শারদোৎসব ১৪৩৩ঃ গল্প - কেতকী বাগচী

শহর নগর শারদোৎসব ১৪৩৩

শারদোৎসব

কেতকী বাগচী 

নবমী নিশিরে, তোর দয়া নাই/ এত করে সাধিলাম, তবু হইলি ভোর …।

গানের সুরটা ভেসে আসছে পিছন ফিরে দাঁড়ানো প্রিয়াঙ্গীর গলা থেকে । সকালের আলোয় উজ্জ্বল দেওয়াল জোড়া কাঁচের জানালার বিপরীতে দাঁড়ানো পিঠ ছাপানো চুল আর তার নীচে মোডাল সিল্কের ফ্লেয়ার্ড  লং স্কার্টের ফল নিয়ে দারুন সুন্দর দেখাচ্ছে প্রিয়াঙ্গীর স্লিম চেহারাখানা । 

গত রাত্রি জাগরণের পরও ভোর ভোর স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে ও ।

এমন সোনালী সকালে তুই কান্নাকাটি শুরু করলি কেনরে প্রি ? ডিভানে আধশোয়া অবস্থায় কফির কাপ হাতে নিয়ে সুচিরা কথাটা ছুঁড়ে দিল । তার চোখে এখনো শেষরাতের ঘুম লেগে, গায়ে রাতপোষাক । 

তুই কি রে সু ! মা চলে যাবেন যে আজকে সব আনন্দের আলো নিয়ে । কান্নাকাটি করবে না তো কি ? মনামি ভ্রুকুটি করল । সবাই কি তোর মত হৃদয়হীন হবে নাকি ? 

মনামিও রাত পোষাক ছেড়ে  পরেছে দারুন সুন্দর একটা থ্রী ডি মভ ফ্লোরাল টপ আর তার সঙ্গে সলিড অলিভ রঙের হাওয়াই কেপ্রি । পার্মড চুলের গোছা মাথার ওপরে তুলে ক্লাচার দিয়ে আঁটা । 

এর মধ্যে হৃদয়ের কথা আর ঢোকাস না মন । এই যে চারটি দিনরাত্রি ধরে দারুন দারুন সব আউট ফিট গায়ে চাপিয়ে জমিয়ে মস্তি করলি, সব ফুরিয়ে গেল ? আমাদের তো এখনো মস্তির আরো প্ল্যান বাকি  আছেরে …ছুটির আর যে কটা দিন আছে, একেবারে চুটিয়ে এনজয় করবো ।

নারে, সবটাই মস্তি নয় রে সু । পূজো আসছে আসছে, যতক্ষণ এই ভাবটা রয়েছে, ততক্ষণই সুখ । চারটে দিন কেমন করে কেটে গিয়ে পূজো চলেও গেল । এখন যেন আবার মনখারাপের পালা । মনামি তাও করুন গলায় বলে । 

উঃ ! তোদের এই ন্যাকামি আমার সহ্য হয় না । সুচিরা ঝাঁঝিয়ে ওঠে ।

সত্যি সত্যি কি মা আসছে আর চলে যাচ্ছে নাকি ? মা আবার কারো আসে যায় ? মা তো তার নিজের জায়গাতেই থাকে । আমরাই তো আসা যাওয়া করি । এই যেমন আমরা চারজনে চার জায়গা থেকে এসে একত্র হলাম, আমি দিল্লী থেকে, মন কলকাতা থেকে, প্রি গুয়াহাটি থেকে, ধ্রু নিউ জার্সি থেকে, আমদের মায়েদের কাছে  ।

না, ইনি হলেন জগজ্জননী মা । স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে এসে কদিনের জন্য থেকে অসুর নিধন করলেন, তারপর আমাদের অনাথ করে দিয়ে চলে গেলেন । মন খারাপ হবে না ? মনামি বলল। 

তাই ? অসুর নিধন করলেন ? কখন করলেন ? ধর্ষনের আগে, না পরে ? না ধর্ষনের সময় ?

দুম করে যেন বোমা ফাটল ঘরের ভিতর । চমকে গান থামিয়ে ঘুরে তাকাল প্রিয়াঙ্গী । ধ্রুবা ঘরের এক কোনে বসে চুপচাপ নিজের মনে ল্যাপটপে কাজ  করছিল, চমকে মাউস থামিয়ে চোখ তুলে তাকাল সুচিরার দিকে ।

প্রিয়াঙ্গীর মুখে ব্যথার ছায়া । 

একটা সামান্য গান থেকে তুই এতদূর চলে গেলি সু ! বাঙ্গালীর এই দুর্গা কিন্তু তোর আমার মতই সাধারন মেয়ে । বছরে একবার সে সপুত্র-কন্যা মায়ের কাছে এসেছে, মার মন কি চায় তাকে ছেড়ে দিতে ? সেই বেদনা থেকেই এই গানের জন্ম । 

ধ্রুবা এবার মুখ খুলল । 

বাঙ্গালী মায়েরা এখন আর সেই চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদার অবস্থায়  নেই রে প্রি । আমাদের মায়েরা ছিঁচকাঁদুনে হলে কি আমরা মেয়েরা এই পজিসানে আসতে পারতাম ? 

 নিউ জার্সিতে একটা কন্সালটেন্সি ফার্মে কাজ করে ইঞ্জিনীয়ার ধ্রুবা । নিউ টাউনের এই আটতলার টু বিএইচকে ফ্ল্যাটটা তারই । 

আর, আমরাও তো সুযোগ পেলেই মায়েদের কাছে আসি, দেখাশোনা করি । প্রির মা তো প্রির কাছেই থাকেন । প্রির দাদার কাছে না । সুচিরা বলল ।

প্রিয়াঙ্গী গুয়াহাটিতে কলেজে অধ্যাপনা করে ।

আমার কাছে মা দুর্গা কিন্তু নারীশক্তির প্রতীক । আমরা মেয়েরা কত প্রেরণা পাই ওই শক্তিরূপার কাছে । মনামি তার যুক্তির থেকে সরেনা ।

কিসের প্রেরণা ? শত্রু নিধনের ? সুচিরার গলায় প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গ ।  

অবশ্যই । আমাদের মেয়েদের তো ছোট থেকেই পদে পদে কত শত্রুর সন্মুখীন হতে হয়।

আচ্ছা, আমাদের মেয়েদের কি সারাজীবন এই শত্রু মোকাবিলা, শত্রু নিধন করেই বাঁচতে হবে ? এ কি রকম ব্যবস্থা ! মেয়েরা নির্ভয়ে এই পৃথিবীর মুক্ত হাওয়াতে একটু সহজভাবে শ্বাস নিতে, একটু হাসতে, খেলতে, বেড়াতে, কাজ করতে পারবেনা ? সমাজ কি চায় ? ধর্ষক, খুনী থাকুক, আর মেয়েরা তাদের নিধন করে পূজা পাক !  

একেবারে পেশাদার সাংবাদিকের সুরেই যেন সুচিরা এক নিঃশ্বাসে তার ক্ষোভ ঝরায় ।

শ্ত্রু কি শুধু বাইরেই থাকে ? ভিতরেও তো কত শত্রু । লোভ কাম ক্রোধ মাতসর্য হিংসা… মহিষাসুর হলো… 

ষড়রিপুর কথা বলছিস ? প্রিয়াঙ্গীকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ধ্রুবা বলে ওঠে ।

রিপুদের শেষ করলে তো জীবনই চলবেনা রে মন । মানুষের জন্মগত চালিকাশক্তি ওগুলো । নিধন নয়, ওদেরকে রেজিমেন্টেড ওয়েতে চালনা করতে হবে গন্তব্যের অভিমুখে । লাগাম থাকবে মানুষের শুভবুদ্ধির হাতে । 

তাহলে ? তুই কি বলতে চাস ধ্রু ? এই পূজা, এই উৎসবের কোন মূল্য নেই ? তুই আসিস কেন তাহলে পূজোর সময়  নিউ জার্সি থেকে উড়ে প্রতিবছর এই কলকাতায় ? আহত গলায় প্রিয়াঙ্গীর  অভিযোগ ।

আসি এই শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশের গুচ্ছ আর সোনা রোদের টানে । এগুলো তো আর নিউ জার্সিতে পাবোনা । 

তাহলে ? এই যে আশ্বিনে কাশ ফুটে উঠতেই চারিদিকে ঢাক বেজে ওঠে, পূজোর গন্ধ ভাসে হাওয়ায় … পরবাসীরা তার টানে ঘরে ফিরে এসে মিলনমেলায় যোগ দেয় …মা ঠাকুমার আমল থেকে  এই ট্র্যাডিশন চলে আসছে, কত মানুষের কত উদ্দীপনা, কত শিল্পীর কত সৃষ্টি … , কত কেনাবেচা …মনামির গলায় মুগ্ধতার সুর খেলা করে  ।

সেটা ঠিক আছে, একটা উপলক্ষ্য করে সকলে একত্র হয়, সকলে মেতে ওঠে ; তবে জানিস তো পাঁচশ বছর আগেও কিন্তু এই উপলক্ষ্য শরতকালে হতোনা …হত বসন্তকালে, ফসল ঘরে ওঠার পরে …

বসন্তকালে ? প্রিয়াঙ্গীর অবাক প্রশ্ন । 

হ্যাঁ ! সেটা ছিল বাসন্তী পূজো ! শরতে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা প্রথম সুরু করে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ন । তার পুরোহিতের পরামর্শে । কৃত্তিবাসী রামায়নে অকালবোধনের অনুকরণে । সামনে ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের সাথে যুদ্ধ । সেই যুদ্ধে বাঙ্গালীরা জয়লাভ করে । তার পরে এই অকাল বোধন প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় । 

তা সে যে বোধনই হোক না,… প্রিয়াঙ্গীর কথা, … গ্রামের মানুষদের একঘেয়ে নিরানন্দ জীবনে তো একটা বিরাট আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসত সেই পূজা । 

হ্যাঁ, সে কথা ঠিক, তবে সেটা রাজকীয় জৌলুষ দেখানোরও একটা জায়গা ছিল । সারাবছর প্রজা শোষণকারী জমিদারদের ঐভাবে একটা ড্যামেজ কন্ট্রোলের জায়গাও । গ্রামের গরীব মানুষদের আপন দেবতা কিন্তু ছিল শিব, কালী, মনসা, ভাদু, টুসু …এরা । ধ্রুবা বলে ।   

তারপর, কলকাতার বাবুদের দুর্গাপূজার কথা বল ।  সুচিরা বলে । সেখানে তো ইংরেজ লাট বে লাটকে নিয়ে এসে মদ মাংস মহফিলের বন্যা বওয়ানো হত । 

সেই ফিউডাল মোচ্ছবের স্মৃতি থেকে বাঙ্গালীরা বেরোতে পারেনি । যতই সংস্কার আসুক, গণতন্ত্র আসুক …তাই ভূভারতে যেখানে বাঙ্গালী, সেখানেই জমে ওঠে বারো ইয়ারী পূজা । এটাই যেন এখন বাঙ্গালীর সিগনেচার ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে । ধ্রুবা একটু যেন বিষন্নতার সুরেই বলে । 

আচ্ছা, আমরা চার ইয়ার কি ঘরে বসে তর্ক করেই ছুটিটাকে মাটি করব ? এইজন্যই কি সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে একসঙ্গে হলাম । মনামি এবার গলা চড়ায় । আমাদের নেক্সট প্রোগ্রাম কোথায় হচ্ছে ?  

চন্দনপুর সমুদ্র সৈকত ? নাকি কার্শিয়াং পাহাড়ে জন সাহেবের হোম স্টে ? প্রিয়াঙ্গীর সরাসরি  প্রশ্ন । 

ওই তো ধ্রু জানে । ও তো সারপ্রাইজ দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে। সুচিরা উত্তর দেয় ।

হুঁ । সেন্টার টেবিলে রাখা ল্যাপটপটায় আবার মন দিয়েছে ধ্রুবা । আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রামের ভেনু হল শালুয়াডিহি ।

শালুয়াডিহি ! বাকী তিনজনের গলা থেকে একই  আর্তনাদ ঠিকরে বেরোয় । সেটা আবার কোন মুলুকে !

সেটা হল … মাউস নাড়াতে নাড়াতে ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ধ্রুবা বলে, …বীরভূমে ।

ও ! কি আছে সেখানে ? মনামির অবাক প্রশ্ন । 

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ধ্রুবা ঘরের ভিতরের আধা অন্ধকার দেওয়ালের দিকে মুখ তুলে তাকায় । তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবারই চোখ চলে গেল সেখানে । 

সাদা দেওয়ালের গায়ে ফুটে উঠেছে চার পাশে সবুজ গাছপালা ঘেরা একটা বড় চারচালা মাটীর ঘর । মেটেলাল দেওয়ালের গায়ে সাদা, কালো আর লাল রঙ দিয়ে ফুল লতাপাতা আঁকা । খড়ের চালে দাঁড়ানো একটা সাইনবোর্ড ।  

কি এটা ! শা…লু…য়া…ডিহি… মহিলা… ফুটবল ক্লাব ! সুচিরা জোরে জোরে উচ্চারন করে পড়ে । এখানে যাওয়া হবে ?

কি করতে ? প্রিয়াঙ্গীর প্রশ্ন ।

ফু্টবল খেলতে। ধ্রুবার গম্ভীর উত্তর । 

অ্যাঁ … ? তিনজনের সমস্বর প্রতিক্রিয়া ।

হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ… হঠাৎ গলা ফাটিয়ে ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে ধ্রূবা । সে হাসি আর থামতেই চায় না । ওর স্বভাবটাই এরকম । শান্ত হ্রদের মত চুপচাপ  থাকবে অনেকক্ষণ, তার পর হঠাৎ করে একসময় উদ্দাম জলপ্রপাত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে । 

কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল ! এই জন্যই আগে থেকে বলিনি তোদের কিছু । 

এরকম সারপ্রাইজ ! প্রিয়াঙ্গীর স্বরে হতাশা ।

খুব সুন্দর একটা গ্রাম বুঝলি, এই দ্যাখ,… ধ্রুবা জানায় । ভিডিওর লাল মাটীর রাস্তায়, ছিমছাম মাটীর বাড়ী আর সবুজ গাছপালায়, স্বচ্ছতোয়া নদীর পাড়ে আর নাতিউচ্চ পাহাড়ের গায়ে  ঘুরে বেড়ায় সকলের চোখ । 

মূলতঃ আদিবাসীদের গ্রাম । খুব গরীব  ওরা । প্রতিবছর বন্যা হয় এই গ্রামে । এইবারও পূজোর আগে বানভাসি অবস্থা ছিল ওদের ।

এখানে বন্যা !

তিলপাড়া ব্যারেজের জলে । এখানে দুর্গাপূজা হয় না জানিস তো । চাষবাস, কুটীর শিল্প, বাঁধনা পরব, ছৌ নাচ এইসব নিয়ে ওরা থাকে।

দুর্গাপূজো হয় না কেন ? মনামির প্রশ্ন । 

তেমন পয়সাওলা লোক নেই তো ওখানে । তাছাড়া একটা কালচারাল বাধাও রয়েছে । তোরা হুদুড় দুর্গার গল্প জানিস নিশ্চয়ই …

কি দুর্গা !

হুদুড় দুর্গা । ওদের রাজা হুদুড় দুর্গাকেই বধ করেছিল এই দেবী দুর্গা …

সে আবার কি ! ছেলের নাম দুর্গা ! কি সব গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদছিস …

আচ্ছা, ফাঁদছিনা, ওটা তোরা ইন্টারনেটে দেখে নিস । তোরা বরং এখনকার গল্পটা শোন ।

তিনজনেই বেশ একটু দমে গেছে । ধ্রুবা আবার মাউসে হাত দিল । 

দেওয়ালে ফুটে উঠল একটা ঘরের ভিতরের ভিডিও । ঘরের তিন দেওয়ালের গায়ে তাকে রাখা অজস্র কাপ মেডেল মেমেন্টো, মূর্তি, মানপত্রের ওপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্যামেরার চোখ । 

মহিলা ফুটবল টিমের সব ট্রফি । জেলা স্তরে, রাজ্য স্তরে, জাতীয় স্তরে…  ধ্রুবা জানান দেয় । 

বাঃ ! এতক্ষণে সুচিরার মুখ দিয়ে একটা প্রশংসার ধ্বনি বেরোল । এই গ্রামেরই টিম ?

এই গ্রাম, আশেপাশের গ্রামের মেয়েরাও আছে । এই দেখ ছবি । ধ্রুবা দেখাল । জার্সি পরা মেয়েদের গ্রুপ ফটো । একজনের হাতে কাপ, পায়ে ফুটবল । 

আর এই মাঝখানে যে শাড়ীপরা মহিলাকে দেখছিস, ইনি হলেন এদের  কোচ । স্বশিক্ষিত । আজ কুড়ি বছর ধরে সমস্ত গ্রামের মেয়েদের শাড়ী পরে গ্রামের মাঠেই ফুটবল খেলা শেখাচ্ছেন ।

স্ট্রেঞ্জ ! শাড়ীপরা ফুটবল কোচ, গ্রামীন টিমকে একেবারে জাতীয় স্তরে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন ! সুচিরা অবাক ।

দেখ, তুই সাংবাদিক হয়েও এদের কথা জানিস না । প্রিয়াঙ্গীর মন্তব্য ।

 কিন্তু তুই এতসব জানলি কি করে ধ্রু, ওদের সম্মন্ধে ! থাকিস তো আমেরিকায় । সুচিরা বলে ।

আরে, আমি তো বিশ্বভারতীতে পড়ার সময় ওদের গ্রামে যেতাম । আমাদের গ্রামোন্নয়নের কর্মসূচী ছিল ওখানে । ওখানকার সমবায়িকা তৈরীতে তখন সাহায্য করেছিলাম । ধ্রুবার উত্তর । 

তো। আমরা ওখানে গিয়ে কি করব ! মনামির প্রশ্ন । 

লক্ষ্মী পূজোর পরের দিন ওখানে একটা ফুটবল প্রতিযোগিতা হবে । হাওড়া জেলার সঙ্গে । আমরা সব চিয়ার লিডার হয়ে যাব ।  দারুন মস্তি হবে, বল !

ওঃ দারুন ! সুচিরার বরাবরই খেলাধূলাতে খুব উৎসাহ । 

তা যাব যে থাকব কোথায় ? মনামির সংশয় যায় না । 

ওদের অতিথিশালাতে । এই দ্যাখ । 

দেওয়ালে ফুটে উঠল একটা দোতলা মাটীর বাড়ী ।  মেটে দেওয়াল, কালো টিনের চাল ।

এই মাটীর বাড়ীতে ! 

অনেক তো স্টার হোটেলে টোটেলে থাকলি, একবার থেকেই দেখ না এখানে । এই দেখ ভিতরে তক্তাপোষ আছে, উঠোনে ওয়াশরুম, ল্যাট্রিন আছে , কুয়ো আছে । 

কুয়ো ! বাথরুমে কলের জল নেই ! মনামির কাতর আর্তনাদ ।

ভয় নেই, মেয়েরা তোদের কুয়োর জল তুলে দেবে যত লাগে …

আমার লাগবেনা ! আমি বেশ কুয়োর জল তুলতে পারি । সুচিরার স্বরে খুশীর ছোঁয়া ।

আমিও পারি । খুব আরাম কুয়োর জলে স্নান করতে । প্রিয়াঙ্গীর সোৎসাহ সমর্থন । 

তাহলে আর কি ! লক্ষ্মীপূজোর দিন ওখানে যাচ্ছি । পরের দিন টূর্নামেন্ট । তার পরের দিন সকালে বুধনি পাহাড়ে ট্রেকিং । সন্ধ্যেবেলা ছৌ নাচের আসর । তার পরের দিন ফেরা । ঠিক আছে? 

ঠিক । 

ঠিক ।

ঠিক ।

একেবারে হীরক রাজার দেশের পারিষদদের ঢংএ তিন জনের উত্তর আসতেই মাউস থেকে হাত উঠিয়ে মাথার উপরে তুলে জোরে হাততালি দিল ধ্রুবা । 

জানতাম, তোরা আমার প্ল্যানটায় রাজী হবি । তোরা গুরুদেবের শারদোৎসব পড়েছিস নিশ্চয়ই ।

মুখ চাওয়াচাওয়ি করল তিনজনে।

পড়েছিলাম ছোটবেলায় । ঠিক মনে নেই । মনামি বলল । 

আগেকার দিনে এই শরৎকালে রাজারা যুদ্ধে বেরোত । বেয়ারা প্রতিবেশীদের শায়েস্তা করতে । শারদোৎসবের রাজা বিজয়াদিত্য বেরোল সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে রাজ্যের প্রজাদের সুখদুঃখের খোঁজ নিতে । রক্তক্ষয়ী হিংসা নয়, বিদ্রোহী সামন্তকে, সংশয়ী প্রজাকে সে জয় করল ভালোবাসা দিয়ে । আমার মতে সেইটিই হল প্রকৃত শারদোৎসব । 

আমার মতেও ।

আমার মতেও ।

আচ্ছা, আমাদের চিয়ার লিডারদের ড্রেস কি হবে ? সুচিরা উৎসাহে টগবগ করছে । শর্ট স্কার্ট ? 

না, না … লং স্কার্ট … প্রিয়াঙ্গীর প্রস্তাব । 

পাগল নাকি ! ওদের সমবায়িকার তাঁতের শাড়ী পরবি ওদের মত করে । আর চুলে লাগাবি মোরগঝুঁটির থোপা । ধ্রুবা ওদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলে ।

বাঃ, তাহলে ওদের মত করে আদিবাসী নাচও নেচে দেওয়া যাবে । এই মন, তুই তো নাচের গুরু, এ কদিনে আমাদের একটু নাচের তালিম দিয়ে দে ।

মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো,…মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ… মনামির হাত ধরে টেনে প্রিয়াঙ্গী বেসুরো গলায় গান গাইতে গাইতে নাচতে আরম্ভ করে । 


আলোকচিত্রঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য 




৮টি মন্তব্য:

  1. বাঃ ভিন্ন আঙ্গিকে গল্পটা মন ছুঁয়ে গেল।তবে হুদুড় দুর্গার নামটাই শুধু বললেন, ঐ ব্যাপারে অল্প কথা যুক্ত করা যেত।কারো কোন আগ্রহ দেখলাম না জানতে।খুব খুব ভালো লাগল।শহরনগর জমে উঠেছে।
    অতনু চট্টোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অতনু বাবুকে ধন্যবাদ সমঝদারির জন্য । তাঁকে জানাই যে, লেখার মধ্যে খানিকটা রহস্য রেখে দেওয়া আমার সু বা কু অভ্যাস । চাই যে পাঠকরা লেখাটি পড়ে ভুলে না যান, না জানা বা না বোঝার একটি কাঁটা মনের মধ্যে খোঁচা দিক । আমার ধারনা, হুদুর দুর্গার গল্পটা অনেকেই জানেন ।
      কেতকী বাগচী।

      মুছুন
  2. গল্পটি শুধু শারদোৎসবের আনন্দ নয়; এর অন্তরালে রয়েছে নারীশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা। চার বান্ধবীর কথোপকথন এবং গ্রামের মহিলা ফুটবল দলের প্রসঙ্গে নারীর সাহস, আত্মমর্যাদা ও প্রচলিত ধারণা ভেঙে এগিয়ে চলার কথা উঠে এসেছে। সাবলীল উপস্থাপনায় গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, শারদোৎসব নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি ও স্বপ্নকে সম্মান জানানোরও প্রতীক। 🌺

    উত্তরমুছুন
  3. মন্তব্য পোষ্ট না করে থাকতে পারলাম না,খুব স্ট্যান্ডার্ড লেখা, লেখিকার পরিচয় টা একটু জানতে পারলে ভাল হত।
    স্বপন কুমার পাল, বাঁকুড়া।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. কেতকী বাগচী একজন চক্ষু চিকিৎসক ও সমাজকর্মী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা খড়্গপুর রেল শহরে। বিদ্যালয় শিক্ষা খড়্গপুর রেলওয়ে গার্লস স্কুলে। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজ ও রিজিয়নেল ইনস্টিটিউট অব অপথেলমেজি, কলকাতা থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা। চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাঁকুড়া সহ রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত থেকেছেন। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য গড়ে ওঠা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। বর্তমানে কলকাতাবাসী এই সাহিত্যিক কলেজ জীবন থেকেই প্রবন্ধ ও গল্প রচনা সহ নানা সাহিত্য সৃজনে মগ্ন রয়েছেন। 'ধামসা মাদল' ও 'শহর নগর' পত্রিকার নিয়মিত লেখক তিনি।
      সন্তোষ ভট্টাচার্য, সম্পাদক।

      মুছুন
    2. বাঃ! পরিচয় জেনে খুব ভাল লাগল। আসলে একটা কথা আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানাই, বাঁকুড়ার লেখক লেখিকাদের লেখা আর কোলকাতা বা ধারে পাশের লেখকদের লেখা পড়লেই তফাৎটা বেশ বুঝতে পারা যায়, তাই জানতে চেয়েছিলাম।
      স্বপন কুমার পাল।

      মুছুন
  4. লেখিকার আগের বেশ কিছু লেখার পরিচয় পাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। লেখার বিষয় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গতসোবের বিশ্বাস,অবিশ্বাস, ইতিহাস,সামাজিক জীবনের প্রভাব ছুঁয়ে চারকন্যা পৌঁছেগেছে মূল জায়গাতে।দুর্গা যেখানে জীবনের জয়গানে উতসবে মেতেছে।

    উত্তরমুছুন
  5. ভারী যত্ন নিয়ে গল্পটি অলঙ্করণ করেছেন যিনি, তাঁকে ধন্যবাদ জানাই । ওতেই যেন গল্পটি আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ।
    কেতকী বাগচী।

    উত্তরমুছুন