ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ বন্দিনী সীতা ও অশোক কানন (পর্ব ১৪) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

 বন্দিনী সীতা ও অশোক কাননে হনুমান 

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "বন্দিনী সীতা ও অশোক কাননে হনুমান।" প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - চোদ্দ - সম্পাদক)

(১৪)

অভিমানী সীতার সাথে হনুমাণের কথোপকথনে ঝরে পড়েছিল ক্ষোভ ও অভিমান। সীতা হনুমানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন-"শ্রীরামচন্দ্র কি তাঁর ধর্নুবান ছেড়ে দিয়েছেন?"

হনুমান শান্ত স্বরে তাঁর সব প্রশ্নের উত্তর দেন। রামচন্দ্র যে সীতাবিহনে মণিহারা ফণি, সেকথা বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু হনুমাণের ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখে সীতার মন ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়। তারপরেই তিনি নিজের মাথার মুকুট হনুমানের হাতে দিলে, হনূমাণ মাতা সীতাকে প্রনাম করে আশীর্বাদ চাইলেন। সীতা হনুমাণকে "বিজয়ী ভবঃ" বলে আশীর্বাদ করেন। এরপর হনূমান সীতার কাছে প্রস্তাব দেন, মাকে কাঁধে চাপিয়ে রামচন্দ্রের কাছে নিয়ে যাবেন। সীতা রাজী হলেন না। অপেক্ষা করতে থাকলেন স্বামীর জন্য। তস্করের মত পালিয়ে যাওয়া নয়, রামচন্দ্রের মত বীরের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।

সীতার কাছে আশীর্বাদ লাভ করে, হনুমান অশোককানন ধ্বংস করতে শুরু করলেন। মায়ার পাহাড়, বৃক্ষরাজি সমস্ত নষ্ট করতে শুরু করলেন। উদ্দেশ্য একটাই- রাবনের কাছে বার্তা প্রেরণ। এই ধ্বংসযজ্ঞে যে সমস্ত রাক্ষস বাধা দিতে আসে, তাদের সকলকে তিনি বধ করেন। এমনকি রারনের ছোট পুত্র অক্ষকুমারকেও তিনি বধ করেন। খবর চলে যায় রাবণের কাছে। একটা বানরের এই বীরত্ব আর সাহস দেখে তিনি আশ্বর্য হয়ে যান। মেঘনাদকে পাঠান ঐ বানরকে বন্দী করতে। হনুমাণ ইচ্ছে করেই অজ্ঞানের ভান করে ধরা দেন। এরপর যখন রাবণের কাছে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি জয় শ্রীরাম ধ্বনি তুলে মাতা সীতাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। অহংকারী রাবণ এতে যারপরনাই ক্রোধান্বিত হন ও ঐ বানরকে শাস্তি প্রদান করে রামচন্দ্রের কাছে বার্তা প্রেরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, হনুমানের লেজে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়েন সকলেই।‌ এরপর চলল হনুমাণের তান্ডব। সারা লঙ্কা জুড়ে চলতে লাগল তান্ডব। অশোককাননের সব কিছু ধ্বংস করে, সীতার কথা চিন্তৃ করে ক্ষান্ত হলেন ঠিক, কিন্তু তাঁর লেজের আগুন নেভাতে তাঁকে হিমসিম খেতে হল। অবশেষে লেজকে মুখে ঢুকিয়ে, নেভানোর চেষ্টা সফল হলেও, তাঁর মুখ কালো হয়ে যায়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে সীতার সাহায্য প্রার্থনা করলে, সীতা হনুমাণের কথা চিন্তা করে সকল হনুমানের মুখ কালো হবার কথা বললেন। সেই থেকেই নাকি সমস্ত হনুমানের মুখ কালো অশোককাননে হনুমাণের তান্ডবকে অনেকেই পাশবিক অভ্যাসের ফসল বলে উল্লেখ করে থাকেন কেউ বা এটাকে নেহাত একটা মজা বলে উল্লেখ করেন।কিন্ত আসল কারনটা ছিল ভিন্ন। হনুমানের এই তান্ডবের পিছনে কিছু কারণ অবশ্যই আছে।

প্রথমতঃ দুঃখীনি ও বন্দিনী সীতার মনে একটা সাহসী বার্তা প্রেরণ করা।

দ্বিতীয়তঃ সামান্য একজন সৈনিক হয়ে হনুমাণের এই তান্ডব এবং সেটা রাবনের চোখের সামনে সংগঠিত করা হল রামচন্দ্রের প্রকৃত ক্ষমতার প্রদর্শন ।

তৃতীয়তঃ রাবনের কাছে একটা বার্তা প্রেরন ও শক্তির প্রকৃত অবস্থা অবগত করানো ।

চতুর্থতঃ এতদিন ধরে সীতার প্রতি যে সমস্ত চেঁড়ি অপমান ও অত্যাচার করত, তাদের কাছে একটা বার্তা প্রেরণ।

পঞ্চমতঃ রাবনের সুরক্ষা বলয়কে ঠুনকো প্রতিপন্ন করার বার্তা।

ষষ্ঠতঃ বিদেশের মাটিতে নিজেদের শক্তির পরিচয় জ্ঞাপন করা।

সপ্তমতঃ রামচন্দ্রের সৈন্যবাহিনীর ভেতরেও মায়াজাল বিস্তার করা ও বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করার ক্ষমতা।

অষ্টমতঃ দূতকে মৃত্যুদন্ড না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া ও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া।

আর সর্বশেষে সীতার মলিন মুখে আশার আলো সঞ্চার করা।

এগুলো তো গেল হনুমাণের কীর্তিকলাপ, যা রামায়ণে বর্ণিত আছে। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে, কিভাবে নিজের চেহারার পরিবর্তন করার সূযোগ লাভ করল। বিনা যোগাযোগে উড়ে লঙ্কাতে প্রবেশ করা যেন এক অলৌকিক  প্রেক্ষাপট। এছাড়া বীরত্বে একা লড়াই করার কৌশল কি ভাবে লাভ করল। হাতে কোন অস্ত্র নেই, আর থাকলেও একটা গদা। এর সাহায্যে অত রাক্ষস সেনাদের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করা যেন আগেই সেই ঘটনা রচিত করেছিলেন কাহিনিকার। পুরো ঘটনাই যেন এক অলৌকিকত্বে মোড়া ঘটনা।

চলবে

৫টি মন্তব্য:

  1. যত এগোচ্ছে ততটাই গতিময়তা ও নিজস্ব ছন্দে চলছে । কোনও আবিলতা ও বাহুল্যতা নেই । প্রতিটি পর্ব সান্ধ্যকালীন পাঠ নিজস্ব রুটিন হয়ে গেছে ।

    উত্তরমুছুন
  2. শ্যামাশঙ্কর বরাট২৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৬:১৭ PM

    অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক টপিকস নিয়ে আলোচনা করলে কত জানতে হয়,বুঝতে হয় ,সে সকলের পরিচয় ও পরিচয়ের পরিচিতি অকাট্য করার যে অভিজ্ঞতা , তার ক্ষমতায় আপনি পুরান গবেষণার প্রেক্ষাপটে বিশেষ ধারনা প্রদান করেছেন ।বেশ সুন্দর লাগছে ।সুন্দর ।

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ অসাধারণ।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব সুন্দর হয়েছে

    উত্তরমুছুন
  5. খুব ভালো হচ্ছে। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম......

    উত্তরমুছুন