সরমা ও তরণীসেন কথা
(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "সরমা ও তরণীসেন কথা।" প্রতি সোমবার ও শুক্রবার শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - পনেরো - সম্পাদক)
(১৫)
অনেকেই সরমাকে রাক্ষসকুলজাত বলে বর্ণনা করলেও পুরাণ অনুসারে তিনি ছিলেন গন্ধর্ব কন্যা। তাঁর পিতার নাম ছিল শৈলুষ।তিনি ছিলেন একজন গন্ধর্ব রাজ। সরমা মানস সরোবর তীরে নাকি জন্ম নিয়েছিলেন। সরোবরে জল বাড়তে তাঁর মা নাকি বলেছিলেন-"সরো মা বর্ধত"। আর সেই থেকে তাঁর নাম হয় সরমা।
বাল্যকাল থেকেই সরমা ছিলেন ধর্মপ্রানা এক মহিলা। অন্যায়ের সাথে তিনি কখনও আপোষ করেন নি। এটাই তাঁর জীবনের সবথেকে বড় পরিচয়। সরমাকে রাবন নিজে তাঁর অনুজ বিভীষনের পত্নী হিসাবে নির্বাচন করে লঙ্কাতে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন গ্রন্থ অনুযায়ী যে তথ্য যায়, সেটা হল সরমার দুই পুত্র কন্যা। মেয়ে ত্রিজটা আর পুত্র তরণীসেন। পুত্র কন্যারাও তাঁর মায়ের মত ছিলেন ধর্মপরায়ন ও ন্যায়ের পক্ষে। স্বামী বিভীষনকে তিনিই ধর্মের পথে থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আর তাই বিভীষন সীতা হরণের পর, দাদাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, যাতে সীতাকে রামচন্দ্রের কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু দাদা রাবণ তাঁর কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে পদাঘাত করেন। আর সেই অপমানে তিনি রামচন্দ্রের অনুগামী হয়ে, রামচন্দ্রের পক্ষে যোগ দেন। বিভীষণের সিদ্ধান্ত ছিল ন্যায়ের পথ অনুসরণ করা।
বিভীষণ লঙ্কা ত্যাগ করে শত্রু শিবিরে যোগদান করলেও, সরমা লঙ্কাতেই অবস্থান করেন। তিনি ছিলেন সীতার একমাত্র হিতাকাঙ্ক্ষী ও সুহৃদ। অশোককাননে সীতার পাশে থেকে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া থেকে শুরু করে, সমস্ত খবরাখবর সীতাকে প্রেরণ করতেন। রামচন্দ্রের মস্তক মায়াজালে তৈরি করে যখন সীতার সামনে পেশ করা হয়, তখন সীতা মূর্ছা যান। এছাড়াও সীতা নিজেকে আত্মাহুতি দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলে সরমাই তাঁকে বোঝান যে, ঐ মস্তক মায়ার সাহায্যে প্রস্তুত। তিনি যেন কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন। অশোক কাননে সীতাকে আগলে রেখেছিলেন এই সরমা। সরমা ছাড়াও ত্রিজটা ও বিভীষণের আরো এক পত্নী নাকি সীতার পরম হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন।
সরমার পুত্রের নাম ছিল তরণীসেন। তিনিই ছিলেন ধর্ম ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই তরণীসেন যখন রাবণের আদেশে যুদ্ধে যান, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। ঐ বয়সেই তিনি যুদ্ধে যান রামচন্দ্রের বিপরীতে যুদ্ধ করতে। শরীরের সর্বাংশে রাম নাম লেখা এই বালক পরম পরাক্রমের সাথে যুদ্ধ করে রামচন্দ্রের সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করছিলেন, ঠিক তখন তাঁকে থামানোর জন্য রামচন্দ্র ঐ বালকের সাথে যুদ্ধ করতে চাইলে, তরণীসেন প্রথমে ধনুর্বান রেখে ভক্তিভরে প্রনাম করেন। তাঁর এই ভক্তি দেখে বিভীষণকে ঐ বালক সম্পর্কে জানতে চাইলে, বিভীষণ নিরুত্তর থাকেন, ও নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেন নি। রামচন্দ্রের তীরে তরণীসেন বধ হলে, ঐ কাটা মুন্ডু রাম নাম উচ্চারন করে রামচন্দ্রের দেহে বিলীন হয়ে যায়। পরে বিভীষণকে রোদন করতে দেখে জানতে পারেন যে, তরণীসেন তারই একমাত্র পুত্র। তরণীসেনের বীরত্ব আর ন্যায়ের কথা রামায়নে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।
তরণীসেনের মৃত্যু সংবাদ লঙ্কার রাজ অন্তঃপুরে এসে পৌঁছালে সরমা বিলাপ করতে থাকেন। কিন্তু পুত্রকে হারিয়েও সীতার প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তরণীসেনের মৃত্যু অনেকটা মহাভারতের অভিমন্যুর মৃত্যুর অনুরূপ। অনেকেই হয়ত এটাকে মান্যতা দেবেন না। কিন্তু নাবালক দুই যোদ্ধার আত্মত্যাগ আমাদের সে কথাকেই মাণ্যতা দেয়।
চিত্র ঋণঃ 'তরণীসেন বধ' চলচ্চিত্র।
চলবে
------------------------------------------------------------------------------------------
সফরনামা
আসছে বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়ের নতুন ধারাবাহিক ‘সফরনামা'
চুরাশি হাজার পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় 'শহর নগর ডট কম' ব্লগজিন এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই ওয়েব পত্রিকার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রয়াগরাজ নিবাসী বিশিষ্ট প্রবাসী লেখক অরুণকুমার রায়। তাঁর বেশ কিছু মূল্যবান লেখায় এই পত্রিকা সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত যে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বহুচর্চিত ও উচ্চ প্রশংসিত গ্রন্থ 'মহাকুম্ভ ইতিহাস' এই বল্গজিনেই ২০২৫ এর মহাকুম্ভ চলাকালীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অরুণ কুমার রায় পুনরায় আসছেন তাঁর নতুন ধারাবাহিক ‘সফরনামা’ নিয়ে। জীবনের চলার পথে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসা লেখকের কলমে উঠে আসছে তাঁদের কথা। জানি না তাঁর এই 'সফরনামা' শেষ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসের আকার নেবে কি না। এই ধারাবাহিক হতে চলেছে তাঁর জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনার এক অনন্য কোলাজ। জীবনের এই চলার পথে কত কথা, কত মানুষের আনাগোনা থাকবে। সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্নায় ঘেরা মানুষের এই জীবন-সফর। আশা রাখি, লেখকের কলমের জাদুতে সেই নীরব সফর আরও সরব ও সরস হয়ে উঠবে। আপনারাও নিয়মিত চোখ রাখুন শহর নগরের পাতায়। সঙ্গে থাকুন এবং আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করুন। - সম্পাদক।)
------------------------------------------------------------------------------------------

খুব ভালো হবে।অপেক্ষায় থাকলাম।
উত্তরমুছুনঅতনু চট্টোপাধ্যায়
তরনীসেন বিভীষণ ,সরমা এই তিন চরিত্র রামায়ণ কাহিনীকে পুরাণকারের মতে বিশেষ ইতিবাচকতা প্রদান করে । সাম্প্রতিক সাহিত্য গবেষণা কিন্তু সেই তুলসীদাস বাল্মীকির পদাঙ্ক অনুসরন করে চললেও , বাঁকুড়ার সাহিত্যিক গবেষক মাননীয় অতনু দা ,তাঁর নিজস্ব ধ্যান ধারণার মধ্যে দিয়ে , অনেকটা মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ,রামায়নের চরিত্র চিত্রন ক'রে চলেছেন।
উত্তরমুছুনসুন্দর হচ্ছে ,অতিশয় সুন্দর ।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো। সমৃদ্ধ হচ্ছি
উত্তরমুছুনঅতিশয় মানবিক
উত্তরমুছুনযুগে যুগে এই মহাকাব্য মানুষকে শিখিয়েছে ন্যায়, নিষ্ঠা, কর্তব্যবোধ ও সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা নিয়ে থাকার চিরন্তন বাণী। সুলেখক অতনু চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই আখ্যান পর্বে বিভীষণ পত্নী ও পুত্র সরমা ও তারিণী সেন বীরত্বের কাহিনীকে পুনঃ এই জনপ্রিয় ও বিশুদ্ধ ওয়েব সাহিত্য পত্রিকা শহর নগর ব্লগ জিনে তুলে ধরছেন তাতে তিনি তাঁর জাতীয় কর্তব্য পালন করছেন। আমি তাঁকে ও সম্পাদক মহাশয়কে এর জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।
উত্তরমুছুনঅরুণ কুমার রায়
এলাহাবাদ/ প্রয়াগরাজ