ধারাবাহিক প্রবন্ধঃ অগ্নিশপথ - ৬২ () সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

অগ্নিশপথ

সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(স্বাধীনতা' - শৈশব থেকে এই একটা শব্দ যে আবেগ, যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, দিনে দিনে তা কেমন যেন বদলাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ অধরাই থেকে যায়। এখন আবার কে কতো বড় সেক্যুলার তার প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় ধর্মের দণ্ড হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অগ্নিযুগের আন্দোলনকে কলুষিত করছে, রাষ্ট্রের পরিবেশকে চরম আঁধারপথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অন্ধকারময় সময়ে একটু আলোর সন্ধানে আমরা ফিরে দেখি অগ্নিযুগের সেই আগুন পাখিদের কর্মকাণ্ড। গত  বছরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ধারাবাহিক প্রবন্ধ - 'অগ্নিশপথ' ।  প্রিয় সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসছে সেই অগ্নিযুগের কাহিনি এবং আগ্রহী পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি। আজ বাষট্টি পর্ব - সম্পাদক ।) 

আগের আলোচনায় বলেছিলাম ১৯০২ এ শুরু হওয়া সিক্রেট মিশনের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি দাঁড়িয়ে ছিল শক্ত ভিত্তিভূমির উপর। ব্রিটিশদের চক্রান্তে উৎখাত হওয়া রাজা,জমিদার, সামন্ত ও জোতদারগণ জঙ্গলমহলের মাটিতেই প্রথম প্রত্যাঘাত হানে কালাকানুনের বিরুদ্ধে। সংঘবদ্ধ হন "নয়মহল" এর রাজা, জমিদার, পত্তনিদার ও জোতদারগণ। বাংলা বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভের পরই একতরফাভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ক্ষমতা কায়েম করে। প্রথম ধাপেই কোম্পানি রেসিডেন্ট নিয়োগ করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে সামরিক বাহিনী নিয়ে ফার্গুসনের নেতৃত্বে জন গ্রাহাম চলেছে ঝাড়গ্রাম, ধেড়ুয়া, বলরামপুর সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে সেনা শিবির স্থাপন করলো ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার হাল হকিকত জানতে। ঝাড়গ্রামের পর ধলভূমের সুপুরে সেনা ছাউনি ফেলল। এখানকার সামন্তভূম (ছাতনা), ধলভূম (সুপুর ও অম্বিকানগর), জমিদারকে ডেকে পাঠানো হল এবং তাদের হাত করল কোম্পানি। তাদের খাজনা ধার্য করা হল - ১) ছাতনা - ৮৭৯ টাকা ১১ আনা, সুপুর পরগণা - ৫০ টাকা এবং অম্বিকানগর পরগণার- ৩১১ টাকা । ছাতনার জমিদার কোম্পানি নির্ধারিত খাজনা মিটিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানির আর্জি মতো এক হাজার পাইক পাঠিয়েছিলেন কোম্পানির সাহায্য হিসেবে। শুধু ব্যতিক্রমী হিসেবে রয়ে গেলেন রাইপুরের জমিদার প্রবল প্রতাপশালী - দুর্জন সিংহ ও অম্বিকানগরের জমিদার অনন্তলাল ধবলদেও।‌ অম্বিকানগরের জমিদার প্রথমে খাজনা মিটিয়ে দেওয়ার কথা বললেও তিনি ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করলেন। তিনি শুরু করলেন কুঠিবাড়ি, ডাক বিভাগের মেইল ব্যাগ লুঠ। রাজস্ব বিভাগ, আদায়কারী, নায়েব মূল টার্গেট হয়ে উঠলো। জঙ্গলমহলের মাটিতে পা রেখেই ব্রিটিশ সামরিক কর্তা ও উচ্চপদস্থ প্রশাসকবৃন্দ ভূমি সংস্কারের নামে লুঠতরাজ ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করে দিল। ১৭৮৬ সালে বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে এলো লর্ড কর্ণওয়ালিশ। সে আবার এক কাটা উপরে উঠে ১৭৮৯-'৯০ সালে চালু করে দিল দশশালা বন্দোবস্ত। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে দিল। যে সমস্ত আইন বা ভূমি সংস্কার বিধি চালু করছে তার পিছনে রয়েছে শোষনের মহা দূরভিসন্ধি। সাঁড়াশি অভিযানের মতো জমিদার, জোতদার কিম্বা বড় রায়তদের সঙ্গে সাধারণ কৃষকদেরও শোষণের যাঁতাকলে ফেলে দিল। বর্ধিত হারে খাজনা না দিলে সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি থেকে উচ্ছেদ করা হবে জমিদারদের। ঘটলোও তাই। বিপ্লবী রাজা রাইচরণের কাকা পত্তনিদার নিমাইচরণের আমলে খাজনা বকেয়া পড়ায় সূর্যাস্ত আইনের কোপে পড়ে জমিদারি নিলাম হয়ে গেল। প্রথমে কিনেছিলেন সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর। তারও কিছুদিন পর কেনেন শরৎ কামিনী দেবী। সবশেষে তিনি ছেড়ে দিলে জমিদারি কিনেছিলেন দ্বারভাঙার মহারাজ কামেশ্বর সিং। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো,- হীড়বাঁধ থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল হাঁসাডাঙ্গে বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ গোস্বামীদের (নরেণ গোঁসাই)  কাছারি বাড়ি ছিল। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ গোস্বামীর নামে ছিল এই জমিদারি। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পনা এমনকি আত্মগোপন করার উপযুক্ত স্থান এই কাছারি বাড়িটি । 

সাবেক আমলের ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করায় ক্ষমতা খর্ব করা হল জমিদারির এবং তাঁদের সম্মানজনক দায়দায়িত্ব। শেষ হয়ে গেল বাংলার চিরায়ত সেবা ভিত্তিক ভূমিদান ব্যবস্থা। জমিদারি ব্যবস্থায় ছিল পাইক বরকন্দাজদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা বংশানুক্রমে এতদিন সেবার বিনিময়ে নিষ্কর পাইকান জমি ভোগদখল করে আসছিল। এই কালা কানুনের ফলে বর্ধিত হারে খাজনা দিতে হবে সাধারন এই প্রজাকুলকে । তাদেরও ক্ষমতা খর্ব ও গুরুত্বহীন করে দিল । চারিদিকে জোট বেঁধে তীব্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু হল জঙ্গলমহলে ।

চলবে

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো আলোচনা করেছো আজ।এগিয়ে চল এভাবেই।
    অতনু চট্টোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন