ধারাবাহিক উপাখ্যানঃ বন্দিনী সীতা ও অশোক কানন (পর্ব ১৩) - অতনু চট্টোপাধ্যায়

বন্দিনী সীতা ও অশোক কানন

অতনু চট্টোপাধ্যায় 

(রামায়ণ ও মহাভারত এই দুই মহাকাব্যের কাহিনী নিয়ে গল্প প্রবন্ধ লেখার শেষ নেই। ভারতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই মহাকাব্যের চরিত্ররা। বাঁকুড়া জেলার প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবার উঠে এলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা রামায়ণের অমর কাহিনীর টুকরো টুকরো অংশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক উপাখ্যান। আজকের পর্বে "বন্দিনী সীতা ও অশোক কানন।" প্রতি সোমবার ও শুক্রবার  শহর নগর ব্লগজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকটি। আজ পর্ব - তেরো - সম্পাদক)

(১৩)

অশোক কাননে সীতা ছিলেন এক তপস্যারতা নারী। সর্বক্ষন তিনি রামচন্দ্রের চিন্তাতে বিভোর হয়ে থাকতেন। শত প্রলোভন আর মায়াবী প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে রামের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধেতে ছিলেন অটল। একজন পতিব্রতা নারী হিসাবে তাঁর পরিচিতি। রাম লক্ষ্মণ কেমন আছেন সেই চিন্তা মনে করে তিনি ক্রন্দনরতা থাকতেন সর্বক্ষন। খিদে তৃষ্ণা নিবারনে তিনি কখনও রাজবাড়ির খাদ্য গ্রহন করতেন না। অধিকাংশ সময়েই তিনি অভুক্ত থাকতেন। আর এই সময়েই সরমা আর ত্রিজটা তাঁর পাশে থেকে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়াই শুধু নয়, সমস্ত মায়াবী জাল মন থেকে ঝেড়ে ফেলার নির্দেশ দিতেন। তাঁদের পরামর্শেই সীতা ফলমুল ভক্ষন করতেন। শুধু সান্ত্বনা দেওয়াই নয়, রামচন্দ্র যে তাঁকে ফিরে পেতে লঙ্কার দিকে এগিয়ে আসছেন। সমুদ্রে সেতুবন্ধন করার খবরাখবর দিতেন।রাক্ষসকুলের বধূ হয়েও, সরমা ছিলেন একজন ধর্মপরায়না নারী।যার অন্তরে হলাহল ছিল না, ছিল এক আদর্শ মায়ের স্নেহ, মমতা আর সর্বোপরি ধর্মের প্রতি অনুরাগী। রাবনের অন্যায় আচরনের জন্য তিনি ছিলেন অনুতপ্ত। এহেন নারীর গুনাবলী সঞ্চারিত হয়েছিল তাঁর পুত্রকন্যাদের মধ্যে। এমনকি তাঁর স্বামীকে ধর্মের পথে থাকতে তিনিই অনুরোধ জানান। পতিব্রতা এই নারী স্বামীকে শত্রুপক্ষে যোগদান করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।

হনুমান লঙ্কাতে প্রবেশ করার আগে তাঁর সঙ্গী, মাতা হিসাবে ছিলেন সরমা কন্যা ত্রিজটা ও নিজে স্বয়ং। সীতার অশোক কাননে অবস্থান অনেকটা খোলা জায়গাতে বন্দী করে রাখার মত। অনেক বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন যে, সীতার বন্দীদশাকালে স্বপ্ন দেখিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সরমা আর ত্রিজটা। আবার কেউ কেউ ধারনা করেন যে, সীতাকে অশোককাননে সর্বতোভাবে রক্ষা করার কথা বলেছিলেন রাবনপত্নী মন্দোদরী।  মন্দোদরী গোপনে তাঁর সাথে দেখা করতে এসে তাঁকে কন্যাসম উপদেশ দান করতেন।

তবে অনেকেই বলে থাকেন যে, সীতা যেহেতু মা লক্ষ্মী স্বয়ং, তাই রাবন কতৃক অপহৃত হবার আগে নিজের কায়া রেখে ছিলেন অশোককাননে।

অশোককানন ছিল রাবনের এক মায়াবী বাগান। স্বর্গের নন্দনকাননের আদলে ছিল এই অশোককানন। মায়ার প্রভাবের জেরে ফুল, ফল, ঝর্ণা -সবকিছুই ছিল মায়াময়। আর ছিল সীতার সামনে মায়াবী রাক্ষসী আর রাবনের ভীতি উৎপাদনকারী বিভিন্ন ঘটনা। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন প্রলোভন আর মনকে বিপর্যস্ত করার বিভিন্ন কৌশল।

এই অশোক কাননে তাঁর মন ও ভরসার স্থান ছিল ত্রিজটা আর সরমা। কিন্তু এই দুজন ছাড়া, আরো একজনের আগমনে তিনি মানসিক জোর ও আশার আলো দেখেছিলেন। এই হনুমানের পরিচয় সকলের জানা। তাঁকে অনেকেই পবন পুত্র বলেই মানে এবং জানে। তবে তাঁকে অঞ্জনার পুত্র বলেই মান্যতা দান করা হয় এবং অঞ্জনী পুত্র বলা হয়ে থাকে। হনুমানের পিতার নাম ছিল কেশরী, যিনি ছিলেন বানররাজ।  শিবপুরাণ অনুযায়ী হনুমানের জন্মের একটা ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। আর সেটি হলঃ অঞ্জনা পুত্র লাভের আশায় শিবের আরাধনা ও পূজা করেন যথেষ্ট ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে। ভগবান শিব অঞ্জনার ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে পবনদেবের হাত দিয়ে পায়েস পাঠান। ঐ পায়েস খেয়ে হনুমান তার গর্ভে আসে। বলা হয়ে থাকে যে, হনুমান একাদশ রুদ্রের এক রুদ্র।

বাচ্চা অবস্থা থেকেই হনুমানের বীরত্ব আর অলৌকিক কান্ডের বিভিন্ন প্রমান মেলে। তিনি শরীরকে স্ফীত কিংবা সঙ্কুচিত করতে পারতেন। তাঁর অসীম সাহস আর বীরত্ব ছিল ঈর্ষনীয়। তিনি ছিলেন হরিভক্তি পরায়ন এক বীর। বিভিন্ন অলৌকিক কাহিনির মধ্যে সূর্যকে বগল দাবা করার ঘটনা দুবার দেখা যায়। তিনি ছিলেন সুগ্রীবের প্রধান সেনাপতি।

যাইহোক, আসি অশোককাননে হনুমানের আগমন ও ঘটনা প্রসঙ্গে। রামচন্দ্রের দূত হিসাবে তিনি প্রথম সাগর ডিঙিয়ে লঙ্কাতে প্রবেশ করেন। তাঁর সাথে ছিল রামচন্দ্রের পাঠানো অঙ্গুরীয়। মূলত সীতাকে আশা ও বিশ্বাস জাগানোর উদ্দেশ্যেই হনুমানের লঙ্কা যাত্রা। লঙ্কাতে পৌঁছে তিনি শরীরকে অতি ক্ষুদ্র করে সারা লঙ্কা ঘুরে বেড়ান। কিন্তু সীতার দর্শন মেলে না। রাজপুরী থেকে অন্দরমহল সর্বত্র গমন করেও মাতা সীতার দর্শন না পেয়ে কিছুটা হতাশ হন।কিন্তু হাল না ছেড়ে বিভিন্ন রাক্ষস রাক্ষসীর কথোপকথনে বুঝতে পারেন যে, মাতা সীতাকে বন্দিনী করে রাখা হয়েছে অশোককাননে। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান অশোককাননে। অশোক গাছের নীচে এক দুঃখিনী নারীকে দেখে অনুমান করেন যে, ইনিই মাতা সীতা। কিন্তু মাতা সীতার সাথে কোন পরিচয় নেই, কিভাবে দর্শন করবেন, সেই চিন্তাতে বিভোর হয়ে থাকেন। অবশেষে রক্ষীর সংখ্যা একটু কমে এলে, তিনি গাছ থেকে নেমে এসে মাতা সীতাকে প্রনাম করেন। সীতা হনুমানকে চেনেন না। দুষ্টু রাবনের মায়াজালে তিনি সবকিছুই মায়া বলে ভ্রম করেন। সীতার বিশ্বাস পেতে তিনি সীতাকে রামের পাঠানো অঙ্গুরীয় প্রদান করলে সীতা বিশ্বাস করেন। তিনি তখন নিজের মাথার মুকুট রামচন্দ্রের উদ্দেশ্যে হনুমানের হাতে তুলে দেন।

চলবে

৬টি মন্তব্য:

  1. শ্যামাশঙ্কর বরাট২৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৫:২৮ PM

    এক কথায় অসাধারণ। অসাধারণ।

    উত্তরমুছুন
  2. সুন্দর সুন্দর

    উত্তরমুছুন
  3. অশোক বৃক্ষ। অশোককানন । অশোক কেন ? যেখানে সীতা এতখানি শোকার্ত। এ বিষয়ে দুচার কথা বললে ভালো হতো।

    উত্তরমুছুন
  4. সুন্দর হয়েছে। ভালো লাগছে

    উত্তরমুছুন
  5. দীনবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনা প্রশ্নে গল্প এগিয়ে যাচ্ছে । ভালো

    উত্তরমুছুন