শারদোৎসব ১৪৩৩ঃ প্রবন্ধ - গৌতম চৌধুরী

শহর নগর শারদোৎসব ১৪৩৩

 ঐতিহ্যের ইতিহাসে জয়রামবাটীর দুর্গাপূজা

গৌতম চৌধুরী

বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল তীর্থভূমি। এখানেই ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শ্রীশ্রী মা সারদাদেবী, যিনি ভক্তসমাজে ‘পবিত্র মা’ বা ‘শ্রীশ্রীমা’ নামে পরিচিত। তাঁর জন্মভিটেকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে মাতৃমন্দির এবং বিস্তার লাভ করে জয়রামবাটীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

জয়রামবাটীতে দুর্গাপূজার সূচনাপর্ব

একটি ঐতিহাসিক তথ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সারদাদেবীর জীবদ্দশায় জয়রামবাটীতে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল না। পরবর্তীকালে তাঁর জন্মভূমিকে কেন্দ্র করে দুর্গাপূজার সূচনা হয়।প্রাপ্ত ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯২৫ সালে জয়রামবাটীতে প্রথম ঘট ও পট স্থাপন করে দুর্গাপূজা শুরু হয়। সেই সময়  বর্তমানের মতো মৃন্ময়ী প্রতিমার প্রচলন হয়নি। কয়েক বছর এইভাবেই পূজা চলার পর ১৯৩২ সালে প্রথম মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এই সময়কালটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শ্রীশ্রীমা ১৯২০ সালে দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর জন্মভূমিতে মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৩ সালে। ফলে দুর্গাপূজার সূচনা ঘটে তাঁর জন্মভূমিকে একটি সুসংগঠিত তীর্থক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পর্যায়ে।

জগদ্ধাত্রী পূজা : জয়রামবাটীর আরও প্রাচীন ঐতিহ্য

জয়রামবাটীর দেবীপূজার ইতিহাস বুঝতে হলে দুর্গাপূজার পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পূজার ইতিহাসও জানা প্রয়োজন।

১৮৭৭ সালে অর্থাৎ ১২৮৪ বঙ্গাব্দে, সারদাদেবীর মা শ্যামাসুন্দরী দেবী তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। পরবর্তীকালে এই পূজা জয়রামবাটীর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সারদাদেবী নিজেও এই পূজার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘকাল এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। অর্থাৎ জয়রামবাটীর দেবী-আরাধনার ইতিহাসকে যদি ধারাবাহিকভাবে দেখা হয়, তবে প্রথমে দেখা যায় স্থানীয় ও পারিবারিক দেবী-উপাসনার ঐতিহ্য, তারপর শ্যামাসুন্দরী দেবীর উদ্যোগে জগদ্ধাত্রী পূজা এবং তার বহু পরে মাতৃমন্দিরকে কেন্দ্র করে দুর্গাপূজার সূচনা।

সিংহবাহিনী ও দুর্গাতত্ত্ব

জয়রামবাটীর ধর্মীয় সংস্কৃতিতে সিংহবাহিনী দেবীরও বিশেষ স্থান রয়েছে। স্থানীয় ঐতিহ্যে সিংহবাহিনীকে দুর্গার একটি রূপ হিসেবে মানা হয়। শ্রীশ্রী সারদাদেবী নিজেও এই মন্দিরে পূজা করেছেন বলে রামকৃষ্ণ-সারদা ঐতিহ্যের বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাই জয়রামবাটীর দুর্গাপূজাকে কেবল একটি বার্ষিক উৎসব হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ ঐতিহাসিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার গ্রামীণ দেবী-সংস্কৃতি, শক্তি-উপাসনা, সারদামায়ের জীবন এবং রামকৃষ্ণ ভাবধারার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

মাতৃমন্দির ও দুর্গোৎসব

জয়রামবাটীর মাতৃমন্দির নির্মিত হয়েছে শ্রীশ্রী সারদাদেবীর জন্মস্থানের উপর। স্বামী সারদানন্দ ১৯২৩ সালের অক্ষয় তৃতীয়ায় মন্দিরটি উৎসর্গ করেন। আজ এই স্থান দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের কাছে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। দুর্গাপূজার সময় এই জন্মভূমি নতুন মাত্রায় সেজে ওঠে। পূজা, অঞ্জলি, আরতি, কুমারী পূজা এবং ভক্তসমাগম—সব মিলিয়ে জয়রামবাটীর দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে ধর্মীয় অনুভূতি ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য সম্মিলন। মহাষ্টমীর কুমারী পূজাও এখানকার বিশেষ আকর্ষণগুলির একটি।

‘জীবন্ত দুর্গা’ ভাবনার সঙ্গে সম্পর্ক

জয়রামবাটীর দুর্গাপূজার সবচেয়ে গভীর দার্শনিক দিক হল নারীকে দেবীরূপে দেখার ভাবনা। সারদাদেবীর সমগ্র জীবনেই মাতৃত্ব, মমতা, ক্ষমা, সেবা ও মানবকল্যাণের আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে। এই কারণে তাঁর জন্মভূমিতে দুর্গাপূজা কেবল মহিষাসুরমর্দিনীর মৃন্ময় প্রতিমার আরাধনা নয়; বরং নারীশক্তি, মাতৃত্ব এবং মানবকল্যাণের প্রতীকী আরাধনাও বটে।

ইতিহাস থেকে বর্তমান

১৯২৫ সালের ঘট-পটের পূজা থেকে ১৯৩২ সালের মৃন্ময়ী প্রতিমা—এই যাত্রাপথ জয়রামবাটীর দুর্গাপূজার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূজা আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং আজ তা জয়রামবাটীর ধর্মীয় পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম অংশ। তবে এই উৎসবের মূল তাৎপর্য শুধু জনসমাগম বা আড়ম্বরের মধ্যে নয়। এর অন্তর্নিহিত বার্তা হল—শক্তির আরাধনা মানে মানবতার আরাধনা, মাতৃভাবের আরাধনা এবং নারীর মর্যাদার স্বীকৃতি।

১৮৭৭-এর জগদ্ধাত্রী পূজা থেকে ১৯২৫-এর দুর্গাপূজা এবং ১৯৩২-এর মৃন্ময়ী প্রতিমা—এই ধারাবাহিকতা জয়রামবাটীর দেবী-উপাসনার ইতিহাসকে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক উচ্চতা দিয়েছে। আজও জয়রামবাটীর মাটিতে দুর্গার আরাধনা যখন ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়—এ শুধু দেবীর আগমন নয়; এটি বাংলার এক পবিত্র স্মৃতি, এক মাতৃভাবনা এবং এক দীর্ঘ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ।

জয়রামবাটী তাই শুধু সারদামায়ের জন্মভূমি নয়—এ বাংলার শক্তি, মাতৃত্ব, ভক্তি ও মানবতার এক জীবন্ত ইতিহাস।

ছবিঃ জয়রামবাটী মাতৃমন্দিরের দুর্গা প্রতিমা 

  


৩টি মন্তব্য:

  1. শহর নগর জমজমাট।--sital biswas

    উত্তরমুছুন
  2. নতুন করে পড়লাম । ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  3. বাঃ ভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণণা।চলুক সাহিত্য আড্ডা
    অতনু চট্টোপাধ্যায়

    উত্তরমুছুন