ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ অথ মন্থরা কথা ও বাস্তবতা (পর্ব ১১) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

মন্থরা কথা ও বাস্তবতা 

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "মন্থরা কথা ও বাস্তবতা"। প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি।  আজ পর্ব - এগারো। - সম্পাদক)

(১১)

রামায়ন সামান্যতম পড়ে থাকলেও, মন্থরার নামটা ভেসে আসে।চরিত্র চিত্রন এমন নিপুপভাবে কাহিনিকার তুলে ধরেছেন যে, তার নাম উঠলেই, চোখের সামনে এক কুৎসিত নারীর মুখ ভেসে উঠে।কুরূপা ও পিঠে কুজ নিয়ে বয়স্কা মহিলার গঠন ও ব্যবহারে এক ঘৃণার ভাব পাঠকের মনে সৃষ্টি করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। এই কাজে কাহিনিকার সফল ভৃমিকা পালন করেছেন।

মনে প্রশ্ন জাগে, কে এই মন্থরা? কেনই বা তিনি অন্দরমহলে স্থান করে নিয়েছিলেন? বাল্মীকিকৃত রামায়নে মন্থরার পূর্ব জন্মের কথা কিছু উল্লেখ না করলেও পদ্মপুরাণ ও লৌকিক রামায়ণ স্রষ্টারা মন্থরার চরিত্র ও পূর্বজন্মের কথা আলোচনা করেছেন। মন্থরার জন্মের পিছনে যে কারনটি ছিল, তা হল মর্তে অসুর তথা অশুভশক্তিকে বিনাশ করা। আর সেই প্রেক্ষিতেই মন্থরার জন্মকথা উল্লিখিত আছে। প্রথম লোককথা হল, মন্থরা পূর্ব জন্মে ছিলেন এক যক্ষিনী। ভরতরাজ কৈকেয় শিকার করার সময় হরিণরূপী যক্ষিনী সন্তানকে হত্যা করেন। ঐ যক্ষপুত্র ছিল যক্ষিনীর জামাতা।যক্ষিনীরূপী মন্থরা রাজার কাছে জামাতার প্রান ভিক্ষা করলে, তিনি তাকে আঘাত করেন পিঠে। আর সেই সময় যক্ষিনীরূপী মন্থরা রাজাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেমন জামাতার মৃত্যুতে কাতর হয়ে প্রান ত্যাগ করছেন, তেমনই তিনিও একইভাবে  তার জামাতার মৃত্যুর কারন হবেন। এই মন্থরা পরবর্তীতে মনুষ্য জন্ম নিয়ে কৈকয় রাজের জামাতার মৃত্যুর কারন হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় লোকগাথা হল, তিনি ছিলেন স্বর্গের অপ্সরা, নাম ছিল দুন্দুভি। ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর অনুরোধে তিনি মন্থরা হিসাবে জন্ম নিয়ে অসুর বধের কারন হয়েছিলেন।

তৃতীয় লোকগাথা হল, ব্রহ্মার অনুরোধে স্বয়ং সরস্বতী মন্থরার কন্ঠে অবস্থান করে কৈকেয়ীকে কটু কথা বলে উত্যক্ত করেছিলেন। এটা তো গেল মন্থরার পূর্বজন্মের কাহিনি। এবার আসা যাক মর্তে জন্ম নেবার পর কুরূপা মন্থরা ধাত্রীমাতা হিসাবে কৈকয় রাজার রাজত্বে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলেন। রাজ দরবারে তার প্রবেশ ঘটে কৈকেয়ীর জন্মলগ্নে। তারপর থেকে মন্থরা রাজবাড়িতেই কৈকেয়ীর খাস দাসী হিসাবে থেকে যান। দশরথের সাথে কৈকেয়ীর বিবাহের সময় কৈকেয়ীর সাথে তিনি অযোধ্যাতে আসেন। সেই কালে কোন মেয়ের বিবাহের সময় শ্বশুরালয়ে দাসী আনার প্রথা ছিল। রাজ অন্তপুরে খাস দাসী হিসাবে মন্থরা থেকে যান। কৈকেয়ীর সদা সর্বদা দেখাশোনা ছাড়াও, বিভিন্ন পরামর্শও দিতেন। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষন। রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক যখন চুড়ান্ত, সেই সময় কৈকেয়ীর কানে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করেন। রামচন্দ্র রাজা হলে, ভরত আর তার কি পরিণতি হবে,  সেই ব্যাপারে বিভিন্ন মন্ত্রণা দিলে, কৈকেয়ীর মনও সায় দেয়। উদ্দেশ্য ছিল রাজা দশরথ যখন দেবাসুরের যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রথ ভেঙে পড়েছিল, তখন কৈকেয়ী রথ সহ দশরথকে অক্ষত অবস্থায় অযোধ্যাতে এনেছিলেন। আর সেই সূত্রে দশরথ তাঁর রাণী কৈকেয়ীকে দুটি বরদান করতে চেয়েছিলেন। কৈকেয়ী সেই সময় সেই বর না নিয়ে পরে নেবো বলে রেখেছিলেন।

যেহেতু মন্থরা কৈকেয়ীর খাস দাসী ছিল, এবং সমস্ত কিছুই জানতেন, তাই মন্থরা সূযোগের অপেক্ষাতে ছিল। রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেকের পূর্বেই মন্থরা সেই মোক্ষম চালটি দিলেন। মন্থরার ব্যাখ্যা ছিল নিরপত্তা নিয়ে।

প্রথমতঃ রামচন্দ্র রাজা হলে কৈকেয়ী নন, কৌশল্যাই বেশী উপযোগী হয়ে উঠবেন। দ্বিতীয়তঃ ভরত নয়, লক্ষ্মণই হবেন পরের ব্যক্তি। তৃতীয়তঃ ভরত কোনদিনও অযোধ্যার সিংহাসনে বসতে পারবেন না। চতুর্থতঃ রামচন্দ্র রাজা হলে তাদের সুরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অবশ্য মন্থরা নিজের সুরক্ষার দিকটিও ভেবেছিল। তখন যে নিরাপত্তা ও মন্ত্রণা দেওয়ার সূযোগ ছিল, সেটি একেবারে লুপ্ত হবে।এছাড়াও এই বার্ধক্যে এসে, তার আর কোন কাজ করার ক্ষমতা ছিল না। যদি ভরত রাজা হয়, তাহলে সবদিক থেকেই সুরক্ষিত থাকবেন।

আমরা যদি এটাকে এক প্রারব্ধ কিংবা অতীত জীবনের ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে এটাই ছিল ভবিতব্য। কিন্তু পাঠককুলের একটা অভক্তি কিংবা অশ্রদ্ধা ঝরে পড়ে অদ্যাবধি মন্থরা কৈকেয়ীকে স্মরণ করিয়ে দেয় রাজামশাইয়ের দেওয়া বরের কথা। আর সেই বর প্রার্থনা করার উপযুক্ত সময় ছিল রামচন্দ্রের অভিষেক গ্রহনের আগেই। একবার রামচন্দ্র সিংহাসনে আসীন হলে, দশরথের আর কোন ভূমিকা থাকবে না। অতএব পুত্রের কথা আর নিজের কথা চিন্তা করে, কৈকেয়ীর এই বর চেয়ে নেওয়ার আদর্শ সময় ছিল ঐ সময়টাই।

তবুও মনে প্রশ্ন জাগে, এই মন্থরা চরিত্র কি রামায়নেই দেখা গিয়েছিল, নাকি এরকম মন্থরাদের ভূমিকা বর্তমান সময়েও চলে আসছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিন্তু এই ধরনের মন্থরার ভূমিকা কিছু কম নেই। যৌথ পরিবার ভেঙে ফেলার পেছনে, এদের ভূমিকা আজও পরিলক্ষিত হয়। বিধবা অল্পবয়সী ননদ কিংবা প্রতিবেশী মহিলারাও নীরবে এই কাজটি করে চলেছে। এই আবহেই যৌথ পরিবার টুকরো হয়ে ছোট পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটা যেন একটা ভবিতব্য।

চলবে

৫টি মন্তব্য:

  1. অনেক নতুন তথ্য পাওয়া গেল। দীনবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন
  2. শ্যামশঙ্কর বরাট১২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৮:১২ PM

    উপযুক্ত শব্দচয়ন ও সুললিত ভাষায় , বীর রসাত্মক এক চিরাচরিত আখ্যানের কাহিনী বা উপাখ্যানের অংশ নিজের ভাব ভাবনায় বাস্তব সত্যে জীবন দান করে পাঠকের মননে অসাধারণ ভাবে বিন্যস্ত করেছেন ,সাহিত্যিক ও গবেষক অতনু দা ।অসাধারণ ।

    উত্তরমুছুন
  3. অপূর্ব ।অতি অপূর্ব ,

    উত্তরমুছুন
  4. অপূর্ব । এটি অপূর্ব।

    উত্তরমুছুন
  5. নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেল -- সব্যসাচী ধর

    উত্তরমুছুন