বিশেষ নিবন্ধঃ কালজয়ী উপন্যাস"পথের পাঁচালী

 বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' ও প্রকাশক সজনীকান্ত 

তপন কুমার চন্দ

( ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১৭ বৈশাখ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'পথের পাঁচালী' উপন্যাস লেখা শুরু করেন। সেই সূত্রে এবছর এই কালজয়ী উপন্যাসের শতবর্ষ। বন্ধু সজনীকান্ত দাসের আগ্রহে 'বিচিত্রা' পত্রিকাতে সেটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে আরো তিন বছর পেরিয়ে যায়। সেই অসামান্য উপন্যাসের আত্মপ্রকাশ ও প্রকাশককে নিয়ে আজ আলোচনা করছেন তপন কুমার চন্দ। - সম্পাদক) 

ছোট গল্পকার হিসাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে  ১৩২৮  বঙ্গাব্দের  মাঘ মাসের (১৯২২, ১৪ জানুয়ারী) 'প্রবাসী'তে। যদিও তাঁর প্রথম গল্প 'উপেক্ষিতা' পাঠকের কাছে উপেক্ষিতই ছিল।  পরবর্তীকালে 'উমারাণী' (শ্রাবন,১৩২৯), 'মৌরীফুল' (অগ্রহায়ন,১৩৩০), 'অভিশপ্ত '(আষাঢ়,১৩৩১), 'নাস্তিক' (পৌষ,১৩৩১) এবং 'পুঁইমাচা' (মাঘ,১৩৩১) প্রভৃতি ছোটগল্পগুলি পাঠককে আকৃষ্ট করলেও বিভূতিভূষণকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। সজনীকান্ত দাস তাঁর  'আত্মস্মৃতি'তে লিখেছেন, "ইহার পরেই 'কল্লোল দলের পটলডাঙ্গার পাঁচালী' ভাবী 'পথের পাঁচালী'র কবি বিভূতিভূষণকে  মিঠা গল্পের আসর জমাইতে দেয় নাই, তিনি  উত্তর  ভাগলপুরের ইসমাইলপুরের কাছারিতে অরণ্যবাস বরণ করিয়াছেন।" 

জনমানবহীন অরণ্য নির্জনতায় তিনি (বিভূতিভূষণ) সুদূর যশোহরের নিজ গ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের (বারাকপুর) তাঁর শৈশবস্মৃতি বিজড়িত কাহিনী "পথের পাঁচালী" রচনা সুরু করেন। "পথের পাঁচালী"র সূত্রপাতের তারিখ ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে এপ্রিল (১৭ইবৈশাখ,১৩৩২)। ওই তারিখের দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন- "জগতের অসংখ্য আনন্দের ভান্ডার উন্মুক্ত  আছে--------- সাহিত্যিকদের কাজ হচ্ছে এই আনন্দের বার্তা সাধারণের প্রাণে পৌঁছে দেওয়া, তারা ভগবানের প্রেরণা নিয়ে এই মহতী আনন্দবার্তা, এই অনন্ত জীবনের বাণী শোনাতে জগতে এসেছে----- এই কাজ তাদের করতে হবেই,------- তাদের অস্তিত্বের এই শুধু সার্থকতা---‐--"।

ভাগলপুরের মগ্ন নির্জনতায় এইভাবে "পথের পাঁচালী" লেখা চলতে থাকে। ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দের ৩০শেএপ্রিল  থেকে১৯২৮ এর ২৫শে এপ্রিল (১২ই বৈশাখ,১৩৩৫), দীর্ঘ তিন বৎসরের একনিষ্ঠ  সাধনার  শেষে  "পথের পাঁচালী"লেখা সম্পূর্ণ হয়।

২৬ ও ২৮ তারিখের দিনলিপিতে বিভূতিভূষণ লিখছেন- "আজ আমার সাহিত্য-সাধনার একটা সার্থক দিন--এই জন্য যে আজ আমি আমার তিন বৎসরের ফলস্বরূপ উপন্যাস খানাকে 'বিচিত্রা'তে পাঠিয়ে দিয়েছি।"

পরবর্তী আষাঢ়(১৩৩৫)অর্থাৎ " বিচিত্রা"র দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা হতে "পথের পাঁচালী" ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের  আশ্বিনে শেষ হয় (কার্তিক, ১৩৩৫ সংখ্যায় ব্যতিরেকে)।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 

পরবর্তীকালে সজনীকান্ত দাস প্রকাশক হিসাবে "রঞ্জন প্রকাশালয়" স্থাপনের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  "পথের পাঁচালী" প্রকাশে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সজনীকান্ত দাস প্রকৃতই যে একজন সাহিত্যসাধক ছিলেন, এটি তারও এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ফলে তিনি পুস্তক প্রকাশের ব্যবসায়ে ব্রতী হন নাই। সাহিত্য প্রীতি ও হৃদয়াবেগবশতঃ তিনি এই কাজে প্রবৃত্ত হন। 'বিচিত্রা'য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে 'প্রবাসী' পত্রিকার ৯১ নং আপার সার্কুলার রোডের সাহিত্য আড্ডায় নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর সাথে বিভূতিভূষণ উপস্থিত হলেও সেদিন কেউই তাঁর সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন না। কথা প্রসঙ্গে নীরদ চন্দ্র জানান যে, 'পথের পাঁচালী'-র মতো উপন্যাসের জন্য একজন ভদ্র প্রকাশক  পাওয়া যাচ্ছে না। বাঙলা সাহিত্যের পক্ষে এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। সজনীকান্ত  সেদিনই 'বিচিত্রা'র  ফাইল সংগ্রহ করে  গভীর রাত পর্যন্ত  'পথের পাঁচালী'র প্রকাশিত  অংশের পাঠ শেষ করেন। তিনি বিস্ময়বিমুগ্ধ ও লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাবনতঃ হয়ে পড়েন। বেশ বুঝতে পারেন, রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের বাংলাসাহিত্যে অভিনবত্বের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন বিভূতিভূষণ। শেষ রাত্রিটা তিনি উত্তেজনায় ঘুমোতে  পারেননি। পরের দিন সকাল দশটায় অফিসে গিয়েই তিনি নীরদচন্দ্রের নিকট জানতে পারেন যে, একজন মাত্র প্রকাশক পঞ্চাশ টাকায় কপিরাইট কিনতে চেয়েছেন, একজন বই ছাপিয়ে বিক্রি হলে কিঞ্চিৎ পরিমান রয়্যালটি দিতে পারেন বলে কথা দিয়েছেন। একথা শুনে সজনীকান্ত ক্রুদ্ধ ও বিচলিত হয়ে কথা দেন যে, বিভূতিভূষণ  রাজী হলে তিনিই 'পথের পাঁচালী'র প্রকাশক হতে পারেন। বন্ধুবর গোপাল হালদারের  পরামর্শে সজনীকান্ত স্থির করলেন যে,'পথের পাঁচালী'র প্রথম সংস্করণের  জন্য বিভূতিভূষণকে তাঁরা তিন শত টাকা সম্মান দক্ষিণা দেবেন। বিভূতিভূষণের মধ্যে যে চিরন্তন শিশুটি ছিল, সেই শিশুসুলভ আবদারেই তিনি দরাদরি করে 'পথের পাঁচালী:র প্রথম সংস্করণের ১১০০ কপির জন্য তিনশো পঁচিশ টাকা চেয়ে বসলেন। সজনীকান্ত বন্ধুবর গোপাল হালদার ও নীরদ চন্দ্রের উপস্থিতিতে তাহাতেই  সানন্দে সম্মতি জানালেন। সেইসময় সজনীকান্ত-গৃহিনী আসন্নপ্রসবা ছিলেন। দাস- দম্পতির ধারনা ছিল তাঁদের প্রথম সন্তান পুত্রই হবে। সেইদিন সেই মুহূর্তেই  দলিল প্রস্তুত করার পূর্বে ভাবী নবজাতকের নাম রঞ্জন রাখা স্থির করা হলো এবং তার নামে পুস্তক প্রকাশনা সংস্থাটির নাম 'রঞ্জন  প্রকাশালয়' রাখা হলো। এইভাবেই ৯১নং আপার সার্কুলার রোডের 'প্রবাসী' আপিসের অন্তর্গত ক্ষুদ্র  কক্ষটিতে রঞ্জন  প্রকাশালয়ের গোড়াপত্তন হলো। গ্রন্থকার বিভূতিভূষণকে পঁচিশ টাকা মাত্র বায়না দেওয়া হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, ৭ই জুলাই শ্রীমান রঞ্জন ভূমিষ্ট হয়ে রঞ্জন প্রকাশালয়ের  নামটি কায়েম করল। ২৬শে জুলাই, ১৯২৯ থেকে ২৮শে সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ এই দুমাস ধরে 'পথের পাঁচালী' ছাপা হলো। ২রা অক্টোবর, ১৯২৯ (১৬ই আশ্বিন,১৩৩৬) বুধবার মহালয়ার দিন বইটি প্রকাশ পেল। সেদিন 'পথের পাঁচালী'র সৃষ্টিকর্তার  অনুভূতি তাঁর ডায়েরির পাতায় ব্যক্ত হয়েছে এইভাবে- "আজ মহালয়া, পিতৃ-তর্পণের দিন, কিন্ত  আমি তিল তুলসী তর্পণে বিশ্বাসবান নই- বাবা রেখে গিয়েছিলেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করবার জন্যে, তাই যদি করতে পারি তার চেয়ে সত্যতর কোনো তর্পণের কথা আমার জানা নেই।----

************************

আজ বিশ বৎসরের দূর জীবনের পার হতে আমার সে পাখী-ডাকা, তেলা-কুচা ফুল-ফোটা, ছায়া-ভরা মাটির ভিটাকে অভিনন্দন করে এই কথাটি শুধু জানাতে চাই- ভুলি নি। ভুলি নি। যেখানেই থাকি, ভুলি নি। -তোমারই কথা লিখে রেখে যাব‐ সুদীর্ঘ  অনাগত দিনের বিভিন্ন  ও বিচিত্র সুর-সংযোগের মধ্যে তোমার মেঠো  একতারার  উদার, অনাহত ঝঙ্কারটুকু যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।"

'পথের পাঁচালী' দিয়ে শুরু হলেও রঞ্জন প্রকাশালয়ের সর্বপ্রথম প্রকাশিত পুস্তক হলো সজনীকান্তের নিজ  পুস্তক "অজয়" (১৭ইআগষ্ট, ১৯২৯), দ্বিতীয় পুস্তক  "পথ চলতে ঘাসের ফুল" (২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯২৯) এবং তৃতীয় পুস্তক  হলো "পথের পাঁচালী" (২রা অক্টোবর, ১৯২৯)।

সজনীকান্ত দাসন

সজনীকান্ত  প্রকৃত অর্থেই  যে একজন  সাহিত্যপ্রেমী ও সাহিত্য- সাধক ছিলেন, 'পথের পাঁচালী' প্রকাশনার গুরু দায়িত্ব নিজের সীমিত ক্ষমতার  মধ্যেও কাঁধে তুলে নেওয়ায় তার প্রকাশ আমরা দেখি। সেই সময় 'প্রবাসী' পত্রিকার  দপ্তরে তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র  দেড়শত টাকা। কলকাতায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী সহ সংসার পেতেছেন। হঠাৎ কোনও প্রাপ্তিযোগও ছিল না। তবে বন্ধু গোপাল হালদার  এবিষয়ে তাঁকে  সাহায্য করেছিলেন। 'পথের পাঁচালী' পড়ে তিনি এতটাই বিস্ময়-বিমুগ্ধ ও লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল  হয়ে পড়েন যে, সাহিত্যের  প্রতি দায়বদ্ধতায় এই গুরুদায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ  হন। বিভূতিভূষণের  লেখার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা  ও বিস্ময়বোধ নিচের মূল্যায়নটিতে  বিধৃত আছে- "তিনি (বিভূতিভূষণ) যেন মানস সরোবর হইতে শীত ঋতু যাপনের জন্য আমাদের এই পঙ্ককর্দম ও শৈবাললাঞ্ছিত পুষ্করিণীতে অবতরণ করিয়াছিলেন, এখানকার ঝাঁকে মিশিতে পারেন নাই। আমরা  শুধু দেখলাম, বিভূতিভূষণ  বাংলা সাহিত্যে তাঁহার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এক নব শুচিতা ও সহৃদয়তার আমদানি করিলেন। আমরা দীর্ঘ  বিরোধ ও কঠিন প্রতিবাদের দ্বারা যে সহজ সত্যের প্রতিষ্ঠা করিতে পারি নাই, বিভূতিভূষণ অবলীলাক্রমে শুধু দৃষ্টান্তের দ্বারা সাহিত্যের চিরন্তন  সত্যের প্রতিষ্ঠা করিয়া গেলেন।"

লেখক পরিচিতিঃ 

তপন কুমার চন্দ, জন্ম বাঁকুড়া জেলার মালিয়াড়ায়। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত সরকারী আধিকারিক। কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে জেলায় যথেষ্ট পরিচিত একটি নাম। সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখতে বেশি আগ্রহী। শহর নগরের একজন একনিষ্ঠ পাঠক। এই প্রথম কলম ধরেছেন শহর নগরের জন্য। 

---------------------------------------------------------------------------

নবপল্লীর মানুষেরা 

কালকুট  পৌরাণিক কাহিনীর আধারে রেখে কুষ্ঠ রোগীর জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন 'শাম্ব' উপন্যাসে। উপন্যাসে কৃষ্ণপুত্র শাম্বের অভিশপ্ত জীবন ও আরোগ্যলাভের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এটি একটি পুরাণ কাহিনী হলেও, মানুষের একাকিত্ব জীবনের লড়াই যন্ত্রণাকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আলোকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন কালকুট। কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তির পরেও সমাজে আজও যেন তাদের ঠাঁই নেই। আধুনিক সভ্য সমাজ এই বিষয়ে আজও যেন এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। প্রিয় সাহিত্যিক অতনু চট্টোপাধ্যায় তার মরমী হৃদয়ে শুনতে পেয়েছেন সেই অস্ফুট বেদনার কথা। সেই অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবে এই যাবে এই উপন্যাসের চরিত্রগুলি।  উত্তর খুঁজতে চোখ রাখুন আগামী সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারী থেকে 'শহর নগর' ব্লগজিনে। শুরু হচ্ছে  অতনু চট্টোপাধ্যায়ের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "নবপল্লীর মানুষেরা"। অবশ্যই পড়তে ভুলবেন না। অবশ্যই চোখ রাখুন নীচের লিঙ্কে saharnagar.blogspot.com


৯টি মন্তব্য:

  1. বিশ্লেষণাত্মক লেখা

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর লিখেছেন বিভুতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর প্রকাশ কাহিনী।
    অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত আমাদের সঙ্গে থাকুন।

      মুছুন
  3. একটি অসাধারণ তথ্য ভিত্তিক রচনা পড়লাম তপন বাবুর।এটি তার নিরলস প্রচেষ্টা এবং সাহিত্যানুরাগের ফসল ।লেখাটি অনেকের প্রয়োজন মেটাবে বলেই মনে করি। ওনার সৃষ্টিতে নিত্য নতুন ফসল উৎপাদন হোক এই কামনা করি।
    সমীর দাস।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত শহর নগরের সঙ্গে থাকুন।

      মুছুন
  4. মনোমুগ্ধকর লেখা । একে আমি বিভূতিভূষণের মুগ্ধ পাঠক, তায় আবার পেলাম তাঁর কালজয়ী উপন্যাসের জন্মকথা । আনন্দ রাখার জায়গা নেই ।
    কেতকী বাগচী, কলকাতা।

    উত্তরমুছুন