ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র (পর্ব ১৬) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

 শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র 

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "শত্রুঘ্ন কথা ও এক উপেক্ষিত চরিত্র" । প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - ষোলো - সম্পাদক)


আমরা রামায়ন পাঠ করে শুধু বিশেষ কয়েকটি চরিত্র নিয়েই আলোচনা করি। অনেক চরিত্র অনালোকিত থেকে যায়। সেভাবে পাদ প্রদীপের আলোয় আসে না। আজ এই চরিত্র নিয়ে আলোচনা করছি।

শত্রুঘ্ন ছিলেন রাজা দশরথের কনিষ্ঠ পুত্র, তাঁর মাতা ছিলেন সুমিত্রা। লক্ষ্মণ ছিলেন শত্রুঘ্নের সহোদর ভ্রাতা। আর ভরত ও রামচন্দ্র ছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। পুরাণ অনুযায়ী তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের অবতার বলে বর্ণনা করা হয়। তিনিও ছিলেন একজন বীর ও ন্যায়ের প্রতীক। শিক্ষা সমাপ্তে তিনি একজন রাজ হিতৈষী হিসাবে রাজার আদেশ পালন করেছিলেন।কোনদিন তার অন্যথা হয়নি।  শত্রুঘ্নের বিবাহ হয়েছিল সীতার খুড়তুতো বোন শ্রুতকীর্তির সাথে। তাঁর দুই সন্তান, সুবাহু ও শত্রুঘাতী। এই শত্রুঘ্নের বিভিন্ন নামের মধ্যে একটি নাম ছিল বেশ প্রচলিত। তাঁর নাম ছিল রিপুদমন। রিপুদমনের প্রধান গুনের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রতিটি কার্যে। লোভ, অন্যায়, হিংসা, বিদ্বেষের কোন ছায়া তাঁর চরিত্রে প্রকাশ পায়নি। তাঁর এইসব গুনের বর্হিপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই রামের অবর্তমানে অযোধ্যা নগরীতে ন্যায়ের শাসনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমান করা। রামায়নে দশরথের চার পুত্রের সখ্যতা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু রামচন্দ্রের সাথে লক্ষ্মণ ও ভরতের সাথে শত্রুঘ্নের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ছিল একটু বেশিই। রামচন্দ্রের বনবাসকালে ভরতের সাথে শত্রুঘ্ন একদিকে পরিবারের দেখভাল আর অন্যদিকে রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভরত একইসাথে নন্দীগ্রাম ও অযোধ্যা শাসনের ভার লাভ করেছিলেন।আর ঐ সময়ে প্রজা পালনে যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন শত্রুঘ্ন। রামায়নে রামচন্দ্রের অবর্তমানে এমন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি যেখানে রাজ্য পরিচালনাতে কোন প্রশ্নচিহ্ন আমাদের চোখে পড়েছে। রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখার মত দুরূহ কাজও তিনি ভরতের সাথে যৌথভাবে পালন করেছিলেন।কোন অবস্থাতেই অযোধ্যা নগরীর নিজেরা রাজা বলে ভাবতেন না।ভরতের মত শত্রুঘ্নও রামচন্দ্রের দাস ভাবতেন। সাধারন অবস্থায় শত্রুঘ্নের মধ্যে ক্রোধের বর্হিপ্রকাশ আমরা দেখিনি। শুধু একবার তাঁর ক্রোধের প্রকাশ ঘটেছিল মন্থরার প্রতি কটুক্তি করা। এ ছাড়া আর কোন অবস্থাতেই তাঁর চরিত্রে কলঙ্কিত কোন অধ্যায় আমরা দেখিনি।

শত্রুঘ্ন যে বীর ছিলেন তার প্রমাণ আমরা পেয়ে থাকি। রামের নির্দেশে শত্রুঘ্ন মধুপুর রাজ্যের অসুর সম্রাট লবনাসুরকে বধ করে রাজ্য অযোধ্যার দখলে আনেন। রামচন্দ্র এই কার্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ঐ মধুপুর রাজ্যের রাজা ঘোষনা করেন। শত্রুঘ্ন ঐ রাজ্যের নামকরণে পরিবর্তন আনেন।নতুন নাম হয় মথুরা। এহেন শত্রুঘ্নের জন্যই কিন্তু রামচন্দ্র চৌদ্দ বছর বনবাস থেকে ফিরে এসেও নিজের রাজ্যে ন্যায়ের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হয়ত প্রজাপালক হিসাবে রামচন্দ্রের নাম উচ্চারিত হয় এককভাবে, কিন্তু শত্রুঘ্ন ও ভরতের ভূমিকা ছিল মুখ্য। শত্রুঘ্নের মধ্যে কোনদিন কোন বৈরিতা লক্ষ্য করা যায়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই উপেক্ষিত নায়ক পর্দার পেছনেই থেকে গেছেন। কথিত আছে যে, শত্রুঘ্নও নাকি সরযূ নদীতে রামচন্দ্রের মতই বিলীন হয়ে যান।

চলবে

----------------------------------------------------------------------------------------

সফরনামা

আসছে বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়ের নতুন ধারাবাহিক ‘সফরনামা'

চুরাশি হাজার পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় 'শহর নগর ডট কম' ব্লগজিন এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ওয়েব পত্রিকার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রয়াগরাজ নিবাসী বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়। তাঁর বেশ কিছু মূল্যবান লেখায় এই পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত যে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বহুচর্চিত ও উচ্চ প্রশংসিত  গ্রন্থ 'মহাকুম্ভ ইতিহাস' এই বল্গজিনেই ২০২৫ এর মহাকুম্ভ চলাকালীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অরুণ কুমার রায় পুনরায় আসছেন তাঁর নতুন ধারাবাহিক  ‘সফরনামা’ নিয়ে। জীবনের চলার পথে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসা লেখকের কলমে উঠে আসছে তাঁদের কথা।  জানি না তাঁর এই 'সফরনামা' শেষ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসের আকার নেবে কি না। এই ধারাবাহিক হতে চলেছে তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনার এক অনন্য কোলাজ।  জীবনের এই চলার পথে কত কথা, কত মানুষের আনাগোনা থাকবে। সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নায় ঘেরা মানুষের এই জীবন-সফর। আশা রাখি, লেখকের কলমের জাদুতে সেই নীরব সফর আরও সরব ও সরস হয়ে উঠবে। আগামী ৫ নভেম্বর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। সঙ্গে থাকুন এবং আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন। - সম্পাদক।)

------------------------------------------------------------------------------------------

৩টি মন্তব্য: