অগ্নিশপথ
সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ' । প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসছে সেই অগ্নিযুগের কাহিনি এবং আগ্রহী পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি। আজ ষাট পর্ব - সম্পাদক ।)
ছেন্দাপাথর নামের দুর্গম বন পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ প্রান্তভূমি বেশ মনোরম, শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। চারপাশ ছোট বড় মাঝারি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বড় তুং পুর্ণাপানি গ্ৰামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে দাঁড়ালে দুটো জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্কুলের পাশ দিয়ে সোজা দক্ষিণ পশ্চিমে একটি সাবেক আমলের সড়ক চলে গেছে একবারে গাড়পাহাড়, গঞ্জুয়াম, ডুংরিডাঙা, ডিম্পাডাঙা, চাতরাডাঙা, লাহেড়গোড়া, মাঝিডি, মহুলডাঙা সহ ছোট ছোট আদিবাসী, মাহাতো সহ অন্যান্য জনজাতি অধ্যূষিত গ্ৰামগুলো। । পাহাড়ের ওই পারে ঝাড়গ্ৰাম, বেলপাহাড়ির সীমানা। আরও কিছুটা দূরে ঝাড়খণ্ড সীমানা। এই গাড়পাহাড়ে ছিল কোলকাতার 'গৌরী ইন্ডাস্ট্রি'র উলফ্রাম প্রসেসিং ইউনিট। কস্মিনকালের একটি সাইনবোর্ড আজও তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। দূর থেকে দেখা যায় পাথর কোয়ারি ও তার খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন। এই বিপুল পরিমাণ খনিজ পাথরগুলো সছিদ্র বলে স্থানীয় মানুষ নামকরণ করেছেন - ছেঁদাপাথর। সম্পদশালী এই বিস্তীর্ণ পাহাড়িয়া অঞ্চল রেহাই পায়নি মুনাফাখোর ইংরেজ কুঠিয়ালদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে। অরণ্য, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের পাশাপাশি এখানকার কায়িক শ্রমদানে দক্ষ মানবসম্পদকে নিজেদের স্বার্থে যথেচ্ছাচার ও প্রতারণা করে চলত। সস্তায় শ্রম শোষণ করে চলত তাদের কুট কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে। এখানে পাওয়া যেত উৎকৃষ্ট মানের লাক্ষা ( গালা শিল্পের কাঁচামাল), অতি উচ্চমানের মালবেরি শ্রেণীর রেশম - তষর গুটি। এতো প্রাকৃতিক দুর্গমতা সত্ত্বেও এখানে নীলকুঠি গড়ে তুলেছিল অত্যন্ত সুকৌশলে। সরলপ্রাণ অরণ্যবাসীদের উপর নেমে এসেছিল নির্মম শাসন, শোষণ ও নির্বিচারে অত্যাচার। অন্যদিকে ফুলকুশমা হয়ে আসার পথে পড়বে সরপালি রসপাল, যাতাডুমুর, শুশুনিয়া মাঝগেড়িয়া, সিংলহর, ঘোড়াডুবা, সাতনালা, বীরকাঁড়, ধজুড়ি সহ লাগোয়া বেশ কিছু আদিবাসী গ্ৰাম। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখা জরুরি ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এখানে যে একটি "টার্গেট প্র্যাকটিস সেন্টার" গড়ে উঠেছিল সেটা শুধু একদিনে হয়নি। এর পিছনে ছিল মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। বিপ্লবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ দিয়ে স্থানীয় দেশপ্রেমী মানুষ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জানপ্রাণ দিয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এখানেই সর্বপ্রথম চরম অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বীর বিদ্রোহী - রাঙ্গাই কিস্কু । তাঁর বিদ্রোহ ছিল কুঠিবাড়ির নির্মম ও অমানবিক নির্যাতন ও শারীরিক লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে। বন পাহাড় কেঁপে উঠেছিল অমিত তেজ সম্পন্ন রাঙ্গাইয়ের গর্জনে। অমানুষিক নির্যাতনের শিকার এই সব দেহাতি মানুষ শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাঙ্গাইয়ের। ঘোড়াডুবা, সাতনালা এলাকার মানুষ সাবেক অস্ত্রের পাশাপাশি একনলা - দোনলা আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণে ছিলেন অত্যন্ত পটু । সঙ্গে ছিলেন অম্বিকানগর পরগণার রাজা (পত্তনিদার) বিপ্লবী রাইচরণ ধবল দেব। তিনি বারিকুলের ছেন্দাপাথরের বীরবাঁধ লাগোয়া নির্জন প্রান্তরে আসতেন ঘোড়সওয়ার হয়ে। তিলতিল করে গড়ে তুলছিলেন বিপ্লববাদের যজ্ঞশালা। তাঁর শশুরবাড়ি ছিল ধলভূমগড়ে। সেখান থেকে আসতো আর্থিক সাহায্য ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র। এখানে বিপ্লববাদীদের গুপ্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার প্রেক্ষাপট ছিল অনেক গভীরে। ব্রিটিশ সরকার এখানকার ভূম পরগণা বা রাজ্যের ভূমি ব্যবস্থা এবং রাজস্ব নীতিকে ভেঙে তছনছ করে দিল নিজেদের আখের গোছাতে। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ শাসকরা দেওয়ানি লাভের পরই আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে হাত দিল। ভূমি সংস্কারের কাজ এতো সহজ। কয়েকটি জেলার দুই তৃতীয়াংশ জমি ছিল গভীর বনভূমি। মূলত দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলকে সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তাদের। ১৭৬৭ র কিষাণ অসন্তোষে (কুট বুদ্ধি সম্পন্ন ব্রিটিশের চোখে চূয়াড় বিদ্রোহ) জেরবার জঙ্গলমহল। তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে নয় মহলের ভূম রাজ্যগুলো। সেবা ভিত্তিক ভূমি দান ব্যবস্থাকে ধূর্ত ও শঠ ইংরেজ তছনছ করে দিয়ে স্বত্ব বিলোপ কিম্বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে জমিদার, সামন্তদের ভাতে মারার অপকৌশল গ্রহণ করে। চারিদিকে দুর্বার গতিতে আন্দোলন গড়ে উঠলো। রাজা জমিদারদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে কুঠিবাড়ি আক্রমণের জন্য রূপরেখা রচনা করেন। কর্ণগড়ের রানি শিরোমনি, রাইপুরের রাজা দুর্জন সিংহ ছাড়াও অম্বিকানগরের জমিদার অনন্ত ধবল, রসপালের (বর্তমান শ্যামসুন্দরপুর) জমিদার সুন্দর নারায়ণ সহ একাধিক রাজা, জমিদার দুর্বার গতিতে আন্দোলন গড়ে তুললেন।
চলবে

আজকে প্রকৃতি বর্ণনা করা হয়েছে
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়