পুজোর কথা - অনুভব আর আন্তরিকতায়
অতনু চট্টোপাধ্যায়
দুর্গাপুজা আসলেই মন ছূটে চলে অতীতের দিনগুলোতে। মনের ক্যানভাসে ছবির পর ছবি ভাসিয়ে নিজের মনেই কথা বলি, হাসি আর ফেলে আসা আনন্দের ছোঁয়া পাবার চেষ্টা করে থাকি। গ্রামে যখন ঠাকুর গড়ার কাজে ছুতোরেরা ব্যস্ত থাকত, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়ারাও প্রতিমা গড়ার কাজ দেখতে মন্দিরেই সময় কাটিয়ে পূজার আনন্দের নির্যাস গ্রহন করত। পূজা তো চারদিনের। কিন্তু তার আগে প্রতিমা গড়ার কাজ চলত একমাস যাবৎ।একমেটে, দুমেটে, গুলুনি দেওয়া, প্রতিমার মুখ আর হাতের আঙুল বসানো সবকিছুই নিরীক্ষণ করে চলত বাচ্চারা। তারপর প্রতিমার শরীরে পড়ত খড়ি মাটির প্রলেপ ও সবশেষে রঙ, ঘামতেল আর বার্ণিশ।হত চক্ষুদান আর মাথাতে চুল বসানো। তারপর চলত ডাক সাজানো। মনে মনে ভাবতাম, কোন এক জাদু মন্ত্রবলে খড়ের কাঠামোতে মাটি লাগিয়ে মূর্তি গড়ার পর কি পরিবর্তন।
মহালয়ার পরেই গ্রামে দুর্গাপূজার আবহে মাতোয়ারা হত সব পরিবার । রাতে উঠে ভোরবেলাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সুমিষ্ট গলাতে মায়ের আগমণী বার্তা শুনতে শুনতে হারিয়ে যেতাম কোন এক কল্পলোকে। মনে মনে ছবি আঁকতাম অসুর সহ দেবী দুর্গার।মহালয়ার চন্ডীপাঠ কিছুই বুঝতাম না তখন। তবুও কেমন একটা ভালো লাগার স্পর্শ পেতাম। মহালয়ার দিন থেকেই গ্রামের পুজার আগমণ। ব্যস্ততা বাড়ত পরিবার সমূহে। রাস্তার ধারে কোন সানের ধারি নেমে থাকলে, ওখানে গিরিমাটি ঘষা চলত। একটা ছোট বাটিতে সেই রঙ ভরে নিত তারা। ততদিনে অবশ্য বাড়ি পরিষ্কার করার কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত। একটা বাঁশের কাঠের সিড়ি (মই) নিয়ে আর মাথাতে একটা গামছা জড়িয়ে চলত গোবর ছচ দেওয়া।তারপর খড়িমাচিতে নীল বড়ি গুলে নিয়ে চলত বাড়িতে রঙ করা।বাড়ির সদরটাও পরিষ্কার করা হত। সেই সময় গ্রামে গ্রামে আসত খড়ি নিয়ে ব্যবসায়ীরা। ওখান থেকে খড়ি কিনে এনে একটা বড় মাটির পাত্রে ভিজতে দেওয়া হত। তারপর বালতি করে পরদিন ঐ খড়ির সাথে নীল মিশিয়ে চলত ঘর পরিষ্কার। ঘরে রঙ করা শেষ হলেই ঐ গুলে নেওয়া গিরিমাটির রঙ নিয়ে একটা কাঠির অগ্রভাগে কাপড় দিয়ে তৈরি করে নিত তুলি। তারপর ঐ তুলি দিয়ে চলত সদর দরজার কাছে লেখা আর চিহ্ন আঁকা। জোড়া পায়ের চিহ্ন, আর আঙ্গাডোঙ্গা দিয়ে দেওয়া হত ছাপ। এরপর চলত লেখা।যে সমস্ত সাধারন লেখা চোখে পড়ত, সেটা হলঃ
"এস মা আনন্দময়ী এ দীনের কুটিরে
পাদপদ্ম ধৌত করি নয়নের নীরে।"
অথবা
"এসো মা কুটিরে
রাখি মোরা অন্তরে।"
এর সাথে সাথেই চলত ছোটদের প্রস্তুতি। তখন দেখা মিলত গেঠিয়া নামে একপ্রকার বাজী। জিনিসটা অনেকটা গাদা বন্ধুকের মত।
বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে যে স্টে থাকে, সেই আদলে গঠিত গেঠিয়া।প্রস্তুত করা হত গন্ধক, সোরা,পাথরকুচি সহ বারুদ। একটা জায়গা ছিল ঐ গেঠিয়া শুকিয়ে নেওয়া হত রোদে। তারপর ঐ মিশ্রণ নির্দিষ্ট স্থানে রেখে একটা আংঠা দ্বারা ঐ মিশ্রণ আবদ্ধ করা হত। তারপর ঐ গেঠিয়া কোন সানের মেঝেতে আঘাত করলে,তীব্র শব্দে ফাটত ।এখন আর দেখা যায় না সেসব। আরো বাজীর দেখা মিলত। পানি ফটকা, ছুঁচো ফটকা সিটি, বোতল বোম সহ মুড়ি ফটকা প্রভৃতি বাজি। ছেলেদের হাতে ওগুলো ছাড়াও থাকত ক্যাপ ও বন্দুক।থাকত তারাবাতি আর ফুলঝুরি। ঐ সব বাজী একটা চিকচিকি কাগজে রেখে রোদে শুকিয়ে নিত। আর ওগুলো ভাগ করে নিত, কবে কোন বাজী তারা ফাটাবে।
আসি পুজোতে জামা কাপড়ের প্রসঙ্গে। চাকুরি থাকা বাড়ি কিংবা আর্থিক অবস্থাসম্পন্ন বাড়ির লোকজন বাঁকুড়াতে যেত পুজোর বাজার করতে। হাসিমুখে তারা ক্রয় করত জামাকাপড়। ছেলেদের জামা প্যান্ট দর্জির কাছে মাপ দিয়ে আসত বানানোর জন্য। প্রায় একমাস আগে ঐ জামা প্যান্টের মাপ সহ কাপড়(ছিট) দিয়ে আসতে হত। তখন বাঁকুড়ার বুকে বেশ কয়েকটা নামী দর্জির দোকান ছিল। সাত্তার ,জাব্বার আর কে সহ বেশ কিছু দর্জির দোকান। জামা প্যান্ট তৈরি হত সমকালীন ফ্যাশনের উপর ভিত্তি করে। প্যান্টের নিচের ঘের বিচার করে নাম ছিল বেলবটম, প্যারালাল, চোঙা প্রভৃতি। একটা সময় গ্যাবাডিন কাপড়ের খুব রেওয়াজ ছিল। ছিল জিনস আর কর্ডের কাপড়। ছোটদের জন্য কেনা হত রেডিমেড পোশাক। নামী রেডিমেড জামাপ্যান্টের মধ্যে নামী কোম্পানীর পোশাক। এর মধ্যে রূপম আর সানসাইন কোম্পানীর জামা প্যান্টের কদর ছিল বেশি।
অবশিষ্ট গ্রামবাসীর কেনা কাটা শুরু হত মহালয়ার পর। ততদিনে নিত্য ধান টিপে দেখে আসত গৃহকর্তা। ঐ ধানের মধ্যে ছিল কেলাস ভুতমুড়ি আশিনলয়া প্রভৃতি। এদিকে বাড়িতে চলত ছেলেমেয়েদের কান্না কাটি । গ্রামের দোকানে যাওয়া হত তারপর। গ্রামের দোকানে বকেয়া পরিশোধ করা হত ধান বিক্রি করে। তারপর মহালয়ার পর দিন থেকে চলত কেনাকাটা। সপ্তমীর দিন পর্যন্ত চলত কেনাকাটা।গ্রামের দর্জির কাছেই তুলনামূলক বড়দের জামাপ্যান্ট তৈরি করা হত। কেনা হত বাড়ির প্রতিটি সদস্যের জন্য মায় কাজের পুরুষ ও মহিলাদের জন্য। সকলের মুখে তখন ফুটত হাসি। কিন্তু তাতেও কি গ্রামের সকলের শরীরে নতুন বস্ত্র উঠত? উঠত না। নগ্ন শরীরে থাকত অনেকেই। তারাও পুজো মন্ডপে পুজো দেখতে আসত। মন থেকে উপভোগ করতে পারত না তারা। সমবয়সী বাচ্চাদের শরীরের নতুন বস্ত্র দেখে তারাও কান্না কাটি করত। কিন্তু মা বাবার ইচ্ছা থাকলেও, সামর্থ ছিল না। তাদের জীবনে কান্নাই ছিল সম্বল।এভাবেই গ্রামের পূজা চলত।
সেই সময়ে পারিবারিক পূজার চল ছিল। সার্বজনীন পূজার চল ছিল না। পারিবারিক পূজাতে বেশ কদিন ধরে ভেয়ান হত। সব ছিল গুড়ের মিষ্টান্ন। মিষ্টির মধ্যে থাকত খাজা গজা বোন্দের নাড়ু টানা নাড়ু প্রভৃতি। এছাড়া অধিকাংশ বাড়িতেই তৈরি হত মিষ্টান্ন। ঐ সব মিষ্টান্নের মধ্যে থাকত নাড়ু সহ গুড়পিঠে বা আরশা। হত মুড়কি।বিজয়ার দিন বাড়িতে বিজয়া প্রনাম করতে এলে, সকলকে মিষ্টি দেওয়া হত। ঐসব মিষ্টি আনন্দের সাথে ভক্ষন করত বাচ্চারা।আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ওসব জিনিস হাতেই নেবে না, খাওয়া তো দুরস্ত।
সেকালের পূজো ছিল নিষ্ঠা আর আন্তরিকতাপূর্ণ। আনন্দ উপভোগ করার মাত্রা ছিল সর্বাধিক। ছিল সন্তুষ্টি। এখন আর ঐসব জিনিস চোখেই পড়ে না। সেই অনাবিল আনন্দ যেন অধরাই রয়ে গেছে।এখন আছে প্রদর্শনের খেলা, কিন্ত নেই শুধু মানসিক তৃপ্তি।

ভালো লাগলো
উত্তরমুছুনঅনুভবের ছোঁয়ায় অতীতের শারদ উৎসবের দিনগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।বেশ ভালো লাগল।
উত্তরমুছুনতপন কুমার চন্দ
আমাদের রাঢ় বাংলার সেই সব রীতিনীতি ছবি সেই ... খুব ভালো লাগল।
উত্তরমুছুনসব্যসাচী ধর
অমলিন স্মৃতি । মনের কুলুঙ্গিতে লক্ষ্মীর ঝাঁপি। দারুন হয়েছে । আপনার হাতে শব্দজাদু আছে। ভাবনায় আছে ফল্গুধারা ।
উত্তরমুছুননস্টালজিয়া ,তবুও চির নতুন ।অসাধারণ অসাধারণ।
উত্তরমুছুনভালো লাগলো।অত্যন্ত ভালো ।
উত্তরমুছুনছবির মতন। আলোক মণ্ডল।
উত্তরমুছুনসেকালের পুজোর অনুভব অনবদ্য।
উত্তরমুছুনসেকালের পুজোর অনুভব অনবদ্য। সেকালে ছিল দর্শন, আর একালে প্রদর্শন।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো। ছন্দা।
উত্তরমুছুন