অগ্নিশপথ
"স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ' । প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসছে সেই অগ্নিযুগের কাহিনি এবং আগ্রহী পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি। আজ তেষট্টি পর্ব - সম্পাদক ।)
কিষাণ অসন্তোষ এতো বড় বিদ্রোহের রূপ নেবে সেই ধারনা ছিল না কুঠিয়াল ইংরেজ শাসকদের। তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। প্রশাসনের ট্রিগার নিজেদের হাতে রাখার জন্য প্রশাসনিক কাঠামোর রদবদল ও সংস্কার, প্রশাসক বদল ও নতুন নিয়োগ শুরু করল। দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য সামরিক বিভাগে বিশেষ ফৌজ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়। ১৭৬৭ সালে জ্বলে ওঠা বিদ্রোহের আগুন প্রশমিত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জন গ্ৰাহাম সেনাপতি ফার্গুসনকে পাঠাল জঙ্গলমহলের জেদি ও অবাধ্য জমিদারদের জব্দ করতে। সবচেয়ে বড় বাধা এসেছিল রাইপুরের রাজা দুর্জন সিংহ, কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি, বগড়ির গোবর্দ্ধন দিকপতি প্রমূখের কাছে । ফার্গুসন ধলভূমগড়ের উদ্দেশ্যে সেনা অভিযান ও সেনা সমাবেশ করলে ভয়ঙ্কর সমস্যায় ফেলে দিয়ে গভীর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছিলেন । ধলভূমগড়ের রাজা জগন্নাথ ধল । ধূর্ত ও শঠ ইংরেজ কুটকচাল করে জগন্নাথের বদলে তাঁর ভাই নিমু ধলকে জমিদার পদে অভিষিক্ত করে। এই খবর পেয়ে আরও ক্ষিপ্ত ও ভয়ঙ্কর ইংরেজ বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন জগন্নাথ। ইংরেজ তাদের চরম ভুলটা বুঝতে পারলো অচিরেই। বিদ্রোহ আর একতরফা জঙ্গী আন্দোলন গড়ে উঠলে প্রমাদ গুনতে হল ব্রিটিশ শাসকদের। জগন্নাথ ও তার বাহিনীকে ঠেকাতে ১৭৬৮ খ্রি: নতুন সেনাপতি ক্যাপ্টেন মরগ্যানকে পাঠানো হলো। মিঃ মরগ্যান এখানকার বিদ্রোহের মাটিতে পা দিয়েই বুঝেছেন এইভাবে জব্দ করা তো দূরস্ত , গোটা জঙ্গলমহলে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়বে। উপর মহলে শান্তি প্রস্তাব পাঠানো হল। ১৭৭৭ খ্রি: জগন্নাথ ধলকে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া হল । ক্যাপ্টেন মরগ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলেন-"The whole country up in arms against the British authority ........"(J.C.price. notes on History of Midnapore - p 58.
ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট রাজা জমিদারদের জোটবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টি উপর মহলে জানিয়ে দিলেন । রাজা, জমিদার জোতদার এমনকি পুরুষানুক্রমে চাষ করে আসা পাইক, বরকন্দাজগণ স্বেচ্ছায় আন্দোলনে নামে। কুখ্যাত ভূমিসংস্কার আধিকারিক মিঃ জে.সি .প্রাইস এই কৃষক - রাজা জমিদারদের যৌথ আন্দোলনের নাম দিলেন" চুয়াড় বিদ্রোহ" । অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়েছেন নিজের লেখা বইয়ে।মেদিনীপুর ( বর্তমান ঝাড়গ্ৰাম ), বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার বৃহত্তর জঙ্গলমহল জুড়ে শুরু হয়ে গেছে তীব্র আন্দোলন। ১৭৯৮-'৯৯ মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশ ও বাঁকুড়ার দক্ষিণাংশের নানা প্রান্তে চলছে বিদ্রোহ, অগ্নিগর্ভ আন্দোলন। এরই মাঝে বগড়িতে শুরু হয়েছে নায়েক বিদ্রোহ । এই ধারাবাহিক আন্দোলন, বিদ্রোহের মাঝেই জন্ম নিল - ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি । কিষাণ অসন্তোষের আগুন নেভানোর আগেই জ্বলে উঠলো বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের আগুন।
চলবে

খুব ভালো চলছে। সবার পড়া উচিত এই ধারাবাহিক।অসংখ্য ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়