আলো নিভে গেল বিদায় নানা
শুভাশীষ পাইন
সন্ত কবিরের এক অমর দোহা স্বামী বিবেকানন্দ অনুবাদ করেছিলেন - "যেদিন প্রথম তুমি এসেছিলে ভবে, তুমি মাত্র কেঁদেছিলে হেসেছিল সবে, এমন জীবন হবে করিতে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।" আজ এই চিরন্তন বাণী যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য করে দিয়ে অমৃতলোকে চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, বিশিষ্ট অভিনেতা নানা পাটেকর। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়েও তাঁকে ফেরাতে পারেননি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ শেখর সালকার। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে অসমুদ্র হিমাচল, শোকের ছায়া নেমেছে ভারতের চলচ্চিত্র জগতে।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণকারী বিশ্বনাথ পাটেকর ওরফে নানা পাটেকরের যাত্রা শুরু হয়েছিল মারাঠি থিয়েটারের মঞ্চ থেকে। সেখান থেকে সত্তরের দশকে 'গমন' ছবি দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের চলচ্চিত্র জীবন। তিনি কখনো গতানুগতিক নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন অভিনেতা, একাই একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর চোখের আগুন, তাঁর সংলাপ বলার তীব্রতা - সবকিছুই ছিল একেবারে নিজস্ব। মীরা নায়ারের অস্কার মনোনীত 'সালাম বম্বে' থেকে শুরু করে 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর', 'প্রহার', 'অগ্নিসাক্ষী', 'অব তক ছাপ্পান', 'ওয়েলকাম' - প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। তাঁর ঝুলিতে ছিল তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার এবং ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মান।
কিন্তু নানা পাটেকর শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারত মাতার এক বীর সন্তান। ১৯৯৯ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কারগিলে ভারতবর্ষকে আক্রমণ করেছিল, তখন এই মানুষটি স্টুডিওর আলো ছেড়ে ছুটে গিয়েছিলেন সীমান্তে। ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির একজন সাম্মানিক ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি সৈন্যদের পাশে থেকে, বাঙ্কারে থেকে তাঁদের মনোবল বৃদ্ধি করেছিলেন। অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে দেশের জন্য কাজ করেছিলেন তিনি। সেই দেশপ্রেমই তাঁকে 'ক্রান্তিবীর' থেকে বাস্তবের বীরে পরিণত করেছিল।
তাঁর আসল পরিচয় ছিল মানবতাবাদী হিসেবে। গ্ল্যামারের দুনিয়া থেকে অনেক দূরে তিনি তাঁর বন্ধু মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছিলেন 'নাম ফাউন্ডেশন'। মহারাষ্ট্রের খরা-পীড়িত, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। নিজের হাতে লাঙল ধরে মাঠে নেমেছিলেন, কৃষক পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দিয়েছিলেন নীরবে। অভিনেতা নানা পাটেকর চলে গেলেও মানুষ নানা পাটেকর আজও প্রতিটি কৃষকের ঘরে বেঁচে থাকবেন।
মাত্র চার দিন আগে ৪ অক্টোবর গোয়ার দোনা পাওলাতে সম্রাট ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। সাদা কুর্তা আর গামছা পরে তিনি বলেছিলেন, "আমাদের সবাইকে একদিন যেতেই হবে। আমি জানি না কাল থাকব কি না।" কে জানত, সেই কথাই সত্যি হয়ে যাবে এত তাড়াতাড়ি! আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর ফেলে যাওয়া সংলাপ, তাঁর আদর্শ, তাঁর মানবতাবাদী কৃতিত্ব অমর হয়ে থাকবে। বীর প্রসবিনী ভারত মাতার এই মহান সন্তানের প্রয়াণে আজ প্রতিটি ভারতবাসীর চোখের কোণ ভিজে উঠেছে।
নিবন্ধের বক্তব্য লেখকের নিজস্ব




খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুননানার অভিনয় আর সেবামূলক জীবন সম্বন্ধে আরও বিশদ জানালে ভাল হত। তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে উদাহরণসহ আরও কথা আশা করেছিলাম। মেঘ মুখোপাধ্যায়
উত্তরমুছুন