কিছু কথা কিছু অনুভূতি
আলোক মণ্ডল
শারদোৎসব নিয়ে লিখতে হলে আমি আমার অনুভূতির কথাই লিখব, অনিবার্যভাবে চলে আসবে শৈশবের কথা। তখন শরৎ মানে সত্যি-সত্যিই ছিল হিমের পরশ, ঘাসে শিশিরের রেখা- হালকা কাঁথামুড়ি দিয়ে এক রহস্যময় অন্ধকারে আধোঘুমে আধো জাগরণে রেডিওতে "আশ্বিণের শারদ প্রাতে......." কিছুটা শোনার পর ঘুমের জগতে চলে যাওয়া। আবার যখন ঘুম ভাঙতো তখন, "গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম্" অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর মুখে, বাইরে আলোর আভাস, মুহুর্মুহু পটকার আওয়াজ, লেপমু্ড়ি ছেড়ে একলাফে বাড়ির বাইরে, বন্দুক-মুড়িপটকা নিয়ে যেন আমিও সৈনিক! শুরু হোল, পুজোর আনন্দ। রাস্তার দু'ধারে শাদা কাশের সারি, ধানের বুকে দুধ আসার গন্ধ, চারদিকে একটা ছুটি ছুটি ভাব নিয়ে মহালয়ার পর ২/ ৩ দিন কোনক্রমে স্কুল হয়েই ছুটি--পুজোর ছুটি। হৈ-হৈ করে দে দৌড়! আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে!
আসলে পুজো মানে আমার কাছে ছিল পড়াশোনা শিকেয় তুলে ছুটির নিখাদ আনন্দকে শুষে নেওয়া আর "শুকতারা", "কিশোর ভারতী" গো-গ্রাসে গেলা। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না তাই বেড়াতে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না। সত্যিকথা বলতে কি প্রতিমা দেখার তেমন কোন উৎসাহই ছিল না, বড়োদের সঙ্গে যেতে হোত তবে দুগ্গা না দেখে বেশি নজর পড়তো মহিষাসুরের দাঁত আর সিংহের কেশরের দিকে। অবশ্য তখন মণ্ডপ তৈরির এতো বৈচিত্র্যও ছিল না, থিমের চল তো ছিলই না, প্রতিমার শারীরিক সৌন্দর্যেরও তেমন নৈপুণ্য ছিল না- অতি সাধারণ প্রতিমা, পেছনে কালিঘাটের পটচিত্র। কোন দাগই পড়তো না মনে। বরং ঐ চড়াম-চড়াম ঢাকের আওয়াজে বুক দুরদুর করতো। এই অনুভব কৈশোর যৌবন পর্যন্তই ছিল। যৌবনে পুজোর ছুটিতে আড্ডাই প্রধান, এমন কয়েকবার গেছে যখন মন্ডপ দেখাই হয় নি, বন্ধুরা মিলে ম্যারাথন আড্ডা দিয়েছি কারো ঘরে কিংবা দূরে লোকালয় ছেড়ে কোন খাল বা নদীর পাড়ে। তবে খাওয়া কি বন্ধ থাকতো? না, ভীষণ টান ছিল অন্ততঃ ঐ মহাষ্টমী নিয়ে - কারো বাড়িতে আড্ডায় বসে, চলছে গরম-গরম ফুলকো লুচি আর কুমড়োর তরকারী সঙ্গে লাড্ডু। এটা কোন ভাবেই মিস করতে দিতাম না, কোনোবার। মনে পড়ে বাঙ্গাল-দোকান থেকে বাটি করে ডালডা ঘি আনতাম আর সেই ডালডা ঘি যখন গরম কড়াইয়ে রাখা হতো, মনে হোত যেন শ্বেতশুভ্র হিমালয় পাহাড় মুহূর্তে কোন ম্যাজিকে গলে গেল! তারপর গোলগোল ফুলকো লুচি যখন আমাদের পাঁচ ভাই-বোন কে এক সারিতে বসিয়ে খেতে দিতেন মনে হোত মা কুন্তি যেন পঞ্চপাণ্ডব কে ভাঙা ইট বেরোনো বারান্দায় খেতে দিচ্ছেন!
যাক, এবার নিজের কথা না বলে একটু শারদ সংখ্যা নিয়ে বলি, যেহেতু পুজো মানে ছুটি, আর ছুটি মানে পুজো সংখ্যা পড়া। পুজো সংখ্যা ছাড়া পুজোর ছুটি নিরর্থক। আসলে গত শতাব্দীর শেষ দশকের আগে পর্যন্ত আপামর বাঙালি উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতো দু'টি জিনিষের জন্য - এক হচ্ছে, পুজোর গানের নতুন লঙ-প্লেয়িং রেকর্ড- আরতি, মান্না, হেমন্ত, সন্ধ্যা, শ্যামল, তরুণ- কার গান হিট করে! আর দুই হচ্ছে, কোন্ পত্রিকার শারদ সংখ্যা বেশি লেখায় সমৃদ্ধ। একটু যখন রোজকার বাড়ল তখন কম করে ৪/৫ টা পত্রিকার পুজো সংখ্যাও কিনতাম। শারদ বা পুজো সংখ্যার কথা যখন এলো তার ইতিহাসটি একটু বলে ফেলি এই ফাঁকে, গত সপ্তাহে জেলার একটি পত্রিকার শারদ সংখ্যা প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হওয়ার দরুন এই প্রসঙ্গটি এসেছিল, সেই সুবাদে এখনে একটু আলোকপাত করলে সম্পাদক মহাশয় নিশ্চয়ই ধমক দেবেন না, মনে হয়!
ব্রহ্মানন্দ কেবশচন্দ্র সেনের ভারত সংস্কার সভার পত্রিকা ছিল ‘সুলভ সমাচার’। এটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৮৭০ সালে ১৬ ই নভেম্বর। এই পত্রিকাটির শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে "ছুটির সুলভ " নামে। এই সংখ্যার সম্পাদনা করেন উমানাথ গুপ্ত। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল ১ পয়সা। প্রায় ১০০০ কপি ছাপা হয়েছিল এবং সব গুলিই নি:শেষিত হয়। পত্রিকাটি ব্রাহ্মসমাজের হলেও এটিই প্রথম বাংলা পত্রিকার পুজো সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।" সুলভ সমাচার" পত্রিকার "ছুটির সুলভ " সংস্করণের জন্য প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটিও বেশ মজার-
"আগামী বৃহস্পতিবার ছুটির সুলভ বাহির হইবে কেমন সুন্দর কাগজকেমন পরিষ্কার ছাপা, কেমন মজার ছবি, অথচ সস্তা দাম। ছেলে, বুড়ো, যুবা সকলেই মজা করিয়া ছুটির সুলভ পড়ো। দেখ যেন কেউ ফাঁকি পড়ো না।...
বাড়িতে যেমন ভিয়েন বসে, আমাদের ছুটির সুলভেরও ভিয়েন বসিয়াছে। এবার ভালো-মন্দ, নীতি, তামাসা, নানারকম ছবি, কিছু কিছু ধর্মের কথাও বাহির হইবে। ছেলে, বুড়ো, যুবা সকলে যেন এক-একটি পয়সা দক্ষিণা দিয়া ইহার পূজা করেন। ১৮ ই অক্টোবর শনিবার ইনি অবতীর্ণ হইবেন। পথে ঘাটে বাজারে সুলভের দর্শন। রেলওয়েতেও ইহাকে দেখিতে পাইবেন।"
কেউ-কেউ কেনার সুযোগ পায় নি, শোনা যায় তার জন্য পরে ২০০ কপি পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছিল। সংখ্যাটিতে ছিল ছড়া কবিতা গল্প প্রবন্ধ কার্টুন ছবি, কৌতুক এবং ধাঁধাঁ। "রেলওয়ে কোম্পানির নূতন আইন" নামের একটি প্রবন্ধে রেলের অবব্যস্থা নিয়ে এবং টিকিটের দাম নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। 'সাধনা’,
ভারতবর্ষ’, ‘বঙ্গবাণী’,'আনন্দবাজার’ প্রভৃতি পত্রিকার পুজা সংখ্যা এরপর প্রকাশ শুরু হোল। ১৯২৬ সালে " আনন্দবাজার পত্রিকা"- র শারদ সংখ্যা প্রথম প্রকাশ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের " রবিবার" গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে। যাক,এ বিষয়ে আর বিস্তৃত কিছু লিখছি না, পাঠকমন ভারাক্রান্ত হবে বরং আর একটি পুজো কেন্দ্রিক মজার কথা বলে শেষ করি।
সে-বার, মানে পুজোর নবমীর দিন, মাসীবাড়ি যেতে গিয়ে ভুল জায়গায় গিয়ে উঠি, সেই গ্রামে তখন ইলেকট্রিক পৌঁছায় নি। মাটির রাস্তা-ঘেরা গ্রাম। বাঁশঝোড় আর শাল মহুয়ার গাছগাছালি গ্রামের সর্বত্র । এই গ্রামে একটিও দুর্গা প্রতিমা হয় না। যখন পৌঁছায় তখন রাত হয়ে গিয়েছিল, ফেরার কোন উপায় না পেয়ে গাঁয়ের পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়িতে আশ্রয় নিই, বহু কাতর অনুনয়-বিনয়ের বিনিময়ে। ঐ গ্রামে প্রতিরাতে রামযাত্রা পালা হোত। রাতে খাওয়ার পর সেই পালাগান বা যাত্রা দেখতে বের হই, চারদিক খোলা, মাথার উপরে শাল ডাল ও পাতার ছাউনি, তার মিষ্টি গন্ধ, চারকোনে চারটি হ্যাজাক লাইট তার অপরিচ্ছন্ন আলোয় চকচকে পোশাকে, ইয়া রাক্ষসের মুখোশ পরে রাবন সীতাকে হরণ করছে- তাকে নিয়ে রাবণ গ্রিনরুমের দিকে ছুটছে, মুহূর্মুহু হাততালি পড়ছে। আমরাও মজাতে হাততালি দিচ্ছি। হঠাৎ বাঁধভাঙা হাসির রোল, কী হোল? কী হোল? দেখি, সীতার শাড়ি খুলে গেছে, পায়জামা-পরা একটা লোক কী করবে খুঁজে না পেয়ে বসে পড়েছে, ঐ লোকটাই সীতাদেবী। যাত্রাপালা থেকে ফিরে এসে দেখি, আমাদের শোওয়ার আয়োজন-গোয়াল ঘরের পাশে একটি মাটির ঘরে, মেঝেতে খড়, তার ওপরে কালো কম্বল পাতা। গরু ও গোবরের গন্ধ, গরুর দীর্ঘশ্বাস আর ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ। ঘুম কিন্তু চলে এলো, সকালে উঠে মনে হোল এক ম্যাজিক রিয়ালিটির রাত পের হয়ে এলাম।
ছবিঃ পাঠকপাড়ার দুর্গাপ্রতিমা

ভালো লাগলো আলোকদা৷
উত্তরমুছুনঅনুভূতসম্পন্ন মানসিকতাতে পুজো পরিক্রমা ভালোই জমে ওঠার অপেক্ষায়।সূচণাপর্বে আলোকদা ভালোই আলোচনা করেছেন।
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়
Good.Nostalgic also.
উত্তরমুছুনবেশ নস্টালজিক। পূজা ঐ শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি। এগুলো ভাল লাগে। তখন ঐ যে একটা সরল বিশ্বাস ( কৈশোরের একটা সময় পর্যন্ত) ছিল যে মা দুর্গা আছে এবং সত্যি সত্যি সেই দুর্গা সব বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন এবং প্রতিকূলতা থেকে বাঁচাবেন। তারপর ক্রমশ সেই বিশ্বাস উধাও হয় ( কিছু যুবকের তো হয়ই)। আমি অনেক বছর হলো এই কৃত্রিমতায়, ভিড়ের মধ্যে থাকি না। তবে গাঁয়ে পূজার দিনগুলোর মধ্যে বা পূজার পরে একদিনের জন্যও যাই ছোট বেলার স্মৃতি হাতড়াই। একসময় পূজা মানে কিছু মানুষের রুটি রুজি জড়িয়ে থাকতো। এখন তো তাও বিলুপ্ত প্রায়। এখন মানুষ বড় বড় সপিং মলে যায়। হতাশ হই এখন।
উত্তরমুছুনতোমার লেখার মধ্যে আরো অনেক কিছু আসতে(শৈশব কৈশোরের কথা) পারতো।
তবুও যেটুকু লিখেছ ভাল লাগল। নিজের মধ্যেও নস্টালজিয়া এলো।
সুন্দর সাবলীল লেখা ।অনন্য স্মৃতিমেদুরতা ….
উত্তরমুছুনমানে তো আত্মশক্তির জাগরণ ।আত্মবোধে
উন্মেষণ থেকে বিশ্ব বোধে উত্তরণ ॥
আমাদের কাঙ্খিত প্রয়াস ঐতিহ্য পরম্পরার সঙ্গে
আধুনিকতার শোভন সুন্দর মেলবন্ধন॥
মানুষের মনুষ্যত্ব সীমাহীন প্রাচুর্যে নয় অন্তরের
ঐশ্বর্যেই প্রকাশ পায় ।
সে সময়ের সহজ সরল পারস্পরিক সম্পর্ক
সামান্যর মধ্যেই অসামান্যকে খুঁজে পাওয়া
অনাবিল আনন্দের আস্বাদন সরল দুচোখের
গভীর দৃষ্টি তে নিসর্গ প্রকৃতি আর পারিপার্শ্বককে
অপার বিস্ময়ে দেখা আমাদের সবার জীবনেই
অমল স্মৃতি সুধা ।…….
অমৃত শুভেচ্ছা সকলের জন্য ॥
দীপ্র শারদ অভিবাদন॥
বিশ্বরূপ দত্ত ।বাঁকুড়া ৭২২১০২
**পূজা মানে তো আত্মশক্তির জাগরণ………
উত্তরমুছুনআমার লেখায় বাক্যটি এ রকম হবে ।
বিশ্বরূপ দত্ত॥
কৃতজ্ঞতা জানাই সম্পাদক কে।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো, অতীত ফিরে পেলাম।
উত্তরমুছুনআলোকদার স্মৃতিচারণে আমাদের শৈশব ফিরে পেলাম। চমৎকার লেখা। এই সুযোগে লেখক বাংলা সাহিত্যে - সংস্কৃতিতে প্রথম শারদ সংখ্যা প্রকাশের ইতিহাস শুনিয়ে দিলেন। এই সঙ্গে পাঠকপাড়ার প্রতিমা দেখা হয়ে গেল। মেঘ মুখোপাধ্যায়
উত্তরমুছুনভালো লাগল ।
উত্তরমুছুনকেতকী বাগচী সল্ট লেক।