক ঘটনা ছিল না। বর্তমান সময়েও মিমিক্রি প্রচলিত আছে, যার ফলে মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন পশু পক্ষীর গলার স্বর নকল করা সম্ভব।মারীচ পিতা মাতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে না পারলেও, সীতার অপহরনের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।

চিত্র ঋণঃ উইকিমিডিয়া কমন্স 

চলবে

৪টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ যুক্তি ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর হচ্ছে

    উত্তরমুছুন
  3. শ্যামাশঙ্কর বরাট৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৫:০৮ PM

    অসাধারণ দাদা,অসাধারণ ।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব যুক্তিসম্মত লেখা। যেন ভিন্ন আঙ্গিকে রামায়ণ কে দেখা। অপূর্ব!

    উত্তরমুছুন